ইরানের বিরুদ্ধে সপ্তাহ ধরে চলতে পারে এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী এবং ব্যাপক সামরিক অভিযানের প্রস্তুতি নিচ্ছে মার্কিন সামরিক বাহিনী। যদি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চূড়ান্ত আক্রমণের নির্দেশ দেন, তবে এই অভিযান দুই দেশের মধ্যে এ যাবৎকালের সবচেয়ে ভয়াবহ ও গুরুতর সংঘাতে রূপ নিতে পারে। আজ শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই মার্কিন কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এই তথ্য জানিয়েছেন।
মার্কিন কর্মকর্তাদের এই প্রকাশ্য অবস্থান ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক আলোচনার গুরুত্ব ও ঝুঁকি অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। আগামী মঙ্গলবার জেনেভায় ওমানের মধ্যস্থতায় ইরানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনায় বসবেন মার্কিন বিশেষ দূত জ্যারেড কুশনার ও স্টিভ উইটকফ। তবে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও আজ শনিবার সতর্ক করে বলেছেন, ট্রাম্পের ইচ্ছা একটি চুক্তিতে পৌঁছানো হলেও ‘তা করা খুবই কঠিন।’
এদিকে কূটনৈতিক এই প্রচেষ্টার মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপক সামরিক শক্তি বৃদ্ধি করেছেন ট্রাম্প। পেন্টাগন জানিয়েছে, তারা মধ্যপ্রাচ্যে অতিরিক্ত একটি বিমানবাহী রণতরি (এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার), কয়েক হাজার অতিরিক্ত সেনা, ফাইটার জেট এবং গাইডেড-মিসাইল ডেস্ট্রয়ার পাঠাচ্ছে। এই বিশাল সামরিক বহর যেকোনো ধরনের আক্রমণ চালানো এবং আত্মরক্ষায় সক্ষম।
এর মধ্যে গত শুক্রবার উত্তর ক্যারোলিনার একটি সামরিক ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে ডোনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি ইরানে সরকার পরিবর্তনের সম্ভাবনা নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘ইরানে সরকার পরিবর্তনই হবে সম্ভবত সবচেয়ে সেরা ঘটনা যা ঘটতে পারে।’
তবে তেহরানের ক্ষমতায় তিনি কাকে দেখতে চান তা প্রকাশ না করলেও ট্রাম্প বলেন, ‘সেখানে যোগ্য মানুষ আছে। তারা (ইরান সরকার) ৪৭ বছর ধরে কেবল কথাই বলে যাচ্ছে।’
ইরানে পদাতিক বাহিনী বা গ্রাউন্ড ট্রুপস পাঠানোর বিষয়ে ট্রাম্প শুরু থেকেই সংশয় প্রকাশ করে আসছেন। গত বছরও তিনি বলেছিলেন, ‘স্থল বাহিনী পাঠানো হবে একদম শেষ বিকল্প।’
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের যে ধরনের সামরিক শক্তি মোতায়েন করা হয়েছে, তা মূলত আকাশপথ ও নৌ-হামলার ইঙ্গিত দেয়। তবে গত মাসে ভেনেজুয়েলায় বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটকের ঘটনাটি ট্রাম্পের বিশেষ বাহিনীর সক্ষমতার প্রমাণ দেয়।
এই সামরিক প্রস্তুতির বিষয়ে হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র আনা কেলি বলেন, ‘ইরান ইস্যুতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের টেবিলে সব অপশনই খোলা আছে। তিনি বিভিন্ন বিষয় যাচাই-বাছাই করেন, কিন্তু জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটি তিনি নিজেই নেন।’ তবে এ বিষয়ে পেন্টাগন কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
গত বছর জুন মাসে ‘অপারেশন মিডনাইট হ্যামার’-এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র যখন ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালিয়েছিল, সেটি ছিল মূলত একটি ‘ওয়ান-অফ’ বা বিচ্ছিন্ন আক্রমণ। স্টিলথ বোম্বার ব্যবহার করে করা সেই হামলার জবাবে ইরান কাতারে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা (অত্যন্ত সীমিত) আঘাত করেছিল।
তবে কর্মকর্তারা বলছেন, এবারের পরিকল্পনা অনেক বেশি জটিল। দীর্ঘমেয়াদি এই অভিযানে কেবল পরমাণু অবকাঠামো নয়, বরং ইরানের রাষ্ট্রীয় এবং নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন স্থাপনাকেও লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।
এদিকে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে এমন দীর্ঘমেয়াদি অভিযানে মার্কিন বাহিনীর জন্য ঝুঁকি অনেক বেশি হবে। ইরানের হাতে রয়েছে বিশাল ক্ষেপণাস্ত্র ভাণ্ডার। মার্কিন কর্মকর্তারাও এটি স্বীকার করেছেন, তারা ইরান থেকে জোরালো পাল্টা হামলার আশা করছেন, যার ফলে কয়েক সপ্তাহ ধরে পাল্টাপাল্টি হামলার মাধ্যমে একটি বড় আঞ্চলিক যুদ্ধ শুরু হয়ে যেতে পারে।
বর্তমানে জর্ডান, কুয়েত, সৌদি আরব, কাতার, বাহরাইন, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং তুরস্কে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) ইতিমধ্যে হুঁশিয়ারি দিয়েছে, ইরানি ভূখণ্ডে হামলা হলে তারা মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা চালাবে।