ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল যুদ্ধের জেরে হরমুজ প্রণালী হয়ে তেল–গ্যাস পরিবহন কার্যত বন্ধ হয়ে পড়ায়, রাশিয়া শর্তসাপেক্ষে ইউরোপে জ্বালানি সরবরাহে প্রস্তুত। এমনটাই জানিয়েছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
গত রোববার রাতে টেলিভিশনে প্রচারিত এক বক্তব্যে পুতিন বলেন, ইউরোপ যদি আবার দীর্ঘমেয়াদি সহযোগিতায় ফিরতে চায়, তাহলে মস্কো ইউরোপীয় গ্রাহকদের সঙ্গে আবারও কাজ করতে প্রস্তুত। ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়ার অর্থায়ন বন্ধ করার চেষ্টা হিসেবে ইউরোপের অনেক দেশই এর আগে রুশ জ্বালানি কেনা প্রায় বন্ধ করে দিয়েছিল।
তবে গত চার বছরে ইউক্রেনে মস্কোর যুদ্ধ এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও উন্নত দেশগুলোর জোট জি–৭–এর নিষেধাজ্ঞার কারণে ইউরোপীয় দেশগুলো রুশ তেল ও গ্যাসের ওপর তাদের নির্ভরতা দ্রুত কমিয়ে এনেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২২ সালে সমুদ্রপথে রুশ অপরিশোধিত তেল আমদানির ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয়। অন্যদিকে ইউক্রেন হয়ে যাওয়া দ্রুজভা তেল পাইপলাইনে ক্ষতির কারণে জানুয়ারি থেকে হাঙ্গেরি ও স্লোভাকিয়ায় রাশিয়ার তেল সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে।
সরকারি কর্মকর্তা এবং রাশিয়ার বড় তেল–গ্যাস কোম্পানির প্রধানদের সঙ্গে বৈঠকে পুতিন বলেন, ‘যদি ইউরোপীয় কোম্পানি ও ক্রেতারা হঠাৎ নিজেদের অবস্থান বদলে আমাদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি, টেকসই সহযোগিতা গড়ে তুলতে চায়—যা রাজনৈতিক চাপমুক্ত—তাহলে আমরা কখনোই তা প্রত্যাখ্যান করিনি। ইউরোপীয়দের সঙ্গেও কাজ করতে আমরা প্রস্তুত।’
তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত থেকে রুশ কোম্পানিগুলোর সুযোগ নেওয়া উচিত। এই সংঘাতের কারণে ইরান কার্যত হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ এই প্রণালী দিয়ে বৈশ্বিক তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক–পঞ্চমাংশ পরিবাহিত হয়।
গত রোববার তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে পুতিন এই মন্তব্য করেন। ২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর এই প্রথম এত উঁচুতে উঠল তেলের দাম। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম রোববার ৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে তা ব্যারেলপ্রতি ১১৯ ডলার ছাড়িয়ে যায়, কারণ বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহ দীর্ঘ সময়ের জন্য বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়তে থাকে।
এদিকে, জি–৭ দেশগুলো রোববার জানিয়েছে, বৈশ্বিক তেলের দাম হঠাৎ বেড়ে যাওয়ার প্রতিক্রিয়ায় তারা ‘প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা’ নিতে প্রস্তুত। তবে জরুরি তেল মজুত ছাড়ার বিষয়ে তারা কোনো অঙ্গীকার করেনি। পুতিনের এই মন্তব্যের কয়েক ঘণ্টা আগে হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান ইউরোপীয় ইউনিয়নকে রুশ তেল ও গ্যাসের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার আহ্বান জানান। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে বাড়তে থাকা জ্বালানি দামের চাপ মোকাবিলার জন্য তিনি এই আহ্বান জানান।
গত সপ্তাহে পুতিন সরকারকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন রাশিয়ার জীবাশ্ম জ্বালানি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত কার্যকর করার আগেই অবশিষ্ট রুশ তেল ও গ্যাসের প্রবাহ ইউরোপ থেকে অন্য বাজারে ঘুরিয়ে দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করতে। ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর আগে ইউরোপ তার গ্যাসের ৪০ শতাংশের বেশি রাশিয়া থেকে আমদানি করত। কিন্তু ২০২৫ সালে এসে পাইপলাইন গ্যাস ও এলএনজি মিলিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়নের মোট আমদানির মাত্র ১৩ শতাংশ ছিল রাশিয়ার জ্বালানি।
ইউক্রেন যুদ্ধের সময় ইউরোপীয় বাজার হারানোর ফলে রাশিয়াকে এশিয়ার দেশগুলোর কাছে বড় ধরনের ছাড় দিয়ে তেল ও গ্যাস বিক্রি করতে হয়েছে।