হোম > ফ্যাক্টচেক > জানি, কিন্তু ভুল

ভিটামিন সি খেলেই কি দ্রুত ঠান্ডা-সর্দি পালায়, গবেষণা কী বলছে

ফ্যাক্টচেক ডেস্ক

ভিটামিন সি খেলেই কি সর্দি-কাশি থেকে রেহাই পাওয়া সম্ভব—নাকি এটি কেবলই একটি স্বাস্থ্যবিষয়ক মিথ? ছবি: সংগৃহীত

ভিটামিন সি বা অ্যাসকরবিক অ্যাসিড আমাদের শরীরের জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টি উপাদান। শরীর নিজে থেকে ভিটামিন সি তৈরি করতে পারে না, তাই খাদ্যের মাধ্যমেই এটি গ্রহণ করতে হয়। এটি কোলাজেন, এল-কার্নিটিন ও কিছু নিউরোট্রান্সমিটার তৈরিতে, প্রোটিনের বিপাকে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ ছাড়া এটি অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং উদ্ভিদজাত খাবারে থাকা আয়রন শরীরে শোষণে সহায়তা করে।

সর্দি-কাশির প্রাকৃতিক ওষুধ হিসেবে প্রায়ই ভিটামিন সি-র নাম শোনা যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াবে—এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে বানানো বিভিন্ন ওষুধের মূল উপাদানও এটি। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী ড. লিনাস পলিং তো বলেই বসেছিলেন, বেশি করে ভিটামিন সি খেলেই ঠান্ডা-সর্দি ঠেকানো যায়।

কিন্তু এসব কথার কি আদৌ কোনো ভিত্তি আছে? হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বেথ ইসরায়েল মেডিকেল সেন্টারের পুষ্টি বিভাগের প্রধান ড. ব্রুস বিস্ট্রিয়ান বলছেন, ‘গবেষণা বলছে, সাধারণ সর্দি-কাশির ক্ষেত্রে ভিটামিন সি আসলে সামান্যই কাজে আসে।’

এখনও ভিটামিন সি নিয়ে নানা প্রচলিত ধারণা ও ভুল বিশ্বাস সমাজে প্রচলিত আছে। একটি বহুল প্রচলিত ধারণা হলো—ভিটামিন সি খেলে সর্দি-কাশি থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তবে গবেষণাভিত্তিক তথ্য বলছে, বিষয়টি এতটা সরল নয়। হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুলের গবেষণাসহ আরও কিছু গবেষণাভিত্তিক তথ্য এসব মিথ ও সত্যকে স্পষ্টভাবে আলাদা করেছে।

সর্দি প্রতিরোধে ভিটামিন সি: গবেষণা কী বলছে

গবেষণায় প্রতিদিন নিয়মিত ভিটামিন সি গ্রহণ এবং সর্দির উপসর্গ শুরু হওয়ার পর ভিটামিন সি গ্রহণ—এই দুই বিষয় আলাদাভাবে দেখা হয়েছে। গবেষণাগুলোতে প্রতিদিন অন্তত ২০০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি খাওয়া ব্যক্তিদের সঙ্গে ভিটামিন সি না থাকা বড়ি (প্লাসিবো) গ্রহণকারীদের ফলাফল তুলনা করা হয়। ২৯টি আলাদা গবেষণায় ১১ হাজারেরও বেশি মানুষের তথ্য পরীক্ষা করে দেখা গেছে, প্রতিদিন নিয়মিত ভিটামিন সি খেলেই যে সর্দি-কাশি আটকানো যাবে—বিষয়টি এমন নয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী সর্দি হওয়া ঠেকাতে এর ভূমিকা প্রায় নেই বললেই চলে। তবে নিয়মিত ভিটামিন সি গ্রহণ করলে সর্দির স্থায়িত্ব কিছুটা কমতে পারে বলে জানা যায়।

সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হারে কাজ না করলেও, যারা শারীরিক পরিশ্রম করেন বা প্রচণ্ড ঠান্ডায় থাকেন—তাঁদের জন্য কিন্তু হিসাবটা আলাদা! ম্যারাথন দৌড়বিদ, পাহাড়ে স্কি করা খেলোয়াড় বা তীব্র বরফ অঞ্চলে থাকা সৈনিকদের ওপর চালানো গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত ভিটামিন সি খেলে তাঁদের সর্দি হওয়ার ঝুঁকি প্রায় অর্ধেকে নেমে আসে।

উপসর্গ শুরুর পর ভিটামিন সি কি কাজে আসে?

সর্দি লাগার পর ভিটামিন সি খেলে তেমন কোনো প্রভাব ফেলে না বলে উঠে এসেছে গবেষণায়। ছবি: সংগৃহীত

সর্দি লাগার পর ভিটামিন সি খাওয়া শুরু করলে ভালো উপকার পাওয়া গেছে—এমন প্রমাণ নেই। তিন হাজারেরও বেশি সর্দির ঘটনা পরীক্ষা করে গবেষকেরা দেখেছেন, সর্দি হওয়ার পর ভিটামিন সি খেলে তার স্থায়িত্ব বা তীব্রতা কমে যাওয়ারও কোনো ধারাবাহিক প্রভাব পাওয়া যায়নি। গবেষকেরা অবশ্য বলেছেন, এ বিষয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

আবার, যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান মায়ো ক্লিনিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাধারণ সর্দি-কাশির কোনো নির্দিষ্ট ওষুধে রোগ পুরোপুরি সেরে যায় না। তবে পর্যাপ্ত বিশ্রাম, বেশি বেশি তরল গ্রহণ, মধু এবং বাতাসে আর্দ্রতা বাড়ানোর মতো কিছু উপায়ে উপসর্গ কমানো যেতে পারে।

তবে ভিটামিন সি সর্দি প্রতিরোধ করে—এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অবশ্য কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, সর্দির উপসর্গ শুরু হওয়ার আগে নিয়মিত ভিটামিন সি গ্রহণ করলে উপসর্গের স্থায়িত্ব কিছুটা কমতে পারে।

সর্দি সারাতে জনস হপকিন্স মেডিসিনের পরামর্শ

যুক্তরাষ্ট্রের জনস হপকিন্স মেডিসিনের এক প্রতিবেদনে সাধারণ সর্দি-কাশির উপসর্গ কমাতে কোন বিষয়গুলো কার্যকর হতে পারে এবং কোনগুলো এড়িয়ে চলা উচিত—তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, সাধারণ সর্দি-কাশির নির্দিষ্ট কোনো নিরাময় নেই, তবে কিছু উপায়ে এর উপসর্গ কমানো যায়। পর্যাপ্ত পানি পান করা গুরুত্বপূর্ণ। চা, গরম পানি ও লেবু বা স্যুপের মতো উষ্ণ তরল শরীরকে পানিশূন্যতা থেকে রক্ষা করতে পারে এবং নাক বন্ধভাব ও গলার অস্বস্তি কিছুটা কমাতে পারে।

এ ছাড়া, গরম লবণ পানিতে গার্গল গলাব্যথা ও ফোলাভাব কমাতে সাহায্য করতে পারে। একই সঙ্গে ঘরের বাতাসে আর্দ্রতা রাখা নাক ও গলার শুষ্কতা কমাতে উপকারী হতে পারে। এ জন্য হিউমিডিফায়ার ব্যবহার করা যেতে পারে।

বিশ্রাম ও পর্যাপ্ত ঘুমকে সর্দির সময় খুব গুরুত্বপূর্ণ বলা হয়েছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থাকে পুনরুদ্ধারে বিশ্রাম ও ঘুমের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে এবং কয়েক দিন ভারী ব্যয়াম থেকে বিরতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া, কিছু ওষুধ যেমন নাক বন্ধভাব কমানোর ওষুধ, অ্যান্টিহিস্টামিন এবং ব্যথা বা জ্বর কমানোর কিছু ওষুধ সর্দির নির্দিষ্ট উপসর্গ কমাতে পারে। তবে শিশুদের ক্ষেত্রে এসব ওষুধ ব্যবহারে বিশেষ সতর্কতার কথা বলা হয়েছে।

যেসব বিষয় এড়িয়ে চলতে হবে

সর্দি-কাশির তীব্রতা কমাতে ওষুধের চেয়েও বেশি কার্যকর পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও গরম তরল খাবার। ছবি: সংগৃহীত

বিখ্যাত চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান জনস হপকিন্সের তথ্য অনুযায়ী, সর্দির উপসর্গ শুরু হওয়ার পর ভিটামিন সি গ্রহণ করলেও ভাইরাসের ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব পড়ে—এমন প্রমাণ খুব কম। নিয়মিত ভিটামিন সি গ্রহণে সর্দির স্থায়িত্ব কিছুটা কমতে পারে বলে কিছু গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও, উপসর্গ শুরু হয়ে যাওয়ার পর এটি গ্রহণ করলে একই ধরনের উপকার পাওয়া যায় না।

এ ছাড়া, ধূমপান ও পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এগুলো নাক, গলা ও ফুসফুসে আরও জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন?

সর্দির উপসর্গ দুই সপ্তাহের বেশি স্থায়ী হলে, উপসর্গ আরও খারাপ হলে বা নতুন উপসর্গ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। তিন দিনের বেশি গলা ব্যথা বা টানা ১০০° ফারেনহাইটের বেশি জ্বর থাকলেও চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। তীব্র বুকব্যথা বা শ্বাসকষ্ট হলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে জনস হপকিন্স মেডিসিন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, সংবাদমাধ্যম বা যেকোনো মাধ্যমে প্রচারিত কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য বিভ্রান্তিকর মনে হলে তার স্ক্রিনশট বা লিংক কিংবা সে সম্পর্কিত বিস্তারিত তথ্য আমাদের ই-মেইল করুন। আমাদের ই-মেইল ঠিকানা factcheck@ajkerpatrika.com