জার্মানিতে একটি প্রচলিত প্রবাদ আছে—‘জার্মানরা আলু ভালোবাসে।’ পরিসংখ্যানও বলছে, গড়ে একজন জার্মান বছরে ৬৩ কেজি আলু খান। কিন্তু এবারের ফলন সেই ভালোবাসার সীমাও ছাড়িয়ে গেছে। গত ২৫ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ ফলন হওয়ায় বার্লিনে শুরু হয়েছে কার্টফেল-ফ্লুট বা আলুর বন্যা। উদ্বৃত্ত এই আলু পচে যাওয়ার হাত থেকে বাঁচাতে বার্লিনের রাস্তা ও নির্দিষ্ট কিছু জায়গায় পানির মতো আলু ঢেলে দেওয়া হচ্ছে, যা যে কেউ চাইলে ফ্রিতে নিয়ে যেতে পারছেন।
ব্রিটিশ দৈনিক দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লাইপজিগ শহরের এক কৃষকের কাছে চার হাজার টন আলু উদ্বৃত্ত থেকে যাওয়ায় এই বিনা মূল্যে বিতরণের আইডিয়াটি সামনে আসে। বার্লিনের একটি সংবাদপত্র এবং পরিবেশবান্ধব সার্চ ইঞ্জিন ইকোসিয়া যৌথভাবে এই বিশাল আলু উদ্ধার অভিযানের আয়োজন করেছে। এ জন্য বার্লিনজুড়ে প্রায় ১৭৪টি বিতরণ পয়েন্ট তৈরি করা হয়েছে।
বিনা মূল্যে আলু নেওয়ার উৎসবে শামিল হয়েছে বার্লিনের সর্বস্তরের মানুষ। এ ছাড়া বার্লিন চিড়িয়াখানা পশুদের খাবারের জন্য কয়েক টন আলু সংগ্রহ করেছে। বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা, যেমন—লঙ্গরখানা, গৃহহীনদের আশ্রয়স্থল, কিন্ডারগার্টেন এবং গির্জাগুলো এই পয়েন্টগুলো থেকে আলু নিয়ে তাদের প্রয়োজনীয় মজুত গড়ে তুলছে।
এর পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির এই সময়ে সাধারণ মানুষও বস্তা, বালতি এমনকি ঠেলাগাড়ি নিয়ে লাইন ধরে আলু সংগ্রহ করছেন। সংগৃহীত আলুর দুটি বড় ট্রাক ইতিমধ্যে যুদ্ধবিধ্বস্ত ইউক্রেনেও পাঠানো হয়েছে।
বার্লিনে এখন হাড়কাঁপানো আর্কটিক শীত চলছে। তুষারপাতের কারণে গণপরিবহন স্থবির হয়ে পড়লেও আলু সংগ্রহের পয়েন্টগুলোতে মানুষের মাঝে উৎসবের আমেজ দেখা গেছে। টেম্পেলহোফার ফেল্ড এলাকায় আলু নিতে আসা রোনাল্ড বলেন, ‘পুরো এলাকায় পার্টির মতো পরিবেশ। সবাই সবাইকে ভারী বস্তা তুলতে সাহায্য করছে এবং রান্নার রেসিপি বিনিময় করছে।’
এদিকে রেকর্ড ফলনের এই খবর ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়ায় আলুর নানা রেসিপিও ভাইরাল হচ্ছে। এমনকি সাবেক চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলো মার্কেলের বিখ্যাত ‘আলু স্যুপ’-এর রেসিপিও নতুন করে চর্চায় এসেছে। চ্যান্সেলর থাকাকালীন তিনি জানিয়েছিলেন, মেশিনে না পিষে হাত দিয়ে আলু মাখা হলে স্যুপের স্বাদ ও ঘনত্ব বাড়ে। অন্যদিকে, বার্লিনের বিখ্যাত মিশেলিন স্টার শেফ মার্কো মুলার শিখিয়ে দিচ্ছেন আলুর খোসা দিয়ে সুস্বাদু ব্রোথ তৈরির কৌশল।
তবে সাধারণ মানুষের জন্য এটি খুশির খবর হলেও, স্থানীয় কৃষকেরা এতে উদ্বিগ্ন। বাজারে আলুর দাম পড়ে যাওয়ায় তাঁরা আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন। পরিবেশবাদীদের মতে, এটি বর্তমান খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতার একটি বড় প্রমাণ। তবুও এই হাড়কাঁপানো শীতে বার্লিনবাসীর কাছে ‘আর্থ অ্যাপেল’ বা মাটির আপেল খ্যাত এই আলুই এখন পরম স্বস্তির নাম।