রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফুয়েল লোডিংকে ঘিরে ইন্টারনেটে যেসব তথ্য, ফটোকার্ড ও দাবি ছড়িয়ে পড়ছে, তাতে বাস্তবতার চেয়ে কল্পনিক গল্পই বেশি। ২৮ এপ্রিল বাংলাদেশের পারমাণবিক জ্বালানি আছে এমন দেশের তালিকায় যুক্ত হওয়ার ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কিন্তু এই আগ্রহের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইল থেকে ধারাবাহিকভাবে একই ধরনের বিভ্রান্তিকর পোস্ট ছড়াতে শুরু করে।
এসব কনটেন্টের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পরিচিত ব্যক্তিত্ব, রাজনৈতিক নেতা বা এমপি-মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে মনগড়া ও চাঞ্চল্যকর দাবি করা হয়েছে। কোথাও আবার সংবাদমাধ্যমের লোগো ব্যবহার করে ফটোকার্ড বানানো হয়েছে, যা দেখে অনেকেই সেটিকে আসল খবর বলে ধরে নিয়েছেন।
যাচাই করে দেখা যায়, এসব দাবির কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস নেই এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বক্তব্যগুলো আংশিকভাবে নকল, সম্পাদিত অথবা সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপট থেকে নিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। ফলে একই ঘটনার চারপাশে একাধিক ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ার কারণে বাস্তব তথ্য ও বানোয়াট তথ্যের মধ্যে পার্থক্য করা অনেক ব্যবহারকারীর জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে এবং জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করেছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নামে বানোয়াট মন্তব্য
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নিয়ে ভাইরাল হওয়া একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন—‘আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার স্বপ্ন ছিল একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, যা তারেক রহমান বাস্তবায়ন করেছেন।’ এই বক্তব্যটি রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর হওয়ায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং অনেকেই তা সত্য হিসেবে গ্রহণ করেন।
তবে দেশের কোনো গণমাধ্যম বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে এমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ কিংবা দলীয় যোগাযোগ মাধ্যমেও এ ধরনের মন্তব্যের কোনো রেকর্ড নেই।
বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে দেখা যায়, ‘Gupto Television’ নামের একটি স্যাটায়ার পেজ থেকে ২৮ এপ্রিল আলোচিত দাবিতে সম্ভাব্য প্রথম পোস্ট শেয়ার করা হয়।
এ ছাড়া পেজটিতে শেয়ার করা অন্যান্য কনটেন্ট বিশ্লেষণে দেখা যায়, তারা নিয়মিত ব্যঙ্গাত্মক ও কাল্পনিক পোস্ট করে থাকে।
প্রথম আলোর লোগো ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ড
একই দাবিতে ‘দৈনিক প্রথম আলো’র লোগোযুক্ত একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে—‘বর্তমান সরকার মাত্র দুই মাসেই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে ইতিহাস গড়েছে।’
ভাইরাল হওয়া ওই ফটোকার্ডটি ‘মুজিব আদর্শের সৈনিক’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে গত ২৯ এপ্রিল পোস্ট করা হয়। ‘বিএনপির সাফল্য! বাংলাদেশের বিড়ালেরও আরো বেশি শরম থাকে’ ক্যাপশনে শেয়ার করা ওই ফটোকার্ডে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ও তারেক রহমানের ছবিও রয়েছে।
কিন্তু যাচাইয়ে দেখা যায়, প্রথম আলোর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ বা ওয়েবসাইটে এমন কোনো ফটোকার্ড, প্রতিবেদন বা সংবাদ নেই। এমনকি ২৮–২৯ এপ্রিলের প্রকাশিত কনটেন্টগুলোতেও এমন কোনো তথ্য বা উদ্ধৃতির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
এ ছাড়া ফটোকার্ডটির ডিজাইন, ফন্ট, লোগো ব্যবহারের সঙ্গে প্রথম আলোর প্রচলিত ফটোকার্ডের অমিল রয়েছে। একই সঙ্গে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চেও কোনো বিশ্বস্ত সূত্রে এ ধরনের তথ্য পাওয়া যায়নি। এসব অসামঞ্জস্য বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায়, এটি নকল ফটোকার্ড, যা ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি তৈরির জন্য তৈরি করা হয়েছে।
ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামে ভুয়া দাবি
‘রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরিতে আমার অবদান আছে’ — এমন উদ্ধৃতি দিয়ে সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নামে একটি ফটোকার্ডে ছড়িয়ে পড়েছে।
প্রচারিত পোস্ট পর্যবেক্ষণ করে দাবির সপক্ষে কোনো তথ্যসূত্র পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলেও আলোচিত দাবির সপক্ষে নির্ভরযোগ্য সূত্রে কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।
ফটোকার্ডটি আরও বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এতে ‘বাংলাভিশন’-এর আদলে ‘গজবভিশন’ নামে একটি লোগো পাওয়া যায়। লোগোর সূত্র ধরে অনুসন্ধানে ‘গজবভিশন’ নামের একটি ফেসবুক পেজে গত ২৭ এপ্রিল আলোচিত ফটোকার্ডটি পোস্ট হতে দেখা যায়। ‘গজবভিশন’ পেজটির বায়োতে উল্লেখ রয়েছে, ‘শুধু বিনোদনের জন্য! সমসাময়িক খবর ব্যঙ্গ-সারকাজমে উপস্থাপন। সিরিয়াস হবেন না।’ ফলে ধারণা করা যায়, এই ফটোকার্ডটিও মূলত ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট।
আরটিভির নামে সম্পাদিত ফটোকার্ড
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের নামে ছড়ানো একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, ‘পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রথম সুত্রটি আবিষ্কার করেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান।’ ফটোকার্ডটিতে আরটিভির লোগো ও ডিজাইন ব্যবহার করা হয়, যা এটিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে।
তবে যাচাই করে দেখা যায়, আরটিভির অফিশিয়াল প্ল্যাটফর্মে এমন কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ নেই। বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে গত ২৮ এপ্রিল দুপুর ২টা ১৮ মিনিটে ‘সেনাবাহিনীর সদস্যদের ব্যারাকে ফেরানোর বিষয়ে যে বার্তা দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী’ শিরোনামে সালাহউদ্দিন আহমদের মন্তব্য সংবলিত একটি ফটোকার্ড খুঁজে পাওয়া যায়। ফটোকার্ডটির সঙ্গে আলোচিত ফটোকার্ডের ফন্ট ও শিরোনামে ভিন্নতা থাকলেও উভয় ফটোকার্ডে ব্যবহৃত ছবি, ডায়াসে থাকা স্পিকার ও ব্যাকগ্রাউন্ড ডিজাইনে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
আরটিভির অফিশিয়াল পেজে শেয়ার করা ওই পোস্ট থেকে জানা যায়, মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) কোস্টগার্ডের ৩১ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত অনুসন্ধানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দেশের বিদ্যমান আইন অনুসারে সরকারের চাহিদা অনুযায়ী সেনাবাহিনী মাঠে আছে। তবে পর্যায়ক্রমে তা তুলে নেওয়া হবে। এ ছাড়া দেশে জঙ্গিবাদ নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, দেশে জঙ্গি তৎপরতা নেই। তবে বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার এটিকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করত। তবে ওই প্রতিবেদনের কোথাও পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে নিয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সুতরাং এটি স্পস্ট, আসল ফটোকার্ডটি সম্পাদনা করে আলোচিত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।
ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নামে ভিত্তিহীন বক্তব্য
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর নামে ছড়ানো একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, তারেক রহমান মাত্র দুই মাসে রূপপুর প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছেন। এই বক্তব্যটি স্বাভাবিকভাবেই বড় রাজনৈতিক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ফটোকার্ডটির সূত্র অনুসন্ধান করে দেখা যায়, এটি ‘Tin Tin’ নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইল থেকে প্রথম পোস্ট করা হয়। প্রোফাইলটিতে ২৮ এপ্রিল দুপুরে আলোচিত ফটোকার্ডটি শেয়ার করা হয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশের কোনো গণমাধ্যম, সংবাদ সংস্থা বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ ধরনের বক্তব্যের উল্লেখ নেই। তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজ, সাম্প্রতিক বক্তব্য বা জনসভাতেও এমন কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
সাধারণত এ ধরনের গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য গণমাধ্যমে গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশিত হওয়ার কথা থাকলেও তার কোনো প্রমাণ না থাকায় এটি সম্পূর্ণ বানোয়াট হিসেবে চিহ্নিত হয়।
ঢাবি শিক্ষক মোনামীর নামে স্যাটায়ার পেজের ফটোকার্ড
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক শেহরীন আমিন ভূঁইয়ার (মোনামী) নামে ছড়ানো একটি ফটোকার্ডে দাবি করা হয়, তিনি তারেক রহমানকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। পোস্টে দাবি করা হয়, শেহরীন আমিন বলেছেন—‘তারেক রহমানের অনেক সমালোচনা করেছি, কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের মত যুগান্তকারী প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করার জন্য আজকে ধন্যবাদ জানাই।’
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ফটোকার্ডটিতে দাবির সপক্ষে কোনো প্রমাণ বা নির্ভরযোগ্য সংবাদমাধ্যমের সূত্র উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি সংশ্লিষ্ট শিক্ষিকার ব্যক্তিগত ফেসবুক প্রোফাইল বা প্রকাশ্য কোনো বক্তব্যেও এমন কোনো মন্তব্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।
প্রকৃতপক্ষে, এই বিভ্রান্তির সূত্রপাত ‘Gupto Television’ নামে একটি ফেসবুক পেজের পোস্ট থেকে। পেজটি বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এটি একটি ‘স্যাটায়ার ও প্যারোডি’ প্ল্যাটফর্ম। মূলত ওই পেজ থেকে গত ২৯ এপ্রিল জনৈক শিক্ষিকার ছবি ব্যবহার করে একটি ব্যঙ্গাত্মক ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে, ইন্টারনেটে ব্যবহারকারীদের একটি অংশ এই ব্যঙ্গাত্মক পোস্টের প্রেক্ষাপট বুঝতে না পেরে সেটিকে বিভিন্ন গ্রুপ ও প্রোফাইলে প্রচার করতে শুরু করেন। পরবর্তীতে যা বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।
রুহুল কবির রিজভীর নামে মনগড়া মন্তব্য
ভাইরাল একটি পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন—‘অবশেষে আমরা পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে প্রবেশ করলাম। যেটা আওয়ামী লীগ সরকার ১৭ বছরে করতে পারে নাই, তারেক রহমান সেটা মাত্র দুই মাসে করে দেখিয়েছেন।’
অনুসন্ধানে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড ব্যবহার করে খোঁজ করেও কোনো সংবাদমাধ্যমে এ সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি। বিএনপির অফিশিয়াল প্ল্যাটফর্মগুলোতেও এই বক্তব্যের কোনো উল্লেখ নেই।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, দাবিটি সবচেয়ে বেশি ছড়িয়েছে ‘Bengali Steam’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে। পেজটির কার্যক্রম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সেখানে প্রায়ই যাচাইবিহীন ও ভিত্তিহীন তথ্য পোস্ট করা হয়, যা এর বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
ওপরের সবগুলো ঘটনা একত্রে বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয় যে, অধিকাংশ তথ্যের উৎস মূলত স্যাটায়ার ফেসবুক পেজ, যেগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট তৈরি করে থাকে। অনেক ক্ষেত্রে আবার মূলধারার সংবাদমাধ্যমের লোগো, ফন্ট এবং ডিজাইন নকল করা হয়েছে, যাতে সাধারণ ব্যবহারকারীরা সহজেই সেটিকে আসল সংবাদ ভেবে বিভ্রান্ত হন। এই কৌশল ব্যবহার করে ভুয়া ফটোকার্ডগুলোকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা হয়েছে। ফলে একই ধরনের ভুয়া তথ্য বারবার বিভিন্ন নামে ছড়িয়ে বিভ্রান্তিকর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে।
সিদ্ধান্ত
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে ছড়ানো এসব ভাইরাল দাবিগুলোর কোনো বাস্তব ভিত্তি নেই। বরং স্যাটায়ার কনটেন্ট, সম্পাদিত ফটোকার্ড এবং মনগড়া বক্তব্যকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করে বিভ্রান্তি ছড়ানো হয়েছে।