চীনের বার্ষিক ‘স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল গালা’ অনুষ্ঠানে এবার মূল আকর্ষণে ছিল মানবরূপী বা হিউম্যানয়েড রোবট। কয়েক ডজন রোবটের চোখধাঁধানো মার্শাল আর্ট ও আধুনিক সব কসরত এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল। ইউটিউবে ইতিমধ্যে এই ভিডিও প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ দেখেছেন। অনেকেই বলছেন, এই প্রদর্শনীর মাধ্যমে চীন তার চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের সক্ষমতার একটি শক্তিশালী ‘বার্তা’ দিল।
চীনের রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যম সিজিটিএনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, অনুষ্ঠানে দুই ডজন হিউম্যানয়েড রোবট বেশ কিছু বিশ্ব রেকর্ড গড়ার মতো নৈপুণ্য দেখিয়েছে। এর মধ্যে ছিল বিশ্বের প্রথম বিরতিহীন ফ্রি-স্টাইল টেবিল-ভল্টিং পার্কুর, শূন্যে ডিগবাজি বা এরিয়াল ফ্লিপ, এক পায়ে ক্রমাগত ফ্লিপ এবং দেয়ালের সাহায্য নিয়ে দুই ধাপের ব্যাকফ্লিপ। এ ছাড়া একটি রোবট প্রথমবারের মতো ৭.৫-রোটেশন ‘এয়ারফ্লেয়ার গ্র্যান্ড স্পিন’ দিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়।
গত বছরের অনুষ্ঠানে রোবটগুলো কেবল রুমাল ঘোরানো বা সাধারণ কিছু অঙ্গভঙ্গি করেছিল। তবে এক বছরের ব্যবধানে এই উন্নতিকে প্রযুক্তির ব্যাপক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকেরা।
সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের তথ্যমতে, চীনা রোবট নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ইউনিট্রি, ম্যাজিকল্যাব, গ্যালবট ও নোয়েটিক্স প্রায় ১০ কোটি ইউয়ান (১৪ মিলিয়ন ডলার) চুক্তিতে এই অনুষ্ঠানের অংশীদার হয়।
অনুষ্ঠানের শুরুতে নোয়েটিক্সের ‘বুমি’ মডেলের রোবটরা একটি কমেডি স্কেচ পরিবেশন করে। এরপর ইউনিট্রির রোবটগুলো শিশুশিল্পীদের সঙ্গে মার্শাল আর্ট, ট্রামপোলিন জাম্প ও ব্যাকফ্লিপ প্রদর্শন করে। শেষ পর্বে ম্যাজিকল্যাবের রোবটদের একটি সংগীত পরিবেশনায় দেখা যায়।
ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়ার এআই পলিসি বিশেষজ্ঞ রমেশ শ্রীনিবাসন আল-জাজিরাকে বলেন, বেইজিং বিশ্বকে, বিশেষ করে মার্কিন প্রতিদ্বন্দ্বীদের কাছে নিজের সক্ষমতার একটি স্পষ্ট বিবৃতি দিচ্ছে।
ধারণা করা হচ্ছে, চীনের জনসংখ্যা ধারাবাহিকভাবে হ্রাস পাওয়ায় দেশটি শিল্প ও কৃষি খাতে এই হিউম্যানয়েড রোবট ব্যবহারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করছে।
কয়েক সপ্তাহ আগেই টেসলার প্রধান ইলন মাস্ক দাভোস ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামে বলেছিলেন, আগামী বছরের শেষ নাগাদ জনসমক্ষে হিউম্যানয়েড রোবট বিক্রি শুরু হবে এবং শিগগির মানুষের চেয়ে রোবটের সংখ্যা বেশি হবে।
এই প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ মানুষের মনে কিছু গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রমেশ শ্রীনিবাসন সতর্ক করে বলেন, ‘যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এআই এই রোবটিক রূপ নেবে, তখন সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের অর্থনীতির কী হবে? রণক্ষেত্রে এই রোবটদের উপস্থিতি কী প্রভাব ফেলবে?’
শ্রীনিবাসন আরও বলেন, এই প্রযুক্তি মানুষের ব্যক্তিগত জীবনেও পরিবর্তন আনবে। মানুষ ভবিষ্যতে রোবটকে থেরাপিস্ট, সঙ্গী বা জীবনসঙ্গী হিসেবেও বেছে নিতে পারে। শ্রীনিবাসনের মতে, ‘এখন প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই এটা চাই? আমাদের উচিত মানুষের অস্তিত্ব ও মানবিকতায় বিনিয়োগ করা এবং প্রযুক্তির সঙ্গে এমনভাবে কাজ করা, যাতে সবার ভবিষ্যৎ সুরক্ষিত হয়।’