ভারতে এক নারীকে ‘ডাইনি’ আখ্যা দিয়ে তাঁর ১০ বছর বয়সী শিশুপুত্রসহ পুড়িয়ে মারার অভিযোগ উঠেছে। দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্য ঝাড়খণ্ডে এ ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় চারজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
বিবিসির প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, নিহত নারীর স্বামীও হামলার শিকার হন। গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় তিনি বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার সঙ্গে জড়িত বাকি অভিযুক্তদের খোঁজে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। গ্রেপ্তাররা পুলিশের হেফাজতে রয়েছেন, তবে তারা এখনো প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেননি।
ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে ভারতে ‘ডাইনি’ সন্দেহে ২ হাজার ৫০০ জনের বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই নারী।
গত মঙ্গলবার জ্যোতি সিনকু ও তাঁর সন্তানকেও এই পরিণতি বরণ করতে হয়। এ ঘটনার মাত্র কয়েক মাস আগেই প্রতিবেশী রাজ্য বিহারে ডাইনি আখ্যা দিয়ে একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নৃশংসভাবে কুপিয়ে ও পুড়িয়ে মারা হয়েছিল।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, এ ধরনের ঘটনাগুলো সাধারণত পিছিয়ে পড়া আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে বেশি দেখা যায়, যেখানে কুসংস্কারের ব্যাপক প্রভাব এবং নড়বড়ে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার কারণে মানুষ হাতুড়ে ডাক্তারদের ওপর নির্ভরশীল।
ঝাড়খণ্ডের রাজধানী রাঁচি থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার দূরে কুদসাই নামক একটি প্রত্যন্ত আদিবাসী জনপদে এই ঘটনাটি ঘটে। এই গ্রামে মাত্র ৫০টি মাটির বাড়ি রয়েছে। ছোট এই গ্রামটিতে সম্প্রতি বেশ কিছু গবাদি পশুর মৃত্যু হয়। একই সময়ে পুসতুন বিরুয়া নামে এক ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে মারা যান। এসব মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গ্রামটিতে জাদুটোনার গুজবের সূত্রপাত হয়।
পুসতুন বিরুয়ার অসুস্থতার সময়ই গ্রামে গুজব ছড়িয়ে পড়ে, জ্যোতি সিনকু নামের এক নারী ‘ডাইনিবিদ্যা’ চর্চা করছেন। এ সময় পুসতুন বিরুয়ার অসুস্থতার জন্য তাঁকে দায়ী করা হয়। গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পুসতুন বিরুয়া মারা গেলে জ্যোতি সিনকুর বাড়িতে হামলা চালানো হয়।
দগ্ধ অবস্থায় চিকিৎসাধীন জ্যোতির স্বামী কোলহান সিনকু জানান, সেই রাতে অন্তত ডজনখানেক লোক তাঁদের বাড়িতে চড়াও হয়, যার মধ্যে পাঁচজন নারীও ছিল। ওইসব হামলাকারীরা তাঁর স্ত্রী ও সন্তানকে আগুন ধরিয়ে দেয়।
এদিকে পুসতুনের স্ত্রী জানো বিরুয়া জানান, তাঁর স্বামী বারবার অজ্ঞান হয়ে যাচ্ছিলেন। এ কারণে তিনি স্থানীয় এক হাতুড়ে চিকিৎসকের কাছে যান। ওই চিকিৎসক দাবি করেন, পুসতুনের কোনো শারীরিক অসুস্থতা নেই। স্বামীকে হাসপাতালে না নেওয়ার কারণ হিসেবে জানো বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ, অত দূরে নিয়ে যাওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।’
কোলহান সিনকু হাসপাতালের শয্যা থেকে ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, ‘আমি হাতজোড় করে অনুরোধ করেছিলাম, বিষয়টি যেন গ্রামসভায় মীমাংসা করা হয়। কিন্তু হামলাকারীরা আমার কথা শোনেনি।’
কোলহান সিনকু ও পরিবারের আরেক সদস্যের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে জেলা পুলিশ হত্যা ও ফৌজদারি ষড়যন্ত্রের মামলা দায়ের করেছে। পুলিশ জানিয়েছে, চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে এবং বাকিদের ধরতে বিশেষ টিম গঠন করা হয়েছে।
এছাড়া গ্রামাঞ্চলে কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে বিভিন্ন কর্মসূচি আয়োজন করা হবে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।