মিয়ানমারে ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে স্কুলে যেতে পারছে না ৬৩ লাখের বেশি শিশু। এই হিসাব অনুসারে, দেশটির মোট স্কুলগামী বয়সী শিশুর প্রায় অর্ধেক এখন শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে। এই পরিস্থিতির জন্য দারিদ্র্য, চলমান সংঘাত, বাস্তুচ্যুতি এবং প্রশাসনিক জটিলতাকে দায়ী করা হয়েছে। থাইল্যান্ড থেকে প্রকাশিত মিয়ানমারের সংবাদমাধ্যম দ্য ইরাবতীর প্রতিবেদন থেকে এই তথ্য জানা গেছে।
মিয়ানমারের থিংক ট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজি অ্যান্ড পলিসি–মিয়ানমার (আইএসপি–মিয়ানমার) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১ জুন শুরু হওয়া নতুন শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে নিবন্ধিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ৬৭ লাখ। অথচ সামরিক অভ্যুত্থানের আগে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে এ সংখ্যা ছিল ৯৭ লাখ। দেশটিতে বর্তমানে স্কুলগামী বয়সী শিশুর সংখ্যা আনুমানিক ১ কোটি ৩০ লাখ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকট বহু পরিবারকে সন্তানদের স্কুল ছাড়তে বাধ্য করছে। ইয়াঙ্গুনের দুই সন্তানের এক মা দ্য ইরাবতীকে বলেন, অষ্টম শ্রেণিতে পড়া মেয়েকে তিনি আর স্কুলে পাঠাতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘স্কুলে কোনো ফি না থাকলেও বই ও ইউনিফর্মের খরচ বহন করা সম্ভব হচ্ছে না। সে পড়তে চেয়েছিল, কিন্তু দিনমজুরির আয় দিয়ে আর সম্ভব নয়।’
শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, যুদ্ধও শিক্ষাজীবন ভেঙে দিচ্ছে। ২০২১ সালের পর রাষ্ট্রীয় শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে থাকা দ্বিতীয় থেকে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য সম্প্রতি প্লেসমেন্ট পরীক্ষা চালু করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। তবে এই সুযোগ প্রাথমিক ও নিম্নমাধ্যমিক পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকায় উচ্চমাধ্যমিক বয়সী বহু শিক্ষার্থীর আনুষ্ঠানিক শিক্ষায় ফেরার সুযোগ তৈরি হয়নি।
অন্যদিকে সংঘাতে বাস্তুচ্যুত শিক্ষার্থীদের অনেকেই আগের স্কুলের সনদ বা শিক্ষাসংক্রান্ত নথি না থাকায় নতুন করে ভর্তি হতে পারছে না।
সামরিক অভ্যুত্থানের পর জান্তানিয়ন্ত্রিত শিক্ষা ব্যবস্থা বর্জনকারী শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য বিকল্প শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলে ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট (এনইউজি)। মধ্য মিয়ানমারের প্রতিরোধ-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় পরিচালিত এই ব্যবস্থার আওতায় ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৬ হাজার স্কুলে ৭ লাখের বেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেছে।
তবে বিকল্প ব্যবস্থাও নিরাপদ নয়। সাগাইন অঞ্চলের প্রতিরোধ-নিয়ন্ত্রিত খিন ইউ টাউনশিপের শিক্ষা কমিটির এক সদস্য বলেন, নিরাপত্তা উদ্বেগে অনেক পরিবার সন্তানদের স্কুলে পাঠানো বন্ধ করেছে। কেউ কেউ আবার জান্তা-নিয়ন্ত্রিত স্কুলে যাচ্ছে, কারণ সেখানে অন্তত বিমান হামলার ঝুঁকি তুলনামূলক কম।
তিনি জানান, সম্প্রতি গোলাবর্ষণে একজন শিক্ষার্থী নিহত হয়েছে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রতিনিয়ত সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
এর আগে, ২০২৫ সালের মে মাসে সাগাইং অঞ্চলের দেপায়িন টাউনশিপে এনইউজি পরিচালিত একটি স্কুলে যুদ্ধবিমানের হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। ওই হামলায় ২২ শিক্ষার্থী ও দুই শিক্ষক নিহত হন। আহত হন আরও শতাধিক। ঘটনার পর বহু পরিবার সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে অনাগ্রহী হয়ে পড়ে। অনেক জায়গায় গোপনে বাড়িভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করা হয়।
দেপায়িনের এক অভিভাবক দ্য ইরাবতীকে বলেন, তিনি আর ছেলেকে স্কুলে পাঠাবেন না। তিনি বলেন, ‘সে ইংরেজি ও বার্মিজ পড়তে-লিখতে শিখলেই যথেষ্ট। পরে হয়তো কারিগরি প্রশিক্ষণে দেব।’ যদিও এনইউজির অধীনে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ও কারিগরি কলেজ রয়েছে, সেগুলোর বেশির ভাগই অনলাইনভিত্তিক অথবা গোপন স্থাপনায় পরিচালিত হয়।
মান্দালয় অঞ্চলের নাটোগি টাউনশিপের এক মা জানান, তাঁদের এলাকায় এনইউজি বা জান্তা কেউই কার্যকরভাবে স্কুল পরিচালনা করতে পারছে না। ফলে তিনি মেয়ের পড়াশোনার জন্য কাছের গ্রামের ব্যক্তিগত কোচিংয়ের ওপর নির্ভর করছেন। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর থেকেই মিয়ানমারের শিক্ষা সংকট শুরু হয়। সে সময় কয়েক লাখ শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সামরিক সরকারের অধীনে পরিচালিত শিক্ষা ব্যবস্থা বর্জন করেন।
মিয়ানমার উইটনেসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কেন্দ্র করে ১৭৪টি হামলা ও সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাগাইং অঞ্চল।
এদিকে, মিয়ানমারের প্রেসিডেন্ট মিন অং হ্লাইং শিক্ষা ঘাটতিকে রাষ্ট্রবিরোধী প্রতিরোধের অন্যতম কারণ হিসেবে তুলে ধরে শিক্ষাব্যবস্থা উন্নয়নের কথা বললেও আইএসপি–মিয়ানমারের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শিক্ষাখাতে সরকারি ব্যয় এখনো অভ্যুত্থান-পূর্ব সময়ের নিচে রয়েছে।
এর আগে, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে জাতীয় বাজেটের মাত্র ৬ দশমিক ০২ শতাংশ শিক্ষাখাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। চলতি বছরে তা বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৯২ শতাংশ করার পরিকল্পনা করেছে জান্তা সরকার।