দশকের পর দশক ধরে আমাদের বলা হয়েছে, সুস্থ থাকতে হলে প্রতিদিন টানা আট ঘণ্টা ঘুমানো জরুরি। এর চেয়ে কম ঘুম হলে চোখে ঝাপসা লাগা, রোগ প্রতিরোধক্ষমতা দুর্বল হওয়া, ওজন বৃদ্ধি ও দ্রুত বার্ধক্যের মতো নানা সমস্যার ঝুঁকি বাড়তে পারে—এমন ধারণাও প্রচলিত। আদর্শ ঘুম নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ম্যাট্রেস, ঘুমের ওষুধ, ট্র্যাকার ও বিভিন্ন অ্যাপের পেছনে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও, এখনো অনেক মানুষ পর্যাপ্ত সময় ঘুমিয়েও ক্লান্ত বোধ করেন বা মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার সমস্যায় ভোগেন।
এমন প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন উঠছে, সবার জন্য কি সত্যিই ঠিক আট ঘণ্টা একটানা ঘুমানো প্রয়োজন? ইতিহাস, বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞান এবং সাম্প্রতিক ঘুমবিষয়ক গবেষণায় দেখা যায়, মানুষের ঘুমের প্রয়োজন ও ধরন ব্যক্তি, বয়স, জীবনযাপন ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যভেদে ভিন্ন হতে পারে। Fortune-এর একটি প্রতিবেদনেও ঘুমের এই ব্যক্তিভেদে ভিন্নতার বিষয়টি ওঠে এসেছে।
জানা যায়, আট ঘণ্টা ঘুমের মানদণ্ড প্রাচীন কোনো জ্ঞান বা প্রাথমিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সর্বসম্মত পরামর্শ থেকে আসেনি। শিল্পবিপ্লবের সময় মানুষের জীবনযাত্রা যন্ত্র ও নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার পর এই ধারণাটি আরও দৃঢ় হয়। ব্যাপকভাবে বৈদ্যুতিক আলো ব্যবহারের আগে সূর্যাস্তের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মানুষ তুলনামূলকভাবে আগেভাগেই ঘুমাতে যেত। ইতিহাসবিদদের মতে, তখন মানুষের ‘segmented sleep’ বা ‘biphasic sleep’ নামে পরিচিত দুই পর্বের ঘুমের অভ্যাস ছিল।
কিন্তু কৃত্রিম আলোর ব্যবহার শুরুর পর মানুষ বেশি রাত জাগতে শুরু করে। তবে কাজের সময়সূচির কারণে সকালে ওঠার সময় একই থাকায় ঘুমের সময় সংকুচিত হয়ে আসে এবং একটানা ঘুমের প্রত্যাশা তৈরি হয়। একই সময়ে ম্যাট্রেস ও ঘুমসংক্রান্ত বিভিন্ন পণ্যের বাজারও বিকশিত হয়। ফলে দীর্ঘ ও একটানা রাতের ঘুমকে আদর্শ হিসেবে প্রচারের অর্থনৈতিক সুবিধাও ছিল।
অনেকে আবার মনে করেন ৮ ঘণ্টা ঘুম ম্যাট্রেস কোম্পানির বানানো ধারণা। তবে দিনে আট ঘণ্টা ঘুম বা বিশ্রামের ধারণার সঙ্গে কোনো ম্যাট্রেস কোম্পানির সম্পর্ক নেই। এর শিকড় মূলত শিল্পবিপ্লবের সময়ের শ্রমিক অধিকার আন্দোলনে।
ঊনিশ শতকের শুরুর দিকে কলকারখানায় শ্রমিকদের দিয়ে দিনে ১০ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত অমানুষিক পরিশ্রম করানো হতো। ১৮১৭ সালে রবার্ট ওয়েন নামের ওয়েলশের এক সমাজসংস্কারক প্রথম শ্রমিকদের জন্য একটি স্লোগান তৈরি করেন—‘৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিনোদন ও ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম।’ তবে ওয়েন কিন্তু আট ঘণ্টার বিশ্রাম মানে শুধু ঘুমই বোঝাননি। যদিও পরে মানুষ বিশ্রাম বলতে ঘুমকেই বুঝেছে। অর্থাৎ, এই আট ঘণ্টা ঘুমের ধারণাটি কোনো কোম্পানির বিপণন কৌশল ছিল না; বরং এটি ছিল শ্রমিকদের মানবিক অধিকার আদায়ের এক ঐতিহাসিক আন্দোলনের ফসল।
তবে বৃহৎ পরিসরের কিছু গবেষণা আট ঘণ্টাকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক একটি সংখ্যা হিসেবে দেখার ধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। বিবর্তনবিষয়ক গবেষণা থেকে ধারণা করা হচ্ছে, অনেক সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য রাতে প্রায় সাত ঘণ্টা ঘুমই যথেষ্ট হতে পারে। ঘুমের সময় এর চেয়ে কম বা বেশি হলে স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে—যাকে অনেক গবেষণায় ‘ইউ-আকৃতির’ সম্পর্ক হিসেবে দেখা যায়।
আবার, বিদ্যুৎবিহীন কিছু জনগোষ্ঠীর স্বাভাবিক ঘুমের সময়ও প্রায় ছয় থেকে সাত ঘণ্টা। এর অর্থ কম ঘুমানোই ভালো—এমন নয়। বরং ঘুমের প্রয়োজন ব্যক্তি, বয়স, জিনগত বৈশিষ্ট্য ও দৈনন্দিন জীবনযাপন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
শিল্পবিপ্লবের অনেক আগে থেকেই বিভিন্ন সংস্কৃতি ও পশ্চিমের ঐতিহাসিক নথিতে ‘first sleep’ এবং ‘second sleep’-এর উল্লেখ পাওয়া যায়। ভার্জিনিয়া টেকের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ এ রজার একিরচ তাঁর ‘অ্যাট ডেজ ক্লোজ: নাইট ইন টাইমস পাস্ট’ বইয়ে দেখিয়েছেন, শিল্পবিপ্লবের আগে বৈদ্যুতিক বাতি যখন ছিল না তখন মানুষ দুই ধাপে ঘুমাত।
সূর্যাস্তের কিছুক্ষণ পরই মানুষ ঘুমিয়ে পড়ত। এটিকে বলা হতো ফার্স্ট স্লিপ বা প্রথম ঘুম। মাঝরাতে তারা জেগে উঠে এক বা দুই ঘণ্টা নানা কাজ করতো। এ সময় মানুষ প্রার্থনা করত, বই পড়ত, প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্প করত বা পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাত। এই সময়টিকে কিছু ঐতিহাসিক নথিতে ‘the watch’ বলা হয়েছে। এরপর মানুষ আবার ঘুমিয়ে পড়ত, যাকে বলা হতো সেকেন্ড স্লিপ।
কিন্তু বৈদ্যুতিক বাতি উদ্ভাবন এবং কারখানার নির্দিষ্ট কর্মঘণ্টা চালু হওয়ার পর মানুষের এই অভ্যাস বদলে গিয়ে টানা ঘুমের দিকে মোড় নেয়।
১৯৯০-এর দশকে ঘুম গবেষক থমাস ওয়েহর একটি গবেষণার জন্য এ ধরনের পরিবেশ পুনর্নির্মাণ করেন। অংশগ্রহণকারীদের কয়েক সপ্তাহ ধরে দিনে প্রায় ১৪ ঘণ্টা অন্ধকারে রাখা হলে তাঁদের মধ্যে দুই পর্বে ঘুমানোর প্রবণতা দেখা যায়। প্রথম দফার ঘুমের পর প্রায় এক থেকে দুই ঘণ্টা জেগে থেকে তাঁরা আবার দ্বিতীয় দফায় ঘুমাতেন। এতে অংশগ্রহণকারীদের মন-মেজাজ ভালো থাকার পাশাপাশি দিনের বেলায় তাঁদের তুলনামূলকভাবে বেশি সতেজ থাকতে দেখা যায়।
এ ছাড়া, প্রাচীন গ্রিক কবি হোমারের মহাকাব্য ‘অডিসি’ থেকে শুরু করে বিভিন্ন পুরোনো লেখায় দুই পর্বে ঘুমানোর উল্লেখ পাওয়া যায়। প্রথম শতাব্দীতে রচিত ভার্জিলের মহাকাব্য এনিয়েড-এও ‘প্রথম ঘুম শেষ হওয়ার সময়’-এর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
মাঝরাতের পর ভোরের আগের সময়কে বিভিন্ন সংস্কৃতিতে কখনো কখনো ‘গড আওয়ার্স’ বা নীরব সময় বলা হয়েছে। এই সময়ে শরীরে কর্টিসল হরমোনের মাত্রা প্রাকৃতিকভাবে বাড়তে থাকে। পাশাপাশি ঘুমের বিভিন্ন পর্যায় পরিবর্তনের ফলে কিছু মানুষের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা বৃদ্ধি পেতে পারে।
ইতিহাসে অনেক লেখক, শিল্পী ও উদ্ভাবক রাতের নীরব সময়ে চিন্তা বা কাজ করার কথা বলেছেন। ষোড়শ শতাব্দীর ফরাসি চিকিৎসক লরাঁ জুবে মনে করতেন, প্রথম ঘুমের পর শেষ রাতের দিকে শ্রমজীবী মানুষের যৌন সম্পর্কের ফলে তাদের সন্তান উৎপাদনের ক্ষমতা বেশি ছিল।
আধুনিক সময়েও কিছু মানুষ ভোরে উঠে কাজ করা বা দিনের অন্যান্য সময়ের তুলনায় এ সময়কে বেশি সৃজনশীল বলে মনে করেন। এটি মানুষের জৈবিক ঘড়ির সঙ্গেও সম্পর্কিত। শরীরের বিভিন্ন মেরামত প্রক্রিয়া, হরমোন নিয়ন্ত্রণ ও স্মৃতি সংরক্ষণ ঘুমের নির্দিষ্ট পর্যায়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই রাত জেগে অতিরিক্ত স্ক্রিন ব্যবহার বা নিজের স্বাভাবিক ঘুমের ধরনকে উপেক্ষা করা ঘুমের মানকে প্রভাবিত করতে পারে।
বর্তমান বৈজ্ঞানিক ধারণা হলো, সবার জন্য একই পরিমাণ ঘুম প্রয়োজন—এমন কোনো একক নিয়ম নেই। বড় স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো এখনো অধিকাংশ প্রাপ্তবয়স্কের জন্য সাধারণত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা ঘুমের পরামর্শ দেয়। তবে ব্যক্তিভেদে প্রয়োজনের পার্থক্যের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিবর্তনীয় জীববিজ্ঞানী ড্যানিয়েল ই. লিবারম্যান রাতে আট ঘণ্টা ঘুমানোর কঠোর নিয়মকে শিল্পযুগের ‘অর্থহীন ধারণা’ বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মতে, আধুনিক বিদ্যুৎ সুবিধা ছাড়া বসবাসকারী মানুষ সাধারণত রাতে ছয় থেকে সাত ঘণ্টা ঘুমান এবং দিনের বেলা ঘুমান না। বড় পরিসরের বিভিন্ন গবেষণাতেও দেখা গেছে, মৃত্যুঝুঁকি সবচেয়ে কম থাকার সঙ্গে প্রায় সাত ঘণ্টা ঘুমের সম্পর্ক রয়েছে, আট ঘণ্টার নয়। লিবারম্যান তাঁর ‘Exercised: The Science of Physical Activity, Rest and Health’ বইতেও এ নিয়ে আলোচনা করেছেন।
আবার, ঘুমবিষয়ক বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত প্রতি রাতে কমপক্ষে সাত ঘণ্টা ঘুমানো উচিত। অর্থাৎ আট ঘণ্টা কোনো কঠোর সীমা নয়। মায়ো ক্লিনিকের নির্দেশনাতেও বলা হয়েছে, প্রাপ্তবয়স্কদের সাধারণত সাত ঘণ্টা বা তার বেশি ঘুমের প্রয়োজন হয়। তবে বয়স, ঘুমের মান, আগের দিনের ঘুমের ঘাটতি, গর্ভাবস্থা ও অন্যান্য ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ওপর ঘুমের প্রয়োজন নির্ভর করতে পারে।
বিভিন্ন দেশের মানুষের ঘুমের সময়ের মধ্যেও পার্থক্য রয়েছে। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, এশীয় দেশগুলোতে গড় ঘুমের সময় প্রায় ৬ দশমিক ৩ ঘণ্টা হলেও ইউরোপের কিছু অঞ্চলে তা প্রায় ৮ ঘণ্টা।
শুধু ঘুমের সময় নয়, ঘুমের মানও গুরুত্বপূর্ণ। গভীর ঘুম শরীরের বিভিন্ন পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে, আর গভীর ঘুম আবেগ নিয়ন্ত্রণ ও স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্কিত। পর্যাপ্ত মোট ঘুম নিশ্চিত করা গেলে দুই পর্বে ঘুম বা রাতে ঘুমের পাশাপাশি দিনের বেলায় ছোট সময়ের ঘুমও কিছু মানুষের জন্য কার্যকর হতে পারে।
তবে দীর্ঘদিন ধরে প্রয়োজনের তুলনায় কম ঘুমানো ক্ষতিকর। একই সঙ্গে আট ঘণ্টা একটানা ঘুমাতেই হবে—এমন চিন্তা করে দুশ্চিন্তা করলে উল্টো ঘুমের সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
নিজের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঘুমের অভ্যাসে কিছু পরিবর্তন আনা যেতে পারে। সম্ভব হলে কিছুটা আগে ঘুমাতে যাওয়া, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে গেলে আতঙ্কিত না হওয়া, শান্তভাবে বিশ্রাম নেওয়া সহায়ক হতে পারে। কেউ চাইলে রাতের ঘুমের পাশাপাশি দুপুরে ২০ থেকে ৯০ মিনিটের ছোট ঘুমও (ন্যাপ) বিবেচনা করতে পারেন।
এ ছাড়া সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর সূর্যের আলো নেওয়া শরীরের জৈবিক ঘড়ি ঠিক রাখতে সহায়তা করতে পারে। পাশাপাশি রাতে অতিরিক্ত আলো ও স্ক্রিন টাইম কমানো, বিকেলের পর ক্যাফেইন (কফি জাতীয় পানীয়) গ্রহণ এড়িয়ে চলা এবং প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠাও উপকারী হতে পারে।
ঘুমের সময় ও ধরন সম্পর্কে ধারণা পেতে অনেকে স্মার্টওয়াচ বা অন্যান্য ওয়্যারেবল ডিভাইস ব্যবহার করেন। তবে এসব ডিভাইসের তথ্যকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের চূড়ান্ত পরিমাপ হিসেবে না দেখে নিজের ঘুম, মেজাজ, শক্তি ও কর্মক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্ক বোঝার একটি সহায়ক উপায় হিসেবে দেখা উচিত।
সবার জন্য ঠিক আট ঘণ্টা একটানা ঘুম বাধ্যতামূলক—এমন ধারণা অতিরঞ্জিত। তবে এর অর্থ এই নয় যে, কম ঘুমানোই ভালো কিংবা আট ঘণ্টা ঘুমের কোনো প্রয়োজন নেই। মূল বিষয় হলো, প্রতিটি মানুষের ঘুমের চাহিদা এক নয়। বয়স, শারীরিক অবস্থা, জীবনযাপন ও জৈবিক বৈশিষ্ট্যের ওপর নির্ভর করে কারও জন্য সাত ঘণ্টা ঘুম যথেষ্ট হতে পারে, আবার কারও আট ঘণ্টা বা তারও বেশি সময়ের ঘুম প্রয়োজন হতে পারে। কারও ক্ষেত্রে রাতের ঘুমের পাশাপাশি দিনের অল্প সময়ের বিশ্রামও উপকারী হতে পারে।
তাই ঘুমের ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট সংখ্যাকে লক্ষ্য করার পরিবর্তে নিজের শরীর, ঘুমের মান, দৈনন্দিন কর্মক্ষমতা ও স্বাভাবিক ঘুমের ধরনকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। তবে দীর্ঘমেয়াদি ঘুমের সমস্যা বা অতিরিক্ত দিনের ক্লান্তি থাকলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।