হোম > স্বাস্থ্য

ইবোলায় বাড়ছে মৃত্যু, টিকা প্রস্তুতে লাগতে পারে ৯ মাস

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

এখন পর্যন্ত ৬০০ জন ইবোলায় আক্রান্ত বলে সন্দেহ করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। ছবি: এএফপি

ইবোলার একটি নির্দিষ্ট প্রজাতির বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা প্রস্তুত হতে আরও নয় মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। গতকাল বুধবার এ কথা জানিয়েছেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উপদেষ্টা ড. ভাসি মূর্তি।

তিনি জানান, ইবোলার ‘বুন্দিবুগিও’ প্রজাতির বিরুদ্ধে দুটি সম্ভাব্য ‘ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিন’ বা পরীক্ষামূলক টিকা তৈরির কাজ চলছে। তবে কোনোটিরই এখনো ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা মানবদেহে পরীক্ষা সম্পন্ন হয়নি।

এদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মহাপরিচালক তেদরোস আধানম গেব্রেয়াসুস জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ৬০০ জন ইবোলায় আক্রান্ত বলে সন্দেহ করা হচ্ছে এবং এর মধ্যে ১৩৯ জনের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ভাইরাসটি শনাক্ত করতে বেশি সময় লাগায় এই সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

জেনেভায় সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে মহাপরিচালক বলেন, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোয় (ডিআর কঙ্গো) প্রথম রোগী শনাক্ত হয়েছিল। সেখানে ৫১ জনের শরীরে ভাইরাসটির উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া প্রতিবেশী দেশ উগান্ডায় দুজন আক্রান্ত হয়েছেন।

গত রোববার ডব্লিউএইচও এই পরিস্থিতিকে বৈশ্বিক উদ্বেগের কারণ হিসেবে জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণা করলেও, এটি মহামারি (প্যান্ডেমিক) পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে জানিয়েছে।

তেদরোস জানান, গত মঙ্গলবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরুরি কমিটির এক বৈঠকের পর বিশেষজ্ঞরা একমত হয়েছেন যে, পরিস্থিতি এখনো ‘মহামারি আকারের জরুরি অবস্থা’ নয়।

বিষয়টি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘ডব্লিউএইচও এই প্রাদুর্ভাবের ঝুঁকি জাতীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ে উচ্চ এবং বৈশ্বিক পর্যায়ে কম বলে মূল্যায়ন করছে।’

ডিআর কঙ্গোয় নিশ্চিত হওয়া ৫১ জন রোগীর সবাই দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় ইতুরি প্রদেশ (যা এই প্রাদুর্ভাবের উপকেন্দ্র) এবং উত্তর কিভু প্রদেশের বাসিন্দা। অন্যদিকে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় যে দুজন রোগী শনাক্ত হয়েছেন, তাঁরা ডিআর কঙ্গো থেকে ভ্রমণ করে সেখানে এসেছিলেন। তাঁদের মধ্যে একজন মারা গেছেন।

ডব্লিউএইচওর প্রধান বলেন, ‘আমরা জানি ডিআর কঙ্গোয় এই প্রাদুর্ভাবের মাত্রা আরও অনেক বড়।’ তিনি আরও জানান, মৃতদের মধ্যে স্বাস্থ্যকর্মীরাও রয়েছেন, যা বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীরা জানিয়েছেন, কিছু কিছু স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীর চাপ সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যক্তিগত সুরক্ষাসামগ্রী (পিপিপি) আসতে শুরু করলেও তাঁরা এখনো পর্যাপ্ত সুরক্ষা ছাড়াই কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন।

ডক্টরস উইদাউট বর্ডারস (এমএসএফ)-এর জরুরি কর্মসূচি ব্যবস্থাপক ট্রিশ নিউপোর্ট বলেন, স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো থেকে তাঁদের জানানো হচ্ছে: ‘আমাদের এখানে সন্দেহভাজন রোগীতে ভরে গেছে। কোনো জায়গা খালি নেই।’

বার্তা সংস্থা এএফপিকে তিনি বলেন, ‘এ থেকেই বোঝা যায় পরিস্থিতি বর্তমানে কতটা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।’

এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাজ্যের সরকার ২ কোটি পাউন্ড পর্যন্ত সহায়তা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। এই অর্থ সম্মুখসারির স্বাস্থ্যকর্মীদের বেতন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং রোগ নজরদারি (সার্ভেইল্যান্স) জোরদার করার কাজে ব্যবহার করা হবে।

ডব্লিউএইচও’র এক কর্মকর্তা জানান, ভাইরাসটি কতদিন ধরে ছড়াচ্ছে তা জানতে অনুসন্ধান চলছে, তবে তাদের প্রধান অগ্রাধিকার হলো এর সংক্রমণ ঠেকানো।

জানা গেছে, প্রথম আক্রান্ত ব্যক্তি ছিলেন একজন নার্স, যাঁর শরীরে লক্ষণ দেখা দেওয়ার পর গত ২৪ এপ্রিল ইতুরির প্রাদেশিক রাজধানী বুনিয়ায় তিনি মারা যান। তাঁর মরদেহ মঙ্গোয়ালুতে নিয়ে যাওয়া হয়। এই স্বর্ণখনি সমৃদ্ধ শহর দুটির একটিতেই সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্তের খবর পাওয়া গেছে।

বুনিয়ার বাসিন্দা ও শিক্ষক আরালি বাগাম্বা বলেন, পরিস্থিতি কতটা বিপজ্জনক তা মানুষ বুঝতে পারছে।

বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিস-এর ‘নিউজডে’ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘গত তিন দিন ধরে আমি কারও সঙ্গে হাত মেলাইনি এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও আমি এটি লক্ষ্য করছি। সবসময় হাত মেলানো আমাদের একটি অভ্যাস...[কিন্তু] এখন সেই অভ্যাস বদলে গেছে।’

ইবোলা মূলত শরীরের তরল পদার্থ এবং ক্ষতস্থানের সরাসরি সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়ায়, যা তীব্র রক্তক্ষরণ এবং অঙ্গ বিকল হওয়ার কারণ হতে পারে।

বাগাম্বা বলেন, মানুষ ‘বিশ্বাস করে পরিস্থিতি ভালো হওয়ার আগে আরও খারাপ হবে’, কারণ মানুষ শুরুতে বুঝতে পারেনি যে এটি ইবোলা ছিল।

১৯৭৬ সালে ডিআর কঙ্গোয় প্রথম ইবোলা ভাইরাস আবিষ্কৃত হয় এবং ধারণা করা হয় এটি বাদুড় থেকে ছড়িয়েছে। মানুষের অসুস্থতার জন্য দায়ী ইবোলার চারটি প্রজাতি সম্পর্কে জানা যায়, যার মধ্যে ‘জাইর’ (Zaire) অন্যতম। ডিআর কঙ্গো অসংখ্যবার এই প্রজাতির মুখোমুখি হয়েছে এবং এর সঙ্গেই তারা সবচেয়ে বেশি পরিচিত।

ইবোলার ১৭তম প্রাদুর্ভাবের মুখোমুখি হচ্ছে ডিআর কঙ্গো। তবে এক দশকেরও বেশি সময় পর দেখা দেওয়া ‘বুন্দিবুগিও’ প্রজাতিটি নিজেদের সঙ্গে নতুন কিছু জটিলতা নিয়ে এসেছে।

বুন্দিবুগিও প্রজাতিটি এর আগে মাত্র দুবার প্রাদুর্ভাব ঘটিয়েছে, ২০০৭ সালে উগান্ডায় এবং ২০১২ সালে ডিআর কঙ্গোয়। সে সময় আক্রান্তদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মারা গিয়েছিলেন।

ইবোলার অন্যান্য প্রজাতির তুলনায় এটি কম প্রাণঘাতী হলেও, বুন্দিবুগিও বিরল হওয়ার কারণে এটি প্রতিরোধ করার হাতিয়ার বা উপায় বেশ সীমিত।

বুন্দিবুগিওর জন্য অনুমোদিত কোনো টিকা নেই, তবে পরীক্ষামূলক কিছু টিকা তৈরির কাজ চলছে। এটিও সম্ভব যে, জাইর প্রজাতির জন্য তৈরি টিকা এ ক্ষেত্রে কিছুটা সুরক্ষা দিতে পারে।

গত বুধবার তেদরোসের পাশাপাশি ডব্লিউএইচওর উপদেষ্টা মূর্তি বলেন, বর্তমানে উন্নয়নধীন একটি সম্ভাব্য টিকা ইবোলা সংক্রমণ রোধে বর্তমানে সহজলভ্য একমাত্র টিকার ‘অনুরূপ’ হতে পারে। বর্তমান টিকাটি কেবল জাইর প্রজাতির বিরুদ্ধে কার্যকর।

তিনি ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘এটিকে বুন্দিবুগিওর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিন হিসেবে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।’

তাদের জানা তথ্য অনুযায়ী, এটি প্রস্তুত হতে ‘সম্ভবত ছয় থেকে নয় মাস সময় লাগবে’ বলে তিনি জানান।

কোভিড-১৯-এর জন্য ব্যবহৃত অ্যাস্ট্রাজেনেকার টিকার একই প্ল্যাটফর্মের ওপর ভিত্তি করে তৈরি দ্বিতীয় সম্ভাব্য টিকাটি সম্পর্কে মূর্তি বলেন, এটি বর্তমানে প্রস্তুত করা হচ্ছে, তবে এর কার্যকারিতা সপক্ষে কোনো প্রাণীর ওপর পরীক্ষার উপাত্ত (অ্যানিমেল ডাটা) নেই।

তিনি আরও যোগ করেন, ‘সম্ভবত দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের জন্য এর ডোজ পাওয়া যেতে পারে, তবে অনেক অনিশ্চয়তা রয়েছে।’ তিনি জানান, প্রাণীর ওপর পরীক্ষার ফলাফলের ওপরই নির্ভর করবে এটিকে বুন্দিবুগিওর জন্য ‘একটি সম্ভাবনাময় গবেষণাধীন ক্যান্ডিডেট ভ্যাকসিন’ হিসেবে বিবেচনা করা যাবে কি না।

এ ছাড়া বুন্দিবুগিওকে লক্ষ্য করে তৈরি কোনো ওষুধও নেই, যা এর চিকিৎসাকে আরও কঠিন করে তুলেছে।

গত মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ডব্লিউএইচওর সমালোচনা করে বলা হয়েছিল যে, এই প্রাদুর্ভাব শনাক্ত করতে তারা ‘সামান্য দেরি’ করেছে। এর জবাবে গেব্রেউসাস বলেন, এই মন্তব্যগুলো হয়তো সঠিক বোঝাপড়ার অভাব থেকে এসেছে।

ডব্লিউএইচও জানায়, ‘একটি অত্যন্ত জটিল পরিস্থিতিতে কত দ্রুত কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে, তা আমাদের মূল্যায়ন করা উচিত।’

ইবোলার প্রাথমিক লক্ষণগুলো ম্যালেরিয়া এবং টাইফয়েডের মতো রোগের মতো, যা ডিআর কঙ্গোয় খুবই সাধারণ। এ ছাড়া ডিআর কঙ্গোর পূর্বাঞ্চল বহু বছর ধরে সশস্ত্র সংঘাতে জর্জরিত, যা এই ভাইরাসের মোকাবিলায় বাড়তি জটিলতা তৈরি করছে।

এবারের ইবোলা কতটা উদ্বেগের

হাম ও হামের উপসর্গে আরও ৬ শিশুর মৃত্যু

হামের টিকার সংকট নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে ১০ বার সতর্ক করা হয়: ইউনিসেফ

শিশু স্বাস্থ্য: কমছে মাতৃদুগ্ধ পান, ভুগছে শিশুরা

নবজাতকের থাইরয়েড পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত: দাবি চিকিৎসকদের

ধারণার চেয়েও দ্রুত ছড়াতে শুরু করেছে ‘ইবোলা’

স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বৃদ্ধি ও ব্যবহার নিশ্চিতের তাগিদ: গোলটেবিলে বক্তারা

ঈদের ছুটিতে চিকিৎসাসেবা অব্যাহত রাখতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ১৮ নির্দেশনা

সারা দেশে হাম ও উপসর্গে আরও ১১ শিশুর মৃত্যু

হাম চিকিৎসায় সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে বিশেষ নির্দেশনা