সায়েন্স সাময়িকীর প্রতিবেদন
টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের বিপর্যয়ের কারণে বাংলাদেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। গত মার্চের মাঝামাঝি সময় থেকে দেশে ৩২ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন হামের রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং হাম ও হামের উপসর্গ নিয়ে এখন পর্যন্ত ২৮৫ জনের মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশির ভাগই শিশু (১৫ মার্চ থেকে ২ মে পর্যন্ত)। হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ বেড়ে বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
গত ৭ এপ্রিল ঢাকার শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ছয় মাস বয়সী মেয়ে রুহিকে নিয়ে শোকে ভেঙে পড়েন কণিকা আক্তার। তাঁর স্বামী মোহাম্মদ জাকির বুক চাপড়ে কাঁদছিলেন। সেদিনই হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যায় রুহির যমজ বোন রিসা। পরে রুহিকে সেই একই নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) বেডে নেওয়া হয়, যেখানে তার বোনের মৃত্যু হয়েছিল।
বাংলাদেশ এখন হামের মহামারির মধ্যে রয়েছে। ঢাকার সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে শিশু রোগীতে শয্যা পূর্ণ হয়ে গেছে। অনেক শিশু শ্বাসকষ্টে ভুগছে, কেউ কেউ নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে। শয্যার সংকটের কারণে অনেককে মেঝেতে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।
বিশ্বজুড়ে আবার ফিরে আসছে হাম। এক দশক আগে যে রোগ নির্মূলের স্বপ্ন দেখেছিলেন বিজ্ঞানীরা, সেটি এখন বহু দেশে পুনরায় ছড়িয়ে পড়ছে। কানাডা ও ইউরোপের কয়েকটি দেশ সম্প্রতি ‘হামমুক্ত’ মর্যাদা হারিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে চলতি বছরে ১ হাজার ৭০০-এর বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বজুড়ে টিকা নেওয়ার অনীহা, কোভিড-১৯ মহামারির সময় টিকাদানে বিঘ্ন এবং বিভিন্ন যুদ্ধ পরিস্থিতি হামের এমন পুনরুত্থানের কারণ। তবে বাংলাদেশের পরিস্থিতি ভিন্ন।
১৭ কোটির বেশি মানুষের দেশ বাংলাদেশ দীর্ঘদিন উচ্চ টিকাদান হার নিয়ে গর্ব করত। কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর টিকা সংগ্রহ ব্যবস্থায় বিপর্যয় নেমে আসে। ফলে দেশজুড়ে টিকার সংকট তৈরি হয় এবং টিকাদানের হার দ্রুত কমে যায়। একই সঙ্গে শিশুর অপুষ্টি ও দুর্বল স্বাস্থ্যব্যবস্থা মৃত্যুর হার বাড়িয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশে সাধারণত শিশুদের ৯ ও ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রতি চার বছর অন্তর জাতীয় ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে বাদ পড়া শিশুদের টিকা দেওয়া হয়, যাতে ৯৫ শতাংশ কভারেজ নিশ্চিত হয়, যা প্রাদুর্ভাব ঠেকাতে প্রয়োজনীয় বলে ধরা হয়।
বছরের পর বছর ইউনিসেফ এই টিকা সরবরাহ করত এবং অধিকাংশ অর্থায়ন দিত গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্স। বাংলাদেশ সরকারও এতে অর্থ দিত।
কিন্তু ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই ব্যবস্থায় ছেদ পড়ে। ব্যাপক আন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হন শেখ হাসিনা। পরে নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনূস সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতি চালু করে। এই ব্যবস্থায় সরকার বিভিন্ন সরবরাহকারীর কাছ থেকে প্রস্তাব নিয়ে যাচাই-বাছাই শেষে ক্রয়াদেশ দেয়।
ইউনিসেফ শুরু থেকেই এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে। সংস্থাটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, ‘আমি ঈশ্বরের দোহাই দিয়ে বলেছিলাম, এমনটি করবেন না। এতে টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়ে প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে। আমরা বারবার সতর্ক করেছিলাম।’ তিনি জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমকে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্তটি না নিতে অনুরোধ করেছিলেন।
কিন্তু দরপত্রের প্রক্রিয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায়। ফলে টিকা সরবরাহ বন্ধ হয়ে দেশজুড়ে মজুত ফুরিয়ে যায় এবং নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি ব্যাহত হয়। ২০২৪ সালে হওয়ার কথা থাকলেও রাজনৈতিক অস্থিরতায় পিছিয়ে যাওয়া সম্পূরক এমআর টিকাদান অভিযান ২০২৫ সালে পুরোপুরি বাতিল করা হয়।
চলতি বছরের মার্চের শেষ দিকে পাওয়া সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যোগ্য শিশুদের মাত্র ৫৯ শতাংশ হামের টিকা পেয়েছে। পরে এই তথ্য সরকারি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরে প্রথম হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হয়। পরে দ্রুত তা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। এখন পর্যন্ত দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮ জেলায় সংক্রমণ পৌঁছেছে এবং ২১ হাজারের বেশি মানুষ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।
গত ২৩ এপ্রিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) সতর্ক করে জানায়, এই প্রাদুর্ভাব মিয়ানমার ও ভারতে ছড়িয়ে পড়ারও ঝুঁকি রয়েছে। সংস্থাটি একে বাংলাদেশের হাম নির্মূলের অগ্রযাত্রা থেকে পশ্চাদপসরণ বলে উল্লেখ করে।
বাংলাদেশে শিশুদের মধ্যে অপুষ্টির হারও পরিস্থিতি খারাপ করছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রায় ২৮ শতাংশ শিশু খর্বাকৃতির এবং ১০ শতাংশ মারাত্মক অপুষ্টিতে ভুগছে। ভিটামিন এ-এর ঘাটতি শিশুদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা কমিয়ে দেয়। ২০২৪ সালের পর থেকে দেশে নির্ধারিত ছয় মাস অন্তর ভিটামিন এ বিতরণ কর্মসূচির তিনটি ধাপ মিস হয়েছে বলে জানান রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ এস এম আলমগীর।
অপর্যাপ্ত অর্থায়নের কারণে ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলো চাপে আছে। আইইডিসিআরের উপদেষ্টা মোহাম্মদ মুশতুক হুসেইন বলেন, ‘শুধু টিকাদানের ঘাটতি নয়, বাংলাদেশে হামের সংকট স্বাস্থ্য খাতের গভীর কাঠামোগত দুর্বলতাও প্রকাশ করেছে।’
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়া নতুন সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে পদক্ষেপ নিয়েছে। নতুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী জিয়াউদ্দিন হায়দার জানান, এপ্রিল মাসে আবার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা সংগ্রহ শুরু হয়েছে এবং ডব্লিউএইচও ও গ্যাভির সহায়তায় নতুন সরবরাহ নিশ্চিত করা হয়েছে।
গত ৫ এপ্রিল উচ্চঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য জরুরি টিকাদান অভিযান শুরু হয়। ২০ এপ্রিল তা দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা হয়। শিগগির ভিটামিন এ বিতরণও পুনরায় শুরু হবে বলে জানান তিনি।
তবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক রোগ নিয়ন্ত্রণ পরিচালক বে-নজির আহমেদ সতর্ক করে বলেন, ‘বর্তমান গতিতে টিকাদান চালালে দ্রুত সংক্রমণ কমানো সম্ভব হবে না।’
মুশতুক হুসেইন বলেন, ‘সংকটের ভয়াবহতা তুলে ধরতে সরকারকে আনুষ্ঠানিকভাবে জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা উচিত। এটি ইতিমধ্যে জরুরি অবস্থা। তাহলে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিতে দ্বিধা কেন?’
এদিকে এই সংকট ঘিরে রাজনৈতিক দোষারোপও শুরু হয়েছে। সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শেখ হাসিনার সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকার—উভয়কেই দায়ী করেন।
অন্যদিকে ভারতে নির্বাসনে থাকা শেখ হাসিনা এক ই-মেইল বার্তায় বলেন, তাঁর সরকার টিকাদানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছিল এবং তাঁর ১৫ বছরের শাসনামলে বড় কোনো হামের প্রাদুর্ভাব হয়নি।
সায়েন্স সাময়িকী হামের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে জানতে দেশের বেশ কয়েকজন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলে। তাঁরা এই মহামারির জন্য অন্তর্বর্তী সরকারকেই দায়ী করছেন।
এর মধ্যে গত ১২ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস অন্তর্বর্তী সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতার অভিযোগ এনে দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দায়ের করেন।
ইউনিসেফ প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্সও বলেন, ‘এত বড় বিপর্যয়ের পর টিকা সংগ্রহ পদ্ধতি পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত তদন্ত হওয়া উচিত।’
বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য সায়েদুর রহমান বলেন, ‘আগের ক্রয়ব্যবস্থা জরুরি পরিস্থিতির আইনি ধারা ব্যবহার করে পরিচালিত হচ্ছিল, তাই সেটিকে নিয়মভিত্তিক স্বচ্ছ ব্যবস্থায় নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল।’
তবে ঠিক কোথায় সমস্যা হয়েছে, সে বিষয়ে সায়েদুর রহমান বিস্তারিত বলেননি। তিনি বলেন, ‘হামের মতো পুরোপুরি প্রতিরোধযোগ্য রোগে শিশুদের মৃত্যু হৃদয়বিদারক। এটি মানবিক ট্র্যাজেডি এবং ক্ষতিগ্রস্ত সব পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা রইল।’
সায়েন্স সাময়িকীতে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের লেখক ফ্রিল্যান্স ফটোসাংবাদিক অনিক রহমান