বিয়েতে নেই আগ্রহ। আবার যারা এরইমধ্যে বিয়ে করে নিয়েছেন, তাদের মধ্যে সন্তান নেওয়ার কোনো ইচ্ছা দেখা যাচ্ছে না। এতে করে কমে যাচ্ছে দেশের জনসংখ্যা। এ চিত্র বিশ্বে সবচেয়ে পরিচিত চীনের বেলায়। কিন্তু এমনই এক সংকটে ধুঁকতে থাকা আরেকটি দেশ দক্ষিণ কোরিয়া। তবে দীর্ঘ সময় পর দেশটির জন্য এসেছে স্বস্তির খবর। প্রায় দুই দশকের মধ্যে গত বছর দেশটিতে জন্মহার বেড়েছে। এর আগে টানা আট বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় জন্মহার ছিল নিম্নমুখী।
বুধবার দেশটির তথ্য ও পরিসংখ্যান মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, গত বছর দক্ষিণ কোরিয়ায় ২ লাখ ৫৪ হাজার ৫০০ শিশু জন্ম নিয়েছে। যা আগের বছরের তুলনায় ৬ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। ২০০৭ সালের পর এক বছরে শিশু জন্মের ক্ষেত্রে এটিই সর্বোচ্চ বৃদ্ধির হার।
পরিসংখ্যান বলছে, দেশটির ‘টোটাল ফার্টিলিটি রেট’ বা প্রজনন হার ০.৭৫ থেকে বেড়ে ০.৮০-এ দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘ চার বছর পর প্রজনন হার ফের ০.৮-এর ঘরে ফিরল। প্রায় এক দশকের টানা পতনের পর এই নিয়ে টানা দুই বছর দেশটিতে জন্মহার বাড়ল।
জনসংখ্যাবিদেরা বলছেন, এই উত্থানের পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে ‘ইকো বুমার’ বা ‘ইকো বুম প্রজন্মের’। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে জন্ম নেওয়া এই প্রজন্ম বর্তমানে তাদের ত্রিশের কোঠায় অবস্থান করছেন, যা সন্তান ধারণের জন্য উপযুক্ত সময়। মূলত ‘বেবি বুমার’ প্রজন্মের সন্তানদেরই ‘ইকো বুমার’ বলা হয়।
এছাড়া করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘসময় দেশটিতে বিয়ের পরিমাণ কম ছিল। এমনকি আর্থিক অস্থিরতার কারণে বিয়ে ও সন্তান গ্রহণে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছিলেন অনেকে। এখন পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে থাকায় অনেকেই বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হচ্ছেন এবং বিয়ের দুই বছরের মধ্যে সন্তান নেওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে।
এছাড়া বিয়ে ও সন্তান জন্মদানে সরকারের নগদ অর্থ সহায়তা, আবাসন ভর্তুকি এবং বর্ধিত মাতৃত্বকালীন ছুটির মতো প্রণোদনাগুলোও দক্ষিণ কোরিয়ার জন্মহার বাড়াতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দক্ষিণ কোরিয়ায় মায়েদের গড় বয়স বেড়ে হয়েছে ৩৩.৮ বছর। গত বছর জন্ম নেওয়া শিশুদের এক-তৃতীয়াংশেরই মায়ের বয়স ৩৫ বা তার বেশি।
ছয় বছর বিবাহিত জীবন কাটানোর পর দ্বিতীয় সন্তানের প্রত্যাশায় থাকা লি সু মিন কোরিয়া জুংআং ডেইলিকে বলেন, ‘নিজেদের একটু গুছিয়ে নিয়ে তারপর সন্তান নিতে চেয়েছিলাম। তাই দেরিতে সন্তান নিয়েছি। এখন বয়স ত্রিশের কোঠা পার হয়ে যাচ্ছে বলা চলে। তবে এখন চারপাশের অনেককেই দেখছি, সন্তান নিতে আগ্রহী। আমার ক্ষেত্রে সব স্বাভাবিকভাবেই হয়েছে।’
তিনি আরও জানান, সরকারি সুবিধার কারণে তিনি ছয় বছরের মাতৃত্বকালীন ছুটি নিতে পারছেন এবং তার স্বামীও এক বছরের পিতৃত্বকালীন ছুটি ভোগ করেছেন।
লি সু মিন বলেন, ‘আগের তুলনায় ব্যবস্থা উন্নত হয়েছে, তাই সন্তান লালন-পালনের চাপ এখন হালকা মনে হয়।’
তবে এই উন্নতি সত্ত্বেও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রজনন হার এখনো অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি) দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন। একটি দেশের জনসংখ্যা স্থিতিশীল রাখার জন্য প্রজনন হার যেখানে ২.১ থাকা প্রয়োজন, দক্ষিণ কোরিয়া এখনো সেই লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক দূরে। বর্তমানে দেশটিতে জন্মের চেয়ে মৃত্যুর হার বেশি হওয়ায় মোট জনসংখ্যা এখনো কমছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, এই বৃদ্ধি সাময়িক হতে পারে। কারণ নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ের পর জন্ম নেওয়া প্রজন্ম যখন সন্তান ধারণের বয়সে পৌঁছাবে, তখন সংখ্যাটি আবার কমে আসতে পারে।
চূড়ান্ত নিশ্চিত পরিসংখ্যান এ বছরের শেষ দিকে প্রকাশিত হওয়ার কথা।
তবে অনেকে সাম্প্রতিক জন্মবৃদ্ধির কৃতিত্ব বড় ‘ইকো বুম’ প্রজন্মকে দিলেও গবেষণা বলছে, এ ব্যাখ্যা কিছুটা অতিরঞ্জিত।
কোরিয়া ইনস্টিটিউট ফর হেলথ অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাফেয়ার্সের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে জন্মবৃদ্ধির পেছনে জনসংখ্যার আকারের চেয়ে আচরণগত পরিবর্তন বেশি ভূমিকা রেখেছে। অর্থাৎ, কেবল সন্তান ধারণক্ষম নারীর সংখ্যা বেড়েছে বলেই জন্মহার বাড়েনি, বরং সন্তান নেওয়ার আগ্রহ বেড়েছে।
তথ্য-উপাত্তও সেটিই বলছে। ২০২৪ সালে ত্রিশোর্ধ্ব নারীদের গর্ভে অতিরিক্ত ১০ হাজার ৯২৪টি জন্মের মাত্র ৩ দশমিক ২ শতাংশ ঘটেছে ওই বয়সী নারীর সংখ্যা বৃদ্ধির কারণে। বাকি বাকি ৯৬ দশমিক ৮ শতাংশই সম্ভব হয়েছে নারীদের সন্তান নেওয়ার আগ্রহ বাড়ার কারণে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বর্তমানে দম্পতিদের মধ্যে ‘হয় শূন্য, নয় দুই’ (Zero or Two) মানসিকতা কাজ করছে। অর্থাৎ যারা সন্তান নিচ্ছেন, তারা একটিতে সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি দুটি সন্তান নিচ্ছেন। গত আট বছরে দ্বিতীয় সন্তান জন্মের হার যে হারে কমেছিল, ২০২৪ সালে তা ফের বাড়তে শুরু করেছে।
চলতি মাসের শুরুতে গবেষকেরা বলেন, ‘মোট জন্মসংখ্যায় দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম এত বড় ভূমিকা রেখেছে, এমন আগে কখনো দেখা যায়নি।’
গত আট বছরে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দ্রুত কমেছে। ২০১৫ সালে প্রায় ১ লাখ ৬৬ হাজার থেকে ২০২৩ সালে ৭৪ হাজারে নেমে আসে। ২০২৪ সালে তা সামান্য বেড়ে ৭৬ হাজার হয়েছে।
গত ডিসেম্বরে দ্বিতীয় সন্তানের জন্ম দেওয়া কিম নামের এক নারী জানান, প্রথম সন্তান হওয়ার পর সরকারের পক্ষ থেকে ২০ লাখ ওন (প্রায় ১ হাজার ৩৮০ ডলার) মূল্যের ভাউচার দেওয়া হয়েছিল। যে কারণে দ্বিতীয় সন্তান নেওয়ার ভীতি দূর হয়েছে। এছাড়া দ্বিতীয় সন্তান আসার খবরে বড় সন্তানের ডে-কেয়ারে ভর্তির ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাওয়াও বড় সহায়ক হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ‘প্রথম সন্তানকে ডে-কেয়ারে ভর্তি করানো কঠিন ছিল। কিন্তু দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের পর প্রথম সন্তান অগ্রাধিকারভিত্তিতে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেয়েছে, ফলে ভর্তি প্রক্রিয়া সহজ হয়েছে।’
গবেষণায় বলা হয়েছে, অভিভাবকত্ব নিয়ে মানসিকতার পরিবর্তনও জন্মবৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
২০২৪ সালে সন্তান জন্ম দিয়েছেন—এমন ১০০৩ জন মায়ের ওপর করা এক জরিপে দেখা গেছে, সন্তান নেওয়ার ব্যক্তিগত ইচ্ছাই ছিল সিদ্ধান্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এরপর ছিল স্বামীর সহযোগিতা আগ্রহ ও বয়সজনিত উদ্বেগ।
মা হতে যাওয়া হান নামের এক নারী বলেন, ‘ক্যারিয়ার হারানোর ভয়, আর্থিক সংকট আগের তুলনায় কমেছে। এ কারণে সন্তান নিতে আগ্রহ পেয়েছি। এছাড়া আশপাশে এখন বেশি মানুষকে বিয়ে বা সন্তান নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে দেখছি। এটা আমাকে মা হতে চাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে সাহস জুগিয়েছে।’