বর্তমান যুগে স্মার্টফোন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও এখন স্মার্টফোনে অভ্যস্ত হয়ে উঠছে। খাবার খাওয়ানো, কান্না থামানো কিংবা ব্যস্ত রাখার সহজ উপায় হিসেবে অনেক অভিভাবক শিশুর হাতে স্মার্টফোন তুলে দিচ্ছেন। কিন্তু এই সাময়িক স্বস্তি শিশুর চোখের স্বাস্থ্যের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, তা নিয়ে সচেতন হওয়া জরুরি।
জন্মের পর শিশুর চোখ ধীরে ধীরে বিকশিত হয়। শৈশবে দৃষ্টিশক্তির স্বাভাবিক বিকাশ গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ সময় কাছ থেকে স্মার্টফোনের পর্দায় তাকিয়ে থাকা, পর্যাপ্ত বিরতি না নেওয়া এবং বাইরের খেলাধুলার অভাব শিশুর চোখের বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।
দীর্ঘ সময় মোবাইলের পর্দায় তাকিয়ে থাকলে চোখের ফোকাস করার ব্যবস্থার ওপর চাপ পড়ে। ফলে চোখে অস্বস্তি, মাথাব্যথা, চোখের চারপাশে ব্যথা এবং সাময়িক ঝাপসা দেখার মতো সমস্যা হতে পারে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে ডিজিটাল আই স্ট্রেইন বলা হয়।
স্বাভাবিক অবস্থায় আমরা নিয়মিত চোখের পলক ফেলি। কিন্তু স্মার্টফোনে ভিডিও দেখা বা গেম খেলার সময় পলক ফেলার হার কমে যায়। ফলে চোখের পানির স্তর দ্রুত শুকিয়ে চোখ জ্বালাপোড়া, লাল হওয়া, খচখচ করা কিংবা অতিরিক্ত পানি পড়ার মতো সমস্যা হতে পারে।
শিশুদের মধ্যে মায়োপিয়া বা ক্ষীণদৃষ্টির সমস্যা বিশ্বব্যাপী বাড়ছে। মায়োপিয়া হলে দূরের বস্তু স্পষ্ট দেখা যায় না। গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘ সময় কাছের জিনিসে মনোযোগ দেওয়া এবং ঘরের বাইরে কম সময় কাটানোর সঙ্গে মায়োপিয়ার ঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে। তবে শুধু স্মার্টফোন ব্যবহারের কারণেই মায়োপিয়া হয়, সরাসরি এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না। বংশগত কারণও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
রাতে ঘুমানোর আগে দীর্ঘ সময় স্মার্টফোন ব্যবহার শিশুর স্বাভাবিক ঘুমের ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে। পর্দার আলো এবং উত্তেজনাপূর্ণ ভিডিও বা গেম শিশুর ঘুমিয়ে পড়তে দেরি হওয়ার অন্যতম কারণ। পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব শিশুর মনোযোগ, আচরণ ও সামগ্রিক সুস্থতায় প্রভাব ফেলতে পারে।
অনেক অভিভাবক মনে করেন, মোবাইল ফোনের আলো সরাসরি চোখের রেটিনা নষ্ট করে দেয়। তবে সাধারণ ব্যবহারে স্মার্টফোনের পর্দার আলো চোখের স্থায়ী ক্ষতি করে; এমন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। মূল উদ্বেগের বিষয় হলো, দীর্ঘ সময় কাছের পর্দায় তাকিয়ে থাকা, চোখের ক্লান্তি, ঘুমের ব্যাঘাত এবং বাইরের কার্যক্রম কমে যাওয়া।
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকসের পরামর্শ অনুযায়ী, দুই বছরের কম বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে ভিডিও কল ছাড়া স্ক্রিন ব্যবহার যথাসম্ভব এড়ানো উচিত। দুই থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জন্য প্রতিদিন সর্বোচ্চ এক ঘণ্টা মানসম্মত স্ক্রিন কনটেন্টের পরামর্শ দেওয়া হয়। বড় শিশুদের ক্ষেত্রে বয়স, পড়াশোনা, ঘুম ও শারীরিক কার্যক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্ক্রিন ব্যবহারের সীমা নির্ধারণ করা জরুরি।
শিশুর চোখের সুরক্ষায় কয়েকটি অভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হলো
শিশু বারবার চোখ কচলালে, চোখের খুব কাছে বই বা মোবাইল ধরলে, দূরের লেখা দেখতে অসুবিধা হলে, ঘন ঘন মাথাব্যথা হলে কিংবা চোখ ট্যারা করে তাকালে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে পূর্ণাঙ্গ চক্ষু পরীক্ষার মাধ্যমে সমস্যার কারণ নির্ণয় করতে হবে।
ডা. মো. আরমান হোসেন রনি, কনসালট্যান্ট (চক্ষু), দীন মোহাম্মদ আই হসপিটাল, সোবহানবাগ, ঢাকা