ইসরায়েলি রাজনীতি ও বৈশ্বিক গোয়েন্দা তৎপরতায় নতুন আলোড়ন তুলেছে জেফরি এপস্টেইন মামলার সাম্প্রতিক এফবিআই ফাইল এবং ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের গোপন অডিও রেকর্ডিং। নতুন নথিতে দাবি করা হয়েছে, দণ্ডিত শিশু যৌন অপরাধী ও মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টেইন কেবল একজন যৌন অপরাধীই ছিলেন না, বরং তিনি ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থা ‘মোসাদ’-এর একজন সক্রিয় ‘কো-অপ্টেড’ এজেন্ট হিসেবে কাজ করতেন। এমনকি তিনি খোদ সাবেক প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাকের অধীনেই গোয়েন্দা বা ‘স্পাই’ হিসেবে বিশেষ প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।
২০২০ সালের ১৬ অক্টোবর এফবিআই-এর কাছে জমা দেওয়া একটি ‘কনফিডেন্সিয়াল হিউম্যান সোর্স’ (সিএইচএস) রিপোর্টে এই দাবিগুলো উঠে এসেছে। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রখ্যাত আইন অধ্যাপক অ্যালান দারশোভিৎজ এবং এপস্টেইনের মধ্যকার সব ফোনালাপের পুঙ্খানুপুঙ্খ নোট নেওয়া হতো এবং সেই তথ্যগুলো নিয়মিত মোসাদের কাছে পাচার করা হতো।
ওই নথিতে একজন গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে বলা হয়েছে, এপস্টেইন একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ মিত্র দেশ ইসরায়েলের গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হয়ে কাজ করতেন।
অধ্যাপক দারশোভিৎজ নিজেও মোসাদ দ্বারা প্রভাবিত বা কো-অপ্টেড হয়েছিলেন বলে এফবিআই-এর ওই নথিতে উল্লেখ রয়েছে। দারশোভিৎজ কেবল এপস্টেইনের আইনজীবীই ছিলেন না, তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং হলিউড প্রযোজক হার্ভি ওয়েনস্টাইনের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও আইনি সুরক্ষা দিয়েছেন।
ফাঁস হওয়া নথি এবং অডিও রেকর্ডিং বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এহুদ বারাক এবং এপস্টেইনের সম্পর্ক কেবল ব্যক্তিগত বন্ধুত্বের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। বারাক যখন ২০০৭ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী ছিলেন, তখনও এপস্টেইনের সাথে তাঁর অত্যন্ত গোপন ও নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।
এফবিআই নথির দাবি অনুযায়ী, বারাক ব্যক্তিগতভাবে এপস্টেইনকে গোয়েন্দা হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন। এমনকি ২০১৩ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বারাক অন্তত ৩০ বার নিউইয়র্কে এপস্টেইনের বিলাসবহুল অ্যাপার্টমেন্টে গিয়েছিলেন। গোয়েন্দা পর্যবেক্ষকদের মতে, এই সফরের উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী মহলে অনুপ্রবেশ করা।
২০১৫ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি রেকর্ড করা একটি গোপন অডিও রেকর্ডিংয়ে এহুদ বারাককে ইসরায়েলের জনমিতিক কাঠামো বদলে দেওয়ার এক ভয়ংকর পরিকল্পনার কথা বলতে শোনা যায়। বারাক বলেন, ‘আমি পুতিনকে সব সময় বলতাম, আমাদের যা প্রয়োজন তা হলো আরও ১০ লাখ রুশ নাগরিক। এটি ইসরায়েলকে নাটকীয়ভাবে বদলে দেবে এবং ফিলিস্তিনিদের ক্রমবর্ধমান প্রভাবকে ধুলোয় মিশিয়ে দেবে।’
বারাক তাঁর পরিকল্পনায় অর্থোডক্স ইহুদি ধর্মের কঠোর নিয়ম ভেঙে রুশদের ‘গণ-ধর্মান্তর’ বা ‘ম্যাসিভ কনভারশন’-এর প্রস্তাব করেছিলেন। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের ১৯৪৮-এর সীমানার ভেতরে থাকা ২০ শতাংশ ফিলিস্তিনি নাগরিকের অনুপাতকে কমিয়ে আনা এবং ইসরায়েলের ওপর ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত আশকেনাজি ইহুদিদের আধিপত্য চিরস্থায়ী করা।
এফবিআই-এর প্রতিবেদনে সিলিকন ভ্যালি ভিত্তিক ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান ‘ডে ওয়ান ভেঞ্চারস’-এর বিরুদ্ধেও বিস্ফোরক তথ্য রয়েছে। দাবি করা হয়েছে, প্রতিষ্ঠানটি মূলত ইসরায়েলি গোয়েন্দা স্বার্থে মার্কিন প্রযুক্তি চুরির জন্য কাজ করছিল। এই প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা মাশা বুচার ছিলেন জেফরি এপস্টেইনের সাবেক জনসংযোগ কর্মকর্তা এবং পুতিনের ঘনিষ্ঠ রুশ প্রতিনিধি। এই পুরো ষড়যন্ত্রে একটি আন্তর্জাতিক ত্রয়ীর (ইসরায়েল-রাশিয়া-যুক্তরাষ্ট্র) উপস্থিতি ইঙ্গিত করে, গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান এবং প্রযুক্তি চুরির মাধ্যমে বিশ্ব রাজনীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছিল।
এফবিআই রিপোর্টে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনারের পরিবার, বিশেষ করে তাঁর বাবা চার্লস কুশনারের সঙ্গে ইসরায়েলের ‘গভীর সম্পর্ক’ এবং তাদের ‘দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবসায়িক অনুশীলনের’ কথা উল্লেখ করা হয়েছে। যদিও নথিতে দুর্নীতির ধরন সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি, তবে এটি ইঙ্গিত দেয় যে মার্কিন প্রশাসনের সর্বোচ্চ পর্যায়ে ইসরায়েলি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রভাব ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী।
এই খবর ফাঁসের পর বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাঁর চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এহুদ বারাককে তীব্র আক্রমণ করেছেন। নেতানিয়াহু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বলেছেন, ‘বারাকের এই অস্বাভাবিক ঘনিষ্ঠতা প্রমাণ করে যে তিনি বছরের পর বছর ধরে উগ্র বামপন্থীদের সঙ্গে নিয়ে ইসরায়েলি গণতন্ত্রকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিলেন। তিনি ব্যক্তিগত আক্রোশ থেকে ইসরায়েলের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকিতে ফেলেছেন।’
নথিতে সাবেক ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার এবং লর্ড পিটার ম্যান্ডেলসনের নামও জড়িয়েছে। জানা গেছে, এপস্টেইন এই দুই নেতার সাথে বারাকের ব্যবসায়িক লেনদেন এবং ‘ম্যাসিভ’ বা বিশাল অঙ্কের পরামর্শক ফি নিয়ে দর কষাকষি করতেন। এছাড়া এপস্টেইন বারাককে ‘প্যালান্টিয়ার’ নামক বিতর্কিত মার্কিন ডেটা অ্যানালিটিক্স কোম্পানির বিষয়েও নিয়মিত পরামর্শ দিতেন।
এই সব তথ্যপ্রমাণ একত্রিত করলে দেখা যায়, জেফরি এপস্টেইন মামলাটি কেবল একটি যৌন কেলেঙ্কারি নয়, বরং এটি আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর এক গভীর ও অন্ধকার জনমিতিক প্রকৌশলের অংশ ছিল, যার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন সাবেক ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী এহুদ বারাক।
তথ্যসূত্র: মিডল ইস্ট আই