রোলেক্স ঘড়ি, লুই ভিটন ব্যাগ কিংবা আইফোন—মহামূল্যবান ব্র্যান্ডের এসব পণ্য অনেকেরই কেনার সাধ্য নেই। তবে মানুষের আগ্রহের কারণে এসব পণ্যের ‘সেকেন্ড হ্যান্ড’ বাজারও জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। ব্যবহৃত বিলাসী পণ্য ক্রয়ের ক্ষেত্রে এখন ক্রেতাদের কাছে এক নতুন মানদণ্ড হয়ে উঠেছে ‘ইউজড ইন জাপান’।
আজ বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্বল ইয়েন, উন্নত সংরক্ষণব্যবস্থা ও পণ্যের উৎকৃষ্ট মান—সব মিলিয়ে জাপানের সেকেন্ড হ্যান্ড বাজার বৈশ্বিক ক্রেতাদের কাছে ক্রমেই বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।
আগে ব্যবহৃত হয়েছে—বিলাসী এমন সব পণ্য বিক্রির জন্য জাপানের সবচেয়ে বড় প্রতিষ্ঠান ‘কোমেহিও’। টোকিওর অভিজাত ওমোতেসান্দো এলাকায় কোমেহিওর নতুন শোরুমে উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। গত ২৮ নভেম্বর উদ্বোধনের দিন সেখানে কেনাকাটা করতে গিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের এক ক্রেতা। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় এখানে নকল পণ্য ভুল করে কেনার ঝুঁকি অনেক কম। তাঁর স্ত্রী প্রায় ৭০ হাজার ইয়েন দিয়ে একটি ব্যবহৃত ক্লোয়ি ব্যাগ কিনেছেন। বাংলাদেশি মুদ্রায় এর দাম পড়েছে প্রায় ৫৫ হাজার। এই ব্র্যান্ডের নতুন ব্যাগ বাংলাদেশি মুদ্রায় ১ থেকে ৬ লাখ টাকায় বিক্রি হয়। একই দোকানে আসা এক রুশ তরুণী বলেন, এখানে পণ্যের মান খুব ভালো, কিন্তু দাম তুলনামূলক কম।
কোমেহিও কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ওমোতেসান্দোতে তাদের দ্বিতীয় শোরুমের উদ্বোধনী দিনে যে পরিমাণ বিক্রি হবে বলে ধারণা করা হয়েছিল, তার দ্বিগুণের বেশি বিক্রি হয়েছে। বর্তমানে তাদের মোট বিক্রির প্রায় ৭০ শতাংশ ক্রেতা বিদেশি। এই প্রবণতা শুধু জাপানে নয়, বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত বিলাসপণ্যের বাজারকেও চাঙা করছে।
বেইন অ্যান্ড কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে বিলাসঘড়ি ও উচ্চমূল্যের পণ্যের সেকেন্ডারি বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে ৪৮ বিলিয়ন ইউরোতে, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ১৪০ শতাংশ বেশি। একই সময়ে নতুন পণ্যের বিক্রি বেড়েছে মাত্র ৪২ শতাংশ।
অনলাইন মার্কেটপ্লেসেও জাপানের সুনাম স্পষ্ট। ব্যবহৃত ঘড়ির সবচেয়ে বড় অনলাইন বাজার ক্রোনো ২৪–এ জাপানি বিক্রেতারা সর্বোচ্চ মানের রেটিং পেয়েছেন। সেখানে জাপানের বিক্রেতাদের ৬৬ শতাংশ রোলেক্স ‘খুব ভালো’ অবস্থায় রয়েছে বলে তালিকাভুক্ত হয়েছে, যা প্রধান দেশগুলোর মধ্যে সর্বোচ্চ রেটিং। ক্রেতাদের গড় সন্তুষ্টি স্কোরও ৫-এর মধ্যে ৪ দশমিক ৭৪২।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপানে ব্যবহৃত পণ্যের উচ্চ পুনর্বিক্রয়মূল্যের পেছনে রয়েছে যত্নবান ব্যবহার, নিখুঁত সংরক্ষণ ও নান্দনিকতার প্রতি জাপানিদের স্বাভাবিক সংবেদনশীলতা। দীর্ঘদিন ধরে থাকা পনশপ সংস্কৃতি ও আধুনিক রিসেল চেইনের বিস্তার পণ্যের মূল্যায়নকে করেছে আরও নির্ভুল।
এই আস্থা শুধু বিলাসপণ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ফরাসি রিসেলার ব্যাক মার্কেট জানিয়েছে, জাপানে রিফারবিশড স্মার্টফোনে বিক্রয়োত্তর সমস্যার হার মাত্র শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ, যা বিশ্বের মধ্যে সর্বনিম্ন। জাপানে ব্যবহৃত ক্যামেরা, অ্যানিমে ও মাঙ্গা অনুপ্রাণিত ট্রেডিং কার্ডের চাহিদাও বিদেশে দ্রুত বাড়ছে। ইবে-তে জাপান থেকে ব্যবহৃত ট্রেডিং কার্ডের লেনদেন এক বছরে ১৩০ শতাংশ বেড়েছে।
মারকারি ও এনএলআই রিসার্চ ইনস্টিটিউটের যৌথ হিসাবে, ‘জাপানে ব্যবহৃত’ পণ্যের সম্ভাব্য বাজারমূল্য দাঁড়াতে পারে ৯১ ট্রিলিয়ন ইয়েন বা প্রায় ৫৮০ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, জাপানের ঘরে ঘরে লুকিয়ে থাকা পুরোনো জিনিসই হতে পারে ভবিষ্যতের বৈশ্বিক সম্পদ।