ইতিহাসে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনকে এক অজেয় ও মহানায়ক হিসেবে পরিচিত। কিন্তু যুদ্ধের ময়দানে ব্রিটিশ বাহিনীকে ঘোল খাইয়ে দেওয়া এই যোদ্ধা ও রাজনীতিবিদ নিজের দাঁতের কাছে ছিলেন একদম অসহায়!
গল্পের শুরু ১৭৫৬ সালে। ওয়াশিংটনের বয়স তখন মাত্র ২৪ বছর। তীব্র দাঁতব্যথায় টিকতে না পেরে ডক্টর ওয়াটসন নামের এক চিকিৎসকের কাছে গিয়ে জীবনে প্রথমবারের মতো একটি দাঁত উপড়ে ফেলেন তিনি। খরচ হয়েছিল পাঁচ শিলিং। কিন্তু সেটা তো ছিল কেবল শুরু! তৎকালীন চিকিৎসাব্যবস্থার দুর্বলতা, পারদযুক্ত ওষুধ সেবন আর পুষ্টির অভাবে বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর দাঁত একের পর এক পড়তে শুরু করে। ঘন ঘন দাঁত মেজে কিংবা টুথ পাউডার ঘষেও তিনি এই পতন ঠেকাতে পারেননি।
১৭৭০-এর দশকে যখন আমেরিকান বিপ্লব তুঙ্গে, ওয়াশিংটনের দাঁতের অবস্থাও তখন চরম সংকটে। বিপ্লবী যুদ্ধের ঠিক প্রাক্কালে ডক্টর জন বেকার নামে এক ডেন্টিস্ট তাঁর জন্য একটি আংশিক কৃত্রিম দাঁত বানিয়ে দেন। এটি হাতির দাঁত দিয়ে তৈরি। ওয়াশিংটনের মুখের টিকে থাকা আসল দাঁতের সঙ্গে সেটি তার দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে রাখা হতো।
এরপর ১৭৮০-এর দশকে মাঠে নামেন ফরাসি ডেন্টিস্ট জাঁ-পিয়েরে লে মেয়ার। এই সময়ে একটি চমকপ্রদ ঘটনা ঘটে। মাউন্ট ভার্ননের ১৭৮৪ সালের হিসাবের খাতা ঘেঁটে দেখা যায়, জর্জ ওয়াশিংটন দাসদের কাছ থেকে নয়টি দাঁত কেনার জন্য টাকা গুনে দিয়েছিলেন! ডেন্টিস্টের কাছে সেই আসল দাঁত সরবরাহ করতেই নাকি এমনটা করা হয়েছিল, তা নিয়ে আজও ইতিহাসবিদদের কৌতূহল অনেক।
১৭৮৯ সালের ৩০ এপ্রিল। জর্জ ওয়াশিংটন আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য দাঁড়িয়েছেন। পুরো জাতি আনন্দে উদ্বেলিত! কিন্তু প্রেসিডেন্ট সাহেবের মুখের ভেতরের অবস্থাটা কেমন ছিল জানেন? তাঁর দুই পাটির মধ্যে টিকে ছিল মাত্র একটি দাঁত!
একজন প্রেসিডেন্ট তো আর ফোকলা হাসিতে ভাষণ দিতে পারেন না! তাই নিউইয়র্কের বিখ্যাত ডেন্টিস্ট জন গ্রিনউড এগিয়ে এলেন। তিনি তৎকালীন সবচেয়ে আধুনিক ও প্রযুক্তিসমৃদ্ধ একটি কৃত্রিম দাঁতের সেট তৈরি করলেন। স্বর্ণ, সিসা, পিতলের স্প্রিং, জলহস্তীর দাঁত এবং মানুষের দাঁতের সমন্বয়ে এটি তৈরি হয়। গ্রিনউড কৃত্রিম সেটটির এক কোণায় ছোট্ট একটি ফাঁকা জায়গা রেখেছিলেন, যাতে ওয়াশিংটনের মুখের সেই শেষ দাঁতটিই অক্ষত থাকে।
পরবর্তীতে যখন সেই শেষ দাঁতটিও পড়ে যায়, ওয়াশিংটন ভালোবেসে ও স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে সেটি ডক্টর গ্রিনউডকেই উপহার দেন! ডক্টর গ্রিনউড আমেরিকার সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি ও প্রেসিডেন্টের এই উপহারটিকে পরম যত্নে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করেন। দাঁতটি যেন হারিয়ে না যায়, সেজন্য তিনি এটিকে একটি সোনার পকেট ঘড়ির কাচের লকেটের ভেতরে আটকে রাখেন এবং সেখানে খোদাই করে লিখে রাখেন যে এটি প্রেসিডেন্টের শেষ দাঁত। পরবর্তীতে ১৯৩০-এর দশকে ডক্টর গ্রিনউডের বংশধরদের কাছ থেকে এই অমূল্য দুটি প্রত্নবস্তু নিউ ইয়র্ক একাডেমি অব মেডিসিনে হস্তান্তরিত হয়।
কিন্তু বিপত্তি বাঁধলো অন্য জায়গায়। এই সোনা-সিসা আর হাতির দাঁতের তৈরি ভারী সেটটি পরলে ওয়াশিংটনের মুখ প্রচণ্ড ব্যথায় টনটন করত। খাবার খাওয়া তো দূরের কথা, মুখ বন্ধ রাখাই ছিল দায়! এতে তাঁর নিচের ঠোঁট কিছুটা ফুলে বাইরের দিকে বেরিয়ে থাকত।
১৭৯৬ সালে বিখ্যাত শিল্পী গিলবার্ট স্টুয়ার্টের আঁকা ওয়াশিংটনের প্রতিকৃতিতে (যা আজও মার্কিন এক ডলারের নোটে ব্যবহৃত হয়) তাঁর গম্ভীর ও বিষণ্ন মুখভঙ্গির পেছনেও কৃত্রিম দাঁতের প্রভাব ছিল বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন।
এই কৃত্রিম দাঁতগুলোর কষ্টের মাঝেই জন্ম নেয় ইতিহাসের অন্যতম বড় এক গুজব—‘ওয়াশিংটন নাকি কাঠের দাঁত ব্যবহার করতেন!’
গল্পটা যেভাবে ছড়িয়েছিল (১, ২, ৩,) সত্যটা ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি আকর্ষণীয়। আসলে ওয়াশিংটনের ডেন্টারে (কৃত্রিম দাঁতের পাটি) কোনো কাঠ ছিল না। তবে ওয়াশিংটন ‘পোর্ট’ ও ‘মাদেইরা’ নামক গাঢ় রঙের ওয়াইন খুব পছন্দ করতেন। হাতির দাঁত ও হাড়ের দাঁতে খালি চোখে দেখা যায় না এমন কিছু সূক্ষ্ম ফাটল থাকে। প্রতিদিন গাঢ় ওয়াইন পানের ফলে সেই রঙ দাঁতের ভেতরের ফাটলগুলোতে গিয়ে জমতে শুরু করে।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ওয়াইনের ছোপ পড়ে দাঁতগুলো কালচে-বাদামি রূপ নেয় এবং হুবহু গাছের ছাল বা কাঠের মতো রং ধারণ করে। ডক্টর গ্রিনউড ১৭৯৮ সালে খোদ ওয়াশিংটনকে চিঠি লিখে সতর্কও করেছিলেন, ‘ফিলাডেলফিয়া থেকে আপনি যে দাঁত জোড়া মেরামতের জন্য পাঠিয়েছেন, তা তো ওয়াইন খেয়ে একদম কালো বানিয়ে ফেলেছেন! ওয়াইন একটু কম পান করুন আর নিয়মিত ব্রাশ করুন।’
কিন্তু ততদিনে যা হওয়ার হয়ে গেছে! মানুষ সেই কালচে দাঁত দেখে ভেবে বসলো এগুলো নিশ্চয়ই কাঠের তৈরি! আর সেখান থেকেই ছড়িয়ে পড়ল মিথটি। তবে এই গল্পটি ওয়াশিংটনকে এক অলৌকিক বা দেবতুল্য বীরের রূপ থেকে একজন মাটির মানুষ হিসেবে সাধারণ মানুষের কাছে আরও আপন করে তুলেছিল বলেই মনে করেন ইতিহাসবিদেরা।