যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যুক্তরাষ্ট্রকে ‘ইউরোপের সন্তান’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন, দুই মহাদেশের একসঙ্গে থাকা উচিত। তবে আবেগপূর্ণ ভাষায় তিনি এক কঠোর শর্ত হাজির করে নতুন অংশীদারিত্বের প্রস্তাব দেন। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা গেছে।
মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনের বার্ষিক অধিবেশনে বহুল প্রতীক্ষিত এক ভাষণে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র নতুন বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়। তিনি যোগ করেন, ‘প্রয়োজনে আমরা একাই এটি করতে প্রস্তুত। কিন্তু আমাদের পছন্দ এবং আশা হলো, এখানে ইউরোপে থাকা আমাদের বন্ধুদের সঙ্গে মিলেই এটি করা।’ তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ ‘একসঙ্গেই থাকার জন্য তৈরি।’
তিনি স্বীকার করেন, আমেরিকানরা কখনো কখনো সরাসরি এবং তাড়াহুড়া করে কথা বলে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু সেটি ইউরোপের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের গভীর উদ্বেগের কারণেই। তিনি বলেন, দুই পক্ষের ভাগ্য একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে।
সামগ্রিকভাবে তাঁর ভাষণের সুর সম্মেলনকক্ষে উপস্থিত প্রতিনিধিদের মধ্যে স্বস্তি তৈরি করে। তবে অনেকে উল্লেখ করেন, রুবিও সমতার ভিত্তিতে অংশীদারিত্বের প্রস্তাব দেননি। বরং জোটের কাঠামো অনেকটাই ডোনাল্ড ট্রাম্পের শর্ত অনুযায়ী নির্ধারিত।
বন্ধুত্বের হাত বাড়ালেও, একই সম্মেলনে গত বছর যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স যে সুরে কথা বলেছিলেন তার সঙ্গে স্পষ্ট পার্থক্য ছিল। তবে রুবিও স্পষ্ট করেন, মৌলিক নীতিগত অবস্থান থেকে যুক্তরাষ্ট্র সরে আসছে না। তিনি বলেন, ট্রাম্পের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র এমন একটি ইউরোপ চায় না, যা দুর্বল বা অপরাধবোধ ও লজ্জায় বাঁধা।
তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আমেরিকায় পশ্চিমা বিশ্বের নিয়ন্ত্রিত পতনের ভদ্র ও নিয়মতান্ত্রিক তত্ত্বাবধায়ক হতে চাই না। আমরা বিচ্ছিন্ন হতে চাই না। আমরা পুরোনো বন্ধুত্বকে নতুন করে শক্তিশালী করতে চাই। আমরা মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় সভ্যতাকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাই। আমরা এমন একটি পুনরুজ্জীবিত জোট চাই, যা বুঝবে যে আমাদের সমাজকে যে সমস্যা আঘাত করেছে তা শুধু কিছু খারাপ নীতির ফল নয়, বরং হতাশা ও আত্মতুষ্টির এক গভীর অসুস্থতা।’
তিনি ইউরোপকে ট্রাম্পের আদর্শের সঙ্গে যুক্ত করারও চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র একসঙ্গেই একই ভুল করেছে। এর মধ্যে রয়েছে ‘জলবায়ু পূজার’ কাছে নতি স্বীকার করা, জাতীয় প্রতিরক্ষার ক্ষতির বিনিময়ে কল্যাণ রাষ্ট্র সম্প্রসারণ করা, বিশ্বায়নকে আলিঙ্গন করা এবং ‘সীমান্তহীন এক বিশ্ব কল্পনা করা, যেখানে সবাই হবে বিশ্বনাগরিক।’
তিনি বলেন, জাতীয় সীমান্তের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা কোনো বিদেশবিদ্বেষ বা ঘৃণার প্রকাশ নয়। তাঁর ভাষায় ‘এটি জাতীয় সার্বভৌমত্বের মৌলিক কাজ। এটি করতে ব্যর্থ হওয়া শুধু জনগণের প্রতি আমাদের সবচেয়ে মৌলিক দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানো নয়, বরং এটি আমাদের সমাজের ভিত্তি এবং আমাদের সভ্যতার টিকে থাকার ওপর জরুরি হুমকি।’
তিনি বলেন, বৈশ্বিক শৃঙ্খলা পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে জাতিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠান ভেঙে ফেলার প্রয়োজন নেই। বরং সেগুলোকে সংস্কার ও পুনর্গঠন করতে হবে। তিনি যুক্তি দেন, গাজা ও ইউক্রেনের সংকট সমাধানে ভূমিকা রাখছে ট্রাম্প, জাতিসংঘ নয়।
তিনি বলেন, ‘একটি নিখুঁত বিশ্বে এসব সমস্যা এবং আরও অনেক কিছু কূটনীতিক ও কঠোর ভাষার প্রস্তাবের মাধ্যমে সমাধান হতো। কিন্তু আমরা নিখুঁত বিশ্বে বাস করি না। যারা প্রকাশ্যে আমাদের নাগরিকদের হুমকি দেয় এবং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে বিপন্ন করে, তাদের আমরা আন্তর্জাতিক আইনের বিমূর্ততার আড়ালে লুকানোর সুযোগ দিতে পারি না। তারা নিজেরাই নিয়মিত সেই আইন লঙ্ঘন করে।’
তিনি বলেন, ‘এটাই সেই পথ, যার যাত্রায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং যুক্তরাষ্ট্র এগিয়েছে। আমরা ইউরোপকেও এই পথে আমাদের সঙ্গে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানাই।’ রুবিও বলেন, পশ্চিমা অর্থনীতির ‘একটি নির্বোধ কিন্তু স্বেচ্ছাকৃত রূপান্তর’ আমাদের অন্যের ওপর নির্ভরশীল করে তুলেছে। এতে আমরা সংকটের মুখে বিপজ্জনকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছি। তিনি বলেন, ব্যাপক অভিবাসন কোনো তুচ্ছ বিষয় ছিল না এবং এখনও নয়। এটি এমন একটি সংকট, যা পশ্চিমা সমাজগুলোকে বদলে দিচ্ছে এবং অস্থিতিশীল করছে।
পুরো ভাষণজুড়ে তিনি ইউরোপের ইতিহাসের প্রশংসা করেন। তবে একই সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, বিশ্ব পুনর্গঠনের যুক্তরাষ্ট্রের প্রচেষ্টায় যোগ দেওয়ার সক্ষমতা ইউরোপের আছে কি না। ইউক্রেন প্রসঙ্গে তিনি খুব কম কথা বলেন। শুক্রবার রাতে সময়সূচির অজুহাতে তিনি ইউরোপীয় নেতাদের সঙ্গে একটি বৈঠক এড়িয়ে যান। তবে তিনি বলেন, দুই পক্ষ মতপার্থক্যের অনেক বিষয় সংকুচিত করতে পেরেছে। কিন্তু যেসব বিষয় এখনো বাকি আছে, সেগুলোই সবচেয়ে কঠিন।