জি-২০ সম্মেলনে পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক ছবি তুলতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন ইউরোপের কয়েকটি দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও কূটনীতিকেরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে ছবি তোলার পূর্বনির্ধারিত আয়োজন বাতিল করেছেন আয়োজক যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওর আয়োজনে আটলান্টায় অনুষ্ঠিত হচ্ছে এ বৈঠক। গতকাল শুক্রবার এই ছবি তোলার কথা ছিল। বাতিলের বিষয়টি বিবিসিকে নিশ্চিত করেছেন দুই কর্মকর্তা। সাধারণত জি২০ সম্মেলনে অংশ নেওয়া সব দেশের প্রতিনিধিরা এ ধরনের ছবিতে অংশ নেন।
বৈঠকে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের উদ্দেশে সরাসরি বক্তব্য দেন যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড। তিনি বলেন, ‘আমি রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে সরাসরি বলতে চাই, এই যুদ্ধে কে আগ্রাসী, তা আমরা সবাই জানি।’ ইউক্রেনে নিরীহ বেসামরিক মানুষ হত্যার জন্য তিনি রুশ সরকারকে দায়ী করেন।
শুক্রবার জি২০-এর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনায় মিলিব্যান্ড বলেন, ইউক্রেনে ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সদস্যদেশগুলোকে আরও জোরালো ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি বলেন, ‘রাশিয়ার যুদ্ধ বিশ্বজুড়ে ব্যাপক ক্ষতি করে চলেছে। এতে হাজার হাজার নিরীহ বেসামরিক মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। পাশাপাশি জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে এবং খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়ছে।’
মিলিব্যান্ড আরও বলেন, ‘এই যুদ্ধ শুধু ইউরোপ বা ন্যাটোর জন্য পরীক্ষা নয়; এটি আমাদের সবার জন্যই একটি চ্যালেঞ্জ। পুতিনের এই বর্বর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার অর্থের জোগান বন্ধ করতে আমাদের সবাইকে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে হবে।’
ইউক্রেন জি২০-এর সদস্য নয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের কয়েকটি বৈঠকে দেশটিকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। কিন্তু এবারের বৈঠকে ইউক্রেনকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি।
যুক্তরাজ্যের একজন কর্মকর্তা বিবিসিকে বলেন, ‘ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের পর থেকে রুশ মন্ত্রীদের সঙ্গে সরাসরি দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অংশ না নেওয়া যুক্তরাজ্যের দীর্ঘদিনের নীতি। এ অবস্থান পরিবর্তনের কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই।’
চলতি মাসে ইউক্রেন ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও বিশেষ করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। রাশিয়ার অভ্যন্তরে তেল অবকাঠামো লক্ষ্য করে কিয়েভের হামলার ঘটনায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মধ্যে কূটনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা জানান, ‘যখন স্পষ্ট হয়ে যায় যে কয়েকটি দেশের প্রতিনিধিদল যৌথ ছবিতে অংশ নিতে আগ্রহী নয়, তখন ছবিটি বাতিল করা হয়।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘একটি আনুষ্ঠানিক ছবি তোলার আয়োজনকে কূটনৈতিক অস্বস্তির কারণ হতে না দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ছবিটি না তোলার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে মূল আলোচনার বিষয়বস্তুর ওপর মনোযোগ ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।’
অন্যদিকে ইউক্রেনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন থাকলেও সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাশিয়ার সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের কিছুটা উন্নতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। ট্রাম্প রাশিয়ার ওপর আরোপিত কয়েকটি নিষেধাজ্ঞা শিথিল করেছেন। পাশাপাশি মার্কিন বাজারের জন্য রাশিয়া থেকে ডিজেল আমদানির একটি চুক্তিতেও সম্মত হয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন। এর আগে দেশটিতে জ্বালানির দাম কমানোর চেষ্টা করছেন ট্রাম্প। ইরান যুদ্ধের রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে কয়েক মাস ধরে চাপের মুখে থাকার পর তাঁর এই উদ্যোগ।
রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে ট্রাম্পের এ চুক্তির তীব্র সমালোচনা করেছে ইউক্রেন ও তাদের ইউরোপীয় মিত্ররা।
জেলেনস্কি এই চুক্তিকে পুতিনের জন্য ‘উপহার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, এটি এমন একটি যুদ্ধে বিনিয়োগের শামিল, যে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত নয়, বরং বন্ধ করা প্রয়োজন।
রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধে আলোচনার টেবিলে মস্কোকে ধরে রাখতেই রাশিয়ার ওপর থেকে কয়েকটি নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ট্রাম্প।
চলতি বছরের শুরুর দিকে ডিজেল রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল রাশিয়া। তবে পুতিন বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য সরবরাহ করতে প্রস্তুত তাঁর দেশ।
এদিকে চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর জানিয়েছে, ইউক্রেনের কাছে ২০০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যের প্যাট্রিয়ট ক্ষেপণাস্ত্র বিক্রির অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। রাশিয়ার হামলা থেকে নিজেদের আকাশসীমা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার জন্য এসব ক্ষেপণাস্ত্র অত্যন্ত জরুরি।
২০২২ সালে ইউক্রেনে পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান শুরু করে রাশিয়া। বর্তমানে ইউক্রেনের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ভূখণ্ড রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ইউক্রেনের রাজধানী কিয়েভসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা আরও জোরদার করেছে মস্কো। এসব হামলায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।