ঘর পরিষ্কার করতে ব্যবহৃত হওয়া ডিটারজেন্ট-ব্লিচের মতো ক্লিনিং প্রোডাক্টের সংস্পর্শে এসে ঝুঁকিতে পড়ছে হাজারো শিশু। অনেক বাবা-মাই এসব পণ্য শিশুদের নাগালের বাইরে রাখার প্রয়োজন মনে করেন না, যার ফলে হতে পারে অনেক বড় ক্ষতি। যুক্তরাষ্ট্রের ‘পেডিয়াট্রিক্স’ সাময়িকীতে প্রকাশিত এক বৃহৎ পরিসরের গবেষণা তা ই বলছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গত ১৬ বছরে দেশটিতে ৫ বছর বা তার কম বয়সী ২ লাখ ৪০ হাজারের বেশি শিশু পরিচ্ছন্নতা কাজে ব্যবহৃত পণ্যের (ক্লিনিং প্রোডাক্ট) সংস্পর্শে এসে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ছোট শিশুরা বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকে, কারণ তারা সতর্কবার্তা পড়তে পারে না বা এর গুরুত্ব বোঝে না। তবে বাবা-মা বা অভিভাবকদের জন্য শিশুদের নিরাপদ রাখার উপায়গুলো বেশ সহজ ও কার্যকর।
জরুরি বিভাগের চিকিৎসক এবং জর্জ ওয়াশিংটন ইউনিভার্সিটির অ্যাডজান্ট অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর ডা. লিয়ানা ওয়েন এ বিষয়ে সিএনএনের সঙ্গে কথা বলেছেন। এই ওয়েলনেস বিশেষজ্ঞ আগে বাল্টিমোরের স্বাস্থ্য কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং নিজে দুই সন্তানের জননী।
ডা. লিয়ানা ওয়েন জানান, এই গবেষণায় ২০০৭ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত ১৬ বছরের জাতীয় জরুরি বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। মূলত ৫ বছর ও তার কম বয়সী শিশুদের অনিচ্ছাকৃত দুর্ঘটনার দিকে নজর দেওয়া হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, ওই সময়ে আনুমানিক ২ লাখ ৪০ হাজার ৮৬২ জন শিশু গৃহস্থালি পরিচ্ছন্নতা পণ্যের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে জরুরি বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ ক্ষেত্রেই শিশুরা এসব পণ্য গিলে ফেলেছে। প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে সরাসরি সংস্পর্শের কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং সামান্য কিছু ক্ষেত্রে (১.২ শতাংশ) নিশ্বাসের সঙ্গে এসব পণ্য ভেতরে যাওয়ায় সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।
ডা. ওয়েনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, দুটি পণ্যের নাম সবচেয়ে বেশি সামনে এসেছে। সেগুলোর হলো ব্লিচ ও ডিটারজেন্ট। মোট দুর্ঘটনার প্রায় ৩০ শতাংশ ব্লিচের কারণে এবং প্রায় ২৯ শতাংশ লন্ড্রি ও ডিশ ডিটারজেন্টের কারণে ঘটেছে। আর প্যাকেজিংয়ের কথা বললে, প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দুর্ঘটনা ঘটেছে ডিটারজেন্ট প্যাকেট (পড) থেকে, এক-চতুর্থাংশ স্প্রে বোতল থেকে এবং বাকি অংশ সাধারণ বোতল বা খোলা পাত্র থেকে হয়েছে।
ওয়েন জানান, ব্লিচের কারণে দীর্গদিন ধরেই অনেক দুর্ঘটনা ঘটছে। কারণ এটি প্রায় সব বাড়িতেই থাকে এবং অনেক সময় শিশুদের হাতের নাগালে রাখা হয় যা অভিভাবকদের চোখ এড়িয়ে যায়। অন্যদিকে ডিটারজেন্টের রঙিন ও উজ্জ্বল প্যাকেটগুলো শিশুদের কাছে ক্যান্ডির মতো আকর্ষণীয় মনে হয়।
ওয়েন আরও জানান, প্রায় ৬৪ শতাংশ ক্ষেত্রে বিষক্রিয়া (পয়জনিং) শনাক্ত হয়েছে। অন্যান্য সাধারণ সমস্যার মধ্যে রয়েছে রাসায়নিক দহন (কেমিক্যাল বার্ন), যা প্রায় ১৪ শতাংশ এবং চামড়া বা চোখের জ্বালাপোড়া বা প্রদাহ প্রায় ১১ শতাংশ।
এই গবেষণায় থাকা শিশুদের প্রায় ৭ শতাংশকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। এর মধ্যে ৮৪ শতাংশই পণ্য গিলে ফেলার ঘটনা। আর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া শিশুদের প্রায় অর্ধেকই ছিল ১ বছর বা তার কম বয়সী।
ডা. ওয়েন বলেন, এই পরিসংখ্যানগুলো এটাই প্রমাণ করে যে গৃহস্থালি পণ্যের মাধ্যমে হওয়া ইনজুরি অত্যন্ত গুরুতর হতে পারে। এসব ক্লিনার মূলত চর্বি বা জেদি দাগ দূর করতে এবং ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করতে তৈরি করা হয়। ফলে এই পণ্যগুলো যেভাবে দাগ সরায়, সেভাবেই মানুষের শরীরের টিস্যু বা কলার ক্ষতি করতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিসংখ্যানে শুধু তাদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যারা জরুরি বিভাগে গেছে। যারা সাধারণ চিকিৎসকের চেম্বারে বা আর্জেন্ট কেয়ার সেন্টারে চিকিৎসা নিয়েছে, তাদের সংখ্যা যোগ করলে এই হার আরও বেশি হতো। শুধু ২০২৩ সালেই পয়জন কন্ট্রোল সেন্টারগুলোতে এ ধরনের ৯০ হাজারেরও বেশি কল এসেছে।
সিএনএন ডা. লিয়ানা ওয়েনের কাছে প্রশ্ন করেছিল, ছোট শিশুরা, বিশেষ করে টডলাররা কেন বেশি ঝুঁকিতে থাকে? ওয়েন জানান, ছোট শিশুরাই সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকে। টডলাররা সব সময় নড়াচড়া করে এবং তাদের চারপাশ নিয়ে অত্যন্ত কৌতূহলী থাকে। তারা হাত এবং মুখ দিয়ে সব কিছু পরখ করে দেখতে চায় এবং কোনো কিছুর বিপদ তারা বুঝতে পারে না। তারা লেবেল পড়তে পারে না বা সতর্কবার্তা বোঝে না। কোনো কিছু রঙিন বা দেখতে সুন্দর হলে তারা সেটা মুখে দেয়। কৌতূহল এবং বিপদের জ্ঞান না থাকাই তাদের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
লিয়ানা ওয়েন বলেন, ডিটারজেন্ট প্যাকেটগুলোর রঙিন রূপ দুর্ঘটনার হার দ্রুত বাড়িয়ে দিয়েছে। দেখা গেছে, প্যাকেজিংয়ে পরিবর্তন, চাইল্ড-রেজিস্ট্যান্ট কন্টেইনার এবং তেতো স্বাদের প্রলেপ ব্যবহারের ফলে এই হার কিছুটা কমেছে। তবুও ডিটারজেন্ট প্যাকেট এখনো বড় বিপদের কারণ। এর আকার, রং এবং ঘনত্বের কারণে এটি শিশুদের জন্য বিপজ্জনক। বাবা-মায়েদের এই ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে।
ওয়েন আরও জানান, ক্লিনিং প্রোডাক্টগুলো ওষুধ বা অ্যালকোহলের মতোই সতর্কতার সঙ্গে রাখা উচিত। এগুলো প্রতিদিন ব্যবহার করা হয় বলে প্রায়ই রান্নাঘর বা বাথরুমের কাউন্টারে খোলা অবস্থায় পড়ে থাকে। গবেষণা বলছে, এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা দরকার। ক্লিনিং প্রোডাক্টগুলো উঁচুতে, শিশুদের দৃষ্টির আড়ালে এবং আদর্শভাবে তালাবদ্ধ ক্যাবিনেটে রাখা উচিত। ব্যবহারের পরপরই সেগুলো নির্দিষ্ট স্থানে তুলে রাখতে হবে।
এই বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, পণ্যগুলো সব সময় মূল পাত্রে (অরিজিনাল কন্টেইনার) রাখুন। অন্য কোনো বোতলে, বিশেষ করে খাবার বা পানীয়র বোতলে এগুলো রাখলে শিশু ভুল করে তা খেয়ে ফেলতে পারে। আর সম্ভব হলে চাইল্ড-রেজিস্ট্যান্ট প্যাকেজিংযুক্ত পণ্য কিনুন। এটি শতভাগ নিশ্চিত না হলেও সুরক্ষার একটি বাড়তি স্তর যোগ করে।
ডা. লিয়ানা ওয়েন শিশুদের এসব পণ্যের ক্ষতি সম্পর্কে জানাতে বলেছেন। খুব ছোট শিশুরা হয়তো বুঝবে না, কিন্তু বড়দের শেখালে তারা এগুলো এড়িয়ে চলবে এবং ছোট ভাইবোনদেরও দূরে রাখতে সাহায্য করবে। এ ধরনের যেকোনো ঘটনায় জরুরি নম্বরে কল করে সেবা নিতে পরামর্শ দেন তিনি।