সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভাইরাল ভিডিওতে বর্তমান সরকারের অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বক্তব্য দাবি করে ছড়ানো ভিডিওর ক্যাপশনে বলা হয়েছে, তিনি বলেছেন, গণভোট বলে কিছু নেই।
১৫ সেকেন্ডের ছড়িয়ে পড়া ওই ভিডিওতে আমীর খসরুকে বলতে শোনা যায়, ‘কিসের গণভোট? গণভোট বলে কিছু নেই। গণভোট বলে কোনো আলোচনার বিষয় নেই। এটা ওখানেও কোনো অ্যাজেন্ডা ছিল না, এখন গণভোটের কোনো অ্যাজেন্ডা নেই। এরপর নতুনভাবে ঐকমত্য হওয়ার কিছু নেই। যেটুকু ঐকমত্য হওয়ার ছিল, ওটুকু হয়ে গেছে, চ্যাপ্টার ওখানেই ক্লোজ।’
এই দাবিতে ফেসবুকে ভাইরাল কয়েকটি পোস্ট আছে—এখানে , এখানে , এখানে /এবং এখানে ।
টিকটকে রয়েছে এখানে । ইনস্টাগ্রামে আছে এখানে এবং এক্সে (সাবেক টুইটার) আছে এখানে ।
চলতি মাসের ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ছড়িয়ে পড়া আলোচিত ভিডিওটি প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে, মন্তব্যটি সাম্প্রতিক সময়ের। বিষয়টি নিয়ে নেটিজেনদের মধ্যে তীব্র নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
‘ভোকাবুলারি জয়ের সহজ কৌশল’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রচারিত পোস্টটি শনিবার বেলা ১১টা ১০ মিনিট পর্যন্ত প্রায় ৪ লাখ ৯৩ হাজার বার দেখা হয়েছে। এতে ৪ হাজার ৬০০টি রিয়েকশন পড়েছে। পোস্টটি ১ হাজার ৭০০ বার শেয়ার হয়েছে এবং এতে ১ হাজার ২০০টি মন্তব্য রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক (জিএস) সালাউদ্দিন আম্মার। ২০ ফেব্রুয়ারি ‘রাবি প্রতিদিন’ নামের একটি পেজে পোস্ট করা ভিডিওতে তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আগে চাদর মুড়ি দিয়ে বাইরে হইত, এখন বড় এমপি-মন্ত্রী হয়ে গেছে। এই জন্য বুঝতে পারছে না কিসের গণভোট। তবে অবশ্যই ঘুরবে, তখন আমরা জিজ্ঞাসা করব কিসের ক্ষমতা? শুধু শুধু ১৪০০ জীবন চলে গেল, হাজার হাজার মানুষ আহত হলো। আর এই যে শত শত রাজনৈতিক মুনাফিক রাজনীতিবিদ, খালি ক্ষমতার চেয়ার পরিবর্তন—আর কিছু তো দেখতে পাচ্ছি না।’
যাচাই করে দেখা গেছে, দাবিটির মূল উৎস গত বছরের ৩ নভেম্বর প্রচারিত একটি ভিডিও। ওই ভিডিও থেকে বক্তব্যের অংশবিশেষ নিয়ে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিও ক্লিপ, ফটোকার্ড ও পোস্ট আকারে ছড়িয়ে পড়েছে।
বিষয়টি নিয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড ব্যবহার করে খোঁজ করলে জাতীয় গণমাধ্যম দৈনিক ইত্তেফাকের অফিশিয়াল ফেসবুক পেজে ৪ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়।
দৈনিক ইত্তেফাকের ১ মিনিট ৪৭ সেকেন্ডের এই প্রতিবেদনের একটি অংশের সঙ্গে আলোচিত দাবিটির মিল রয়েছে। ‘কিসের গণভোট? গণভোট বলে কিছু নেই। গণভোট বলে কোনো আলোচনার বিষয় নেই’—এভাবে স্পষ্ট জানিয়ে দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু। তিনি বলেন, ‘যেটা ছিল, সেটা যদি নির্বাচনের দিন হয়, সেটার ওপর ঐকমত্য হয়েছে। এরপর আর নতুন করে ঐকমত্যের কিছু নেই।’
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এটি ঐকমত্যের কোনো অ্যাজেন্ডা ছিল না, এখনো কোনো অ্যাজেন্ডা নেই। যেটুকু ঐকমত্য হওয়ার ছিল, সেটুকু হয়েছে। চ্যাপ্টার এখানেই শেষ হয়েছে। ৩ নভেম্বর গণমাধ্যমকর্মীদের এক প্রশ্নের জবাবে এসব কথা বলেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
ওই সময় জুলাই জাতীয় সনদে নোট অব ডিসেন্ট প্রশ্নে দলগুলোকে আলোচনায় বসে ঐকমত্যের সিদ্ধান্ত নিতে এক সপ্তাহ সময় দেয় অন্তর্বর্তী সরকার।
ইত্তেফাকের প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে যে সুপারিশ দিয়ে দায়িত্ব পালন শেষ করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন, তাতে গণভোটের সময়সহ কয়েকটি বিষয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী বিপরীত অবস্থান নিয়েছে। তাদের সঙ্গে আবার কিছু বিষয়ে ভিন্নতা রয়েছে গণ-অভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেওয়া দল জাতীয় নাগরিক পার্টিরও।
অনুসন্ধানে এনপিবি নিউজ (NPB News) নামের একটি অনলাইনভিত্তিক গণমাধ্যমে ৩ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ২৩ সেকেন্ডের এই ভিডিওটির সঙ্গে আলোচিত দাবির হুবহু মিল রয়েছে।
এ ছাড়া জাতীয় গণমাধ্যম দৈনিক প্রথম আলোর অফিশিয়াল ইউটিউব চ্যানেলে ১০ নভেম্বর, ২০২৫ তারিখে ‘সনদে স্বাক্ষরের সঙ্গেই চ্যাপ্টার ক্লোজ হয়ে গেছে, বললেন খসরু’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেদিন রাজধানীর ইনস্টিটিউশন অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি এ কথা বলেন।
৩ মিনিটের এই ভিডিওতে ১৮ সেকেন্ড থেকে খসরুকে বলতে শোনা যায়, ‘যতটুকু ঐকমত্য হয়েছে, সনদ সই হয়েছে, চ্যাপ্টার ক্লোজ। লেট আস গো টু ইলেকশন। ইলেকশনে গিয়ে জনগণের কাছে নিয়ে যাই। আপনাদের যদি নিজস্ব কোনো দাবিদাওয়া বা প্রোগ্রাম থাকে, দয়া করে জনগণের কাছে যান। এগুলো নিয়ে ঢাকায় বসে সময় নষ্ট না করে, অন্যদের কাউকে বাধ্য না করে, জনগণের কাছে যান।’
আরও অনুসন্ধানে অনলাইনভিত্তিক গণমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমে ‘এই সংবিধানে গণভোট বলে কিছু নাই: খসরু’ শিরোনামে ৫ নভেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।
একই দিনে জাতীয় গণমাধ্যম দৈনিক ইনকিলাবে ‘জুলাই সনদ নিয়ে আর আলোচনার সুযোগ নেই: আমীর খসরু’ শিরোনামে আরেকটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়।
আরও অনুসন্ধানে দেখা যায়, সম্প্রতি অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বললেও ‘গণভোট বলে কিছু নাই’—এমন কোনো মন্তব্য করেননি।
সুতরাং, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে উদ্ধৃত করে প্রচারিত মন্তব্যটি সাম্প্রতিক সময়ের নয়। বরং এটি ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর গণভোটের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার ঐকমত্য প্রসঙ্গে এক গণমাধ্যমকর্মীর প্রশ্নের জবাবে দেওয়া বক্তব্যের অংশবিশেষ।