হোম > বিশ্ব > চীন

ট্রাম্প-সি বৈঠক শুরু, তুরুপের তাস চীনের হাতে

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

গ্রেট হলে ট্রাম্পকে স্বাগত জানান সি চিন পিং। ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আজ বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যর্থনা পেয়েছেন। এরই মধ্যে চীনা প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠক শুরু হয়েছে। বৈঠকে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তাঁর বৈঠকে ভঙ্গুর বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি, ইরান যুদ্ধ এবং তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় দেশে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে তাঁর বহুল প্রতীক্ষিত চীন সফর বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে। ২০১৭ সালে শেষবার বেইজিং সফরের পর এটিই যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বী চীনে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম সফর।

এই সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে গেছেন কয়েকজন শীর্ষ মার্কিন করপোরেট নির্বাহী। চীনের সঙ্গে বিভিন্ন অচলাবস্থা নিরসনের লক্ষ্যেই তাঁদের অংশগ্রহণ। সফরসঙ্গীদের মধ্যে রয়েছেন ইলন মাস্ক ও এনভিডিয়ার প্রধান নির্বাহী জেনসেন হুয়াং। হুয়াং শেষ মুহূর্তে সফরসঙ্গী হিসেবে যুক্ত হন। ট্রাম্প বলেন, সি চিন পিংয়ের কাছে তাঁর প্রথম অনুরোধ হবে চীনের বাজারকে মার্কিন শিল্পের জন্য ‘উন্মুক্ত’ করা।

জাঁকজমকপূর্ণ দুই দিনের এই শীর্ষ বৈঠকের শুরুতে বিশাল আনুষ্ঠানিক ভবনের বাইরে লাল গালিচায় সি চিন পিং ট্রাম্পকে স্বাগত জানান। দুই নেতা করমর্দন করেন এবং উষ্ণ হাসি বিনিময় করেন। একটি ব্রাস ব্যান্ড দুই দেশের জাতীয় সংগীত পরিবেশন করে। এরপর দুই নেতা সামরিক গার্ড অব অনারের সারি এবং ফুল ও যুক্তরাষ্ট্র-চীনের পতাকা নাড়তে থাকা শিশুদের পাশ দিয়ে হেঁটে যান। এ সময় ট্রাম্পকে কয়েকবার সি চিন পিংয়ের পিঠে চাপড় দিতেও দেখা যায়।

মার্কিন থিঙ্কট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের যুক্তরাষ্ট্র-চীন সম্পর্কবিষয়ক জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা আলী ওয়াইন বলেন, ট্রাম্পের আগের বেইজিং সফরের পর থেকে দুই দেশের ক্ষমতার সমীকরণ বদলে গেছে। তাঁর ভাষায়, তখন চীন ট্রাম্পকে বিশেষভাবে আপ্যায়ন করেছিল এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে শত শত কোটি ডলারের পণ্য কিনেছিল। কারণ, তখন বেইজিং যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের ক্রমবর্ধমান মর্যাদা বোঝাতে চাইছিল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি উল্টো। এবার যুক্তরাষ্ট্র নিজ উদ্যোগেই চীনের সেই অবস্থান স্বীকার করছে।

আলী ওয়াইন আরও বলেন, গত অক্টোবরে দক্ষিণ কোরিয়ায় এপেক সম্মেলনের ফাঁকে সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠকে ট্রাম্প আবারও ‘জি-২’ শব্দটি ব্যবহার করেন। এই শব্দ দিয়ে বিশ্বের দুই সুপারপাওয়ারের যুগল আধিপত্যকে বোঝানো হয়। হোয়াইট হাউসের তথ্য অনুযায়ী, এবারের সফরে দুই নেতার মধ্যে দীর্ঘ সময় মুখোমুখি আলোচনা হবে। আজ বৃহস্পতিবার তাঁদের গ্রেট হল অব দ্য পিপলে বৈঠক, ইউনেসকো ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা টেম্পল অব হেভেন পরিদর্শন এবং রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। শুক্রবার তাঁরা একসঙ্গে চা পান ও মধ্যাহ্নভোজেও অংশ নেবেন।

এই বৈঠকে ট্রাম্প তুলনামূলক দুর্বল অবস্থান নিয়ে এসেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের আদালত চীনসহ বিভিন্ন দেশের পণ্যের ওপর ইচ্ছামতো শুল্ক আরোপের ক্ষমতায় তাঁর সীমা টেনে দিয়েছে। অন্যদিকে ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যস্ফীতি বাড়িয়েছে এবং নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনে ট্রাম্পের রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারাতে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি করেছে। চীনের অর্থনীতি ধীরগতির হলেও সি চিনপিংকে একই ধরনের রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে না।

তবে উভয় পক্ষই গত অক্টোবরে হওয়া বাণিজ্য যুদ্ধবিরতি বজায় রাখতে আগ্রহী। ওই সমঝোতায় ট্রাম্প চীনা পণ্যের ওপর শতকরা তিন অঙ্কের শুল্ক স্থগিত করেন। বিনিময়ে সি চিন পিং বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে অস্ত্র পর্যন্ত বিভিন্ন পণ্যে ব্যবহৃত বিরল খনিজের বৈশ্বিক সরবরাহ আটকে দেওয়ার হুমকি থেকে সরে আসেন।

দুই দেশ পারস্পরিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগে সহায়তাকারী ফোরাম এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-সংক্রান্ত সংলাপ নিয়েও আলোচনা করতে পারে। পরিকল্পনার সঙ্গে জড়িত কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে ওয়াশিংটন চীনের কাছে বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ, কৃষিপণ্য ও জ্বালানি বিক্রি করতে চায়। দীর্ঘদিন ধরেই এই বাণিজ্য ঘাটতি ট্রাম্পকে বিরক্ত করে আসছে। অন্যদিকে বেইজিং চায়, যুক্তরাষ্ট্র চিপ তৈরির যন্ত্রপাতি ও উন্নত সেমিকন্ডাক্টর রপ্তানির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ শিথিল করুক।

বাণিজ্যের বাইরে ট্রাম্প চীনের প্রতি আহ্বান জানাতে পারেন, যাতে বেইজিং তেহরানকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় যেতে রাজি করায় এবং চলমান সংঘাতের অবসান ঘটে। তবে বিশ্লেষকদের সন্দেহ, সি চিন পিং তেহরানের ওপর কঠোর চাপ প্রয়োগে আগ্রহী হবেন না কিংবা ইরানের সামরিক বাহিনীর প্রতি সমর্থন বন্ধ করবেন না। কারণ, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষায় ইরানকে বেইজিং গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে।

মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এয়ার ফোর্স ওয়ানে ফক্স নিউজকে বলেন, এই সংকট সমাধানে সহায়তা করা চীনের নিজস্ব স্বার্থেও প্রয়োজন। কারণ, চীনের বহু জাহাজ বর্তমানে উপসাগরীয় অঞ্চলে আটকে আছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ধীরগতি চীনা রপ্তানিকারকদের ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

সি চিন পিংয়ের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলোর একটি হচ্ছে তাইওয়ানে যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র বিক্রি। গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত দ্বীপ তাইওয়ানকে চীন নিজেদের ভূখণ্ড বলে দাবি করে। চীন বুধবার আবারও এই অস্ত্র বিক্রির তীব্র বিরোধিতা জানিয়েছে। ১৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্র প্যাকেজ এখনো ট্রাম্পের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাইওয়ানের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নেই, তবু মার্কিন আইন অনুযায়ী ওয়াশিংটন তাইপেকে আত্মরক্ষার সক্ষমতা দেওয়ার বাধ্যবাধকতায় রয়েছে।

তাইওয়ানের শীর্ষ সরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান একাডেমিয়া সিনিকার সহকারী গবেষক রোনান ফু বলেছেন, ‘ট্রাম্পের হাতে আসলে খুব বেশি তাস নেই। কিন্তু আমি মনে করি না ট্রাম্প পরিস্থিতিকে সেভাবে দেখেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমার মনে হয় না ট্রাম্প বেইজিংকে যা খুশি দাবি করতে দেবেন এবং যুক্তরাষ্ট্র চীনের সব দাবিতেই ছাড় দেবে।’

এদিকে চলতি বছরের শেষ দিকে সি চিন পিংয়ের একটি পাল্টা যুক্তরাষ্ট্র সফরের প্রাথমিক পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৫ সালে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় ফেরার পর সেটিই হবে সি চিনপিংয়ের প্রথম যুক্তরাষ্ট্র সফর।

লাল গালিচা বিছিয়ে ট্রাম্পকে স্বাগত জানাল বেইজিং

চীনের সাবেক দুই প্রতিরক্ষামন্ত্রীর মৃত্যুদণ্ড স্থগিত

চীনে আতশবাজি কারখানায় বিস্ফোরণে ২১ জনের মৃত্যু

এআই-এর অজুহাতে কর্মী ছাঁটাইয়ের বিরুদ্ধে রায় চীনের আদালতের

চীনা ৫ রিফাইনারির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, তোয়াক্কা করছে না বেইজিং

তাইওয়ানের প্রেসিডেন্টকে ‘ইঁদুর’ বলল চীন, বেইজিংকে ‘মাছের ব্যাপারী’ ডাকল তাইপে

ভারত–পাকিস্তান যুদ্ধের পর বিক্রি ও মুনাফা বেড়েছে চীনা যুদ্ধবিমান নির্মাতা কোম্পানির

ট্রাম্প–সি বৈঠক নির্বিঘ্ন করতে ইরান যুদ্ধ বন্ধে তৎপরতা জোরদার চীনের

শুল্ক বাড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে পাল্টা ব্যবস্থা নেবে চীন

মধ্যপ্রাচ্যের শান্তি-স্থিতিশীলতা রক্ষায় চীনা প্রেসিডেন্টের চার প্রস্তাব