একের পর এক তেলবাহী জাহাজ জব্দের ঘটনার পর এবার হুঁশিয়ারি দিয়েছে রাশিয়া। ক্রেমলিন জানায়, রুশ তেলবাহী জাহাজ ও তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা ছায়া বহরের ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা ও জাহাজ জব্দের তৎপরতা বন্ধ করতে নৌবাহিনী মোতায়েন করা হবে। আল-জাজিরার প্রতিবেদনে ক্রেমলিনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তার বরাতে বলা হয়, পশ্চিমা শক্তিগুলোকে বাধা দিতে প্রয়োজনে তাদের রণতরীগুলো সক্রিয় ভূমিকা নেবে।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং শিপিং বিষয়ক ক্রেমলিন উপদেষ্টা নিকোলাই পাত্রুশেভ গতকাল মঙ্গলবার মস্কোভিত্তিক দৈনিক ‘আর্গুমেন্তি ই ফাক্তি’কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করে জানান, ব্রিটেন, ফ্রান্স এবং বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোর কাছে রাশিয়ার একটি কঠোর বার্তা পাঠানো প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ‘আমাদের বিশ্বাস, সব সময়ের মতোই নৌচলাচলের নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় গ্যারান্টার হলো নৌবাহিনী।’
রাশিয়ার বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর ওপর পশ্চিমা দেশগুলোর পদক্ষেপকে ‘জলদস্যুতার মতো আক্রমণ’ বলে অভিহিত করেন নিকোলাই পাত্রুশেভ। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘যদি আমরা এখনই দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ না করি, তবে ইংরেজ, ফরাসি এবং এমনকি বাল্টিক রাষ্ট্রগুলোও অচিরেই এতটাই সাহসী হয়ে উঠবে যে আমাদের দেশের সমুদ্রপথ, বিশেষ করে আটলান্টিক অববাহিকা অবরুদ্ধ করার ধৃষ্টতা দেখাবে।’
পাত্রুশেভ জোর দিয়ে বলেন, রাশিয়ার অর্থনীতি সচল রাখতে তেল, শস্য ও সার রপ্তানি অব্যাহত রাখা জরুরি। পশ্চিমারা রাশিয়ার অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভ ‘শিপিং’ বা নৌ-পরিবহন খাতকে লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
পাত্রুশেভ আরও বলেন, ‘রাশিয়া থেকে দূরবর্তী অঞ্চলসহ প্রধান সামুদ্রিক এলাকাগুলোতে পর্যাপ্ত সামরিক শক্তি স্থায়ীভাবে মোতায়েন করতে হবে, যাতে পশ্চিমা জলদস্যুদের আস্ফালন কমিয়ে দেওয়া যায়।’
ভেনেজুয়েলা ও ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ‘গানবোট ডিপ্লোম্যাসি’ বা যুদ্ধজাহাজ দেখিয়ে ভয় দেখানোর নীতি চালাচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
রুশ এই কর্মকর্তার আশঙ্কা, ন্যাটো সামরিক জোট বাল্টিক সাগরে অবস্থিত রাশিয়ার কালিনিনগ্রাদ বিচ্ছিন্ন অঞ্চল অবরোধের পরিকল্পনা করছে। তিনি বলেন, ‘নৌ-অবরোধের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে ইউরোপীয়রা পরিকল্পিতভাবে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পথে এগোচ্ছে, আমাদের ধৈর্যের সীমা পরীক্ষা করছে এবং সক্রিয় প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ উসকে দিচ্ছে।’
পাত্রুশেভ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ‘যদি শান্তিপূর্ণ উপায়ে এর সমাধান না হয়, তবে নৌবাহিনী এই অবরোধ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেবে।’
চলতি বছরের জানুয়ারিতে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে কয়েক সপ্তাহের ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার পর ভেনেজুয়েলার সঙ্গে সম্পৃক্ত একটি রুশ পতাকাবাহী তেল ট্যাংকার জব্দ করে মার্কিন বিশেষ বাহিনী। এ ঘটনায় মস্কো তীব্র প্রতিবাদ জানায়। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানায়, ‘ম্যারিনেরা’ নামের ওই তেল ট্যাংকারটি ভেনেজুয়েলার ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা লঙ্ঘনের দায়ে জব্দ করা হয়েছে।
তবে রাশিয়ার পরিবহন মন্ত্রণালয় এটিকে আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক আইনের লঙ্ঘন বলে অভিহিত করেছে।
একই মাসে ফরাসি কর্তৃপক্ষ স্পেন ও মরক্কোর মধ্যবর্তী ভূমধ্যসাগরীয় জলসীমায় ‘গ্রিঞ্চ’ নামের একটি ট্যাংকারে অভিযান চালায়। তাদের অভিযোগ, জাহাজটি মস্কোর তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর অংশ, যে বাণিজ্যিক জাহাজ নেটওয়ার্ককে পশ্চিমারা রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের জেরে আরোপিত নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর উপায় হিসেবে চিহ্নিত করে।
রাশিয়া থেকে যাত্রা শুরু করা ‘গ্রিঞ্চ’কে ফ্রান্সের দক্ষিণাঞ্চলীয় শহর মার্সেইয়ের নিকটবর্তী একটি বন্দরে নিয়ে যাওয়া হয়।
মঙ্গলবার ফ্রান্স জানায়, জাহাজটির মালিক কয়েক মিলিয়ন ইউরো জরিমানা পরিশোধ করার পর ‘গ্রিঞ্চ’কে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জঁ-নোয়েল বারো সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ লিখেছেন, “কয়েক মিলিয়ন ইউরো পরিশোধ এবং ব্যয়বহুল তিন সপ্তাহের অচলাবস্থা শেষে ট্যাংকার ‘গ্রিঞ্চ’ ফরাসি জলসীমা ত্যাগ করছে। ইউরোপীয় নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়ার একটি চড়া মূল্য আছে। আমাদের উপকূলের কাছে ছায়া বহর চালিয়ে রাশিয়া আর বিনা শাস্তিতে যুদ্ধের তহবিল সংগ্রহ করতে পারবে না।”
এর আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে বেনিনের পতাকাবাহী ‘বোরাকাই’ নামক আরেকটি রুশ-সংশ্লিষ্ট জাহাজ আটক করেছিল ফ্রান্স। প্রেসিডেন্ট পুতিন সেই পদক্ষেপকে ‘জলদস্যুতা’ বলে নিন্দা জানিয়েছিলেন। ওই জাহাজের চীনা ক্যাপ্টেনের বিরুদ্ধে আগামী সপ্তাহে ফ্রান্সে বিচার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
উল্লেখ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ পর্যন্ত ৫৯৮টি জাহাজকে ‘শ্যাডো ফ্লিট’-এর অংশ সন্দেহে ৫৯৮টি জাহাজকে ইউরোপীয় বন্দর ও সামুদ্রিক সেবা থেকে নিষিদ্ধ করেছে।