রোগীর সঙ্গে অনৈতিক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন এবং নিয়ম লঙ্ঘন করে অত্যন্ত আসক্তিকর ব্যথানাশক ওষুধ প্রেসক্রাইব করার অভিযোগে যুক্তরাজ্যে এক ভারতীয় বংশোদ্ভূত নিউরোসার্জন বা স্নায়ুশল্যবিদকে আট মাসের জন্য বরখাস্ত করা হয়েছে। অভিযুক্ত চিকিৎসকের নাম চিরাগ প্যাটেল। তিনি ওয়েলসের কার্ডিফ ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট নিউরোসার্জন হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
যুক্তরাজ্যের মেডিকেল মিসকন্ডাক্ট ট্রাইব্যুনাল (চিকিৎসকদের আচরণবিধি সংক্রান্ত আদালত) দীর্ঘ শুনানি শেষে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ট্রাইব্যুনালের তদন্তে উঠে এসেছে, ড. প্যাটেল চিকিৎসারত এক নারী রোগীর সঙ্গে যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হন এবং সেই তথ্য গোপন রাখতে ওই রোগীকে নিয়মবহির্ভূতভাবে কড়া ব্যথানাশক ওষুধ সরবরাহ করতে থাকেন।
বিবিসির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ডা. চিরাগ প্যাটেল ২০১৮ সাল থেকে কার্ডিফের ওই হাসপাতালে স্থায়ী কনসালট্যান্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওয়েলস অঞ্চলের মধ্যে তিনিই ছিলেন একমাত্র যোগ্য চিকিৎসক, যিনি ‘পেশেন্ট এ’ ছদ্মনামের ওই রোগীর জটিল মেরুদণ্ডের চিকিৎসা করতে সক্ষম ছিলেন।
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে ২০২১ সালের ডিসেম্বর মাসের মধ্যে ডা. প্যাটেল ওই নারীর মেরুদণ্ডের ক্ষতিগ্রস্ত ডিস্ক অপসারণের জন্য মোট তিনবার অস্ত্রোপচার করেন।
প্রথম অস্ত্রোপচারটি হয় ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে। এরপর একই বছরের আগস্টে দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচারের পর ডা. প্যাটেল জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজনে যোগাযোগের কথা বলে ওই রোগীকে নিজের ব্যক্তিগত ফোন নম্বর দেন। কিন্তু এর পরেই তাঁদের মধ্যে ব্যক্তিগত যোগাযোগ শুরু হয়, যা দ্রুতই অনৈতিক শারীরিক সম্পর্কে রূপ নেয়।
অভিযোগে বলা হয়েছে, এই অনৈতিক সম্পর্ক প্রায় ছয় মাস স্থায়ী হয় এবং একপর্যায়ে ডা. প্যাটেল ওই রোগীকে নিজের আপত্তিকর ছবিও পাঠান।
ট্রাইব্যুনালের শুনানিতে জানা যায়, ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে সম্পর্ক চলাকালীন সময়ে ওই রোগী তাঁর শারীরিক সমস্যার কথা ডা. প্যাটেলকে জানালে তিনি দাপ্তরিক নিয়ম লঙ্ঘন করে ব্যক্তিগত সহকারীকে দিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্টের ব্যবস্থা করেন।
এরপর ২০২২ সালের মে থেকে ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাসের মধ্যে ডা. প্যাটেল ওই রোগীকে জরুরি প্রয়োজন ছাড়াই ‘মরফিন সালফেট’ এবং ‘ডায়াজেপাম’-এর মতো অত্যন্ত আসক্তিকর ও নিয়ন্ত্রিত ব্যথানাশক ওষুধ প্রেসক্রাইব করেন। সবচেয়ে বড় অনিয়মটি ঘটে এখানে—এই প্রেসক্রিপশনগুলোর কোনো বিবরণই হাসপাতালের আনুষ্ঠানিক মেডিকেল রেকর্ডে নথিবদ্ধ করেননি ডা. প্যাটেল।
ডা. প্যাটেল ট্রাইব্যুনালে দাবি করেন, ওই নারী তাঁদের সম্পর্কের কথা প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকি দিয়ে তাঁকে ব্ল্যাকমেইল করছিলেন। চাকরি হারানোর ভয়ে বাধ্য হয়েই তিনি রোগীকে এসব ড্রাগ প্রেসক্রাইব করেছিলেন। নিজের এই আচরণের জন্য তিনি ‘গভীরভাবে অনুতপ্ত’ বলেও ট্রাইব্যুনালকে জানান।
চিকিৎসকের পক্ষে আইনজীবী ফিওনা রবার্টসন দাবি করেন, ২০১৯ সালের আগস্টের মাঝামাঝি থেকে ২০২০ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত ওই রোগী সরাসরি ডা. প্যাটেলের চিকিৎসার অধীনে ছিলেন না। তাই ডা. প্যাটেল ভেবেছিলেন তাঁর আনুষ্ঠানিক পেশাগত দায়িত্ব শেষ হয়েছে। তবে ট্রাইব্যুনাল এই যুক্তি পুরোপুরি গ্রহণ করেনি।
২০২৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে সম্পর্কের অবনতি ঘটলে ওই নারী পুলিশের দ্বারস্থ হন। পুলিশ কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা দায়ের না করলেও হাসপাতালের হেলথ বোর্ডের মেডিকেল ডিরেক্টরকে বিষয়টি অবহিত করে। একই মাসে ডা. প্যাটেল নিজেও চিকিৎসকদের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘জেনারেল মেডিকেল কাউন্সিল (জিএমসি)’-এর কাছে নিজের ভুল স্বীকার করে আবেদন জানান।
জিএমসি’র আইনজীবী হ্যারিয়েট টাইগে ট্রাইব্যুনালে বলেন, ‘অভিযুক্ত চিকিৎসকের এই আচরণ ছিল ধারাবাহিক, বারবার ঘটে চলা এবং পেশাগত অবস্থানের চরম অপব্যবহার। এটি রোগীর নিরাপত্তা এবং পেশাগত নীতিমালার প্রতি সম্পূর্ণ অবজ্ঞা-প্রদর্শনের শামিল।’
শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল ডা. প্যাটেলকে পেশাগত অসদাচরণের দায়ে আট মাসের জন্য চিকিৎসা পেশা থেকে বরখাস্ত করার নির্দেশ দেয়। কার্ডিফ অ্যান্ড ভেল ইউনিভার্সিটি হেলথ বোর্ড নিশ্চিত করেছে, চিরাগ প্যাটেল আর তাদের হাসপাতালে কর্মরত নেই।