মিয়ানমারের সামরিক অভ্যুত্থানের নেতা থেকে প্রেসিডেন্ট হওয়া মিন অং হ্লাইং বলেছেন, দেশটির গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির জন্য ‘ভালো কিছু’ বিবেচনা করছে তাঁর সরকার। ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে অভ্যুত্থানের পর থেকে বন্দী অবস্থায় আছেন অং সান সু চি। থাইল্যান্ড থেকে প্রকাশিত মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম ইরাবতীর প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
গতকাল বুধবার সাবেক এই জেনারেলের সঙ্গে বৈঠকের পর এমনটাই জানিয়েছেন থাইল্যান্ডের এক শীর্ষ কূটনীতিক। থাই পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিহাসাক ফুয়াংকেটও মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এর মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর জোট অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনসের (আসিয়ান) কোনো সদস্য রাষ্ট্রের প্রথম জ্যেষ্ঠ দূত হিসেবে তিনি মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে দেখা করলেন।
থাইল্যান্ডে ফেরার আগে ধারণ করা এক ভিডিওবার্তায় সিহাসাক জানান, বৈঠকে তিনি অং সান সু চির প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। জবাবে মিন অং হ্লাইং বলেন, তাঁকে ‘ভালোভাবে দেখাশোনা করা হচ্ছে’ এবং তাঁর সরকার সু চির জন্য ‘ভালো কিছু বিবেচনা করছে’।
সিহাসাক বলেন, অনেক আসিয়ান দেশ অং সান সু চি ও তাঁর সুস্থতা নিয়ে উদ্বিগ্ন। আর তিনি বলেছেন, তাঁরা ভালো কিছু বিবেচনা করছেন। এটা একটি ভালো লক্ষণ হতে পারে। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আর কিছু জানাননি মিন অং হ্লাইং। রাষ্ট্রীয় পত্রিকা ও টেলিভিশনগুলো বৈঠকের খবর প্রকাশ করলেও অং সান সু চির প্রসঙ্গ সেখানে উল্লেখ করা হয়নি।
এর আগে অনলাইনে প্রুফ অব লাইফ নামের একটি প্রচারণা শুরু হয়, যেখানে আটক এই স্টেট কাউন্সিলর জীবিত ও সুস্থ আছেন—এমন প্রমাণ চাওয়া হয়। একই সঙ্গে তাঁর মুক্তির দাবিতে নতুন করে কূটনৈতিক আহ্বানও জোরদার হয়। এই প্রচারণায় বিশ্বজুড়ে সমর্থকদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সু চির সুস্থতার প্রমাণ দাবি করতে এবং নিজ নিজ সরকারকে এ বিষয়ে চাপ দিতে আহ্বান জানানো হয়েছে, যাতে নিশ্চিতভাবে জানা যায়, তিনি এখনো জীবিত আছেন।
২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকে অং সান সু চিকে বাইরের বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা হয়েছে। নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবের কারণে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে বলে জানান তাঁর ছেলে কিম আরিস। ৮০ বছর বয়সী এই নেত্রীকে একাধিক অভিযোগে ২৭ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এসব মামলাকে ব্যাপকভাবে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করা হয়। বর্তমানে তাঁকে কোথায় আটক রাখা হয়েছে, তা প্রকাশ করা হয়নি।
গত সপ্তাহে একটি সাধারণ ক্ষমার অংশ হিসেবে সু চির সাজা এক-ষষ্ঠাংশ কমানো হয়। সেই সময় হাজারো বন্দীকে মুক্তি দেওয়া হয়, যাঁর মধ্যে ছিলেন তাঁর ঘনিষ্ঠ সহকারী ও ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট উইন মিন্ট। সম্প্রতি মিন অং হ্লাইং ব্যাপক সমালোচিত ডিসেম্বর ও জানুয়ারির নির্বাচনের পর একটি নতুন সরকার গঠন করেন এবং নিজের ক্ষমতা সুসংহত করতে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। তাঁর তথাকথিত ‘বেসামরিক’ সরকারকে মাত্র কয়েকটি মিত্র দেশই সমর্থন দিয়েছে।
মিয়ানমারের আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা কাটাতে মিন অং হ্লাইং জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। নতুন বেসামরিক পরিচয় ব্যবহার করে আসিয়ানে পুনরায় অন্তর্ভুক্তির চেষ্টা করছেন তিনি। যদিও ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর সম্মত হওয়া আসিয়ানের ফাইভ পয়েন্ট কনসেনসাস—যার মধ্যে সহিংসতা বন্ধের শর্তও রয়েছে—তা বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় এই জোট এখনো তাঁকে তাদের শীর্ষ সম্মেলনে অংশ নিতে দিচ্ছে না।
নিজের অভিষেক ভাষণে মিন অং হ্লাইং আসিয়ানের সঙ্গে ‘স্বাভাবিক সম্পর্ক’ পুনঃস্থাপনের প্রতিশ্রুতি দেন। সিহাসাক বলেন, থাইল্যান্ড ফাইভ পয়েন্ট কনসেনসাসের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ‘ধাপে ধাপে’ মিয়ানমারের আসিয়ানে প্রত্যাবর্তনকে সমর্থন করে। তিনি ভিডিওবার্তায় বলেন, তারা দেখাতে চাইছে যে, তারা একটি ভালো দিকের দিকে এগোচ্ছে।
সিহাসাক আরও বলেন, ‘এই বিষয়গুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, আমরা চাই, তারা আসিয়ানে ফিরে আসুক। আমরা তাদের সাহায্য করতে চাই, কিন্তু তারা নিজেরা যদি নিজেদের সাহায্য করতে না পারে, তাহলে আমরা তাদের সাহায্য করতে পারব না।’