গতকাল ২৩ জুন কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি ঘিরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কোনো কার্যকর ভূমিকা রাখবে না—এমন একটি দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে।
দাবির পক্ষে ১৫ সেকেন্ড ও ১৩ সেকেন্ডের পৃথক দুটি ভিডিও ক্লিপ শেয়ার করা হচ্ছে। ফেসবুকের বিভিন্ন পোস্টে ভিডিওগুলো শেয়ার করে এগুলোকে গতকালের (২৩ জুন) প্রেক্ষাপটে সেনাবাহিনীর ‘সাহসী পদক্ষেপ’ ও নতুন ঘোষণা দাবি করে ছড়ানো হচ্ছে।
প্রথম দাবিতে পোস্ট আছে এখানে ও এখানে। দ্বিতীয় দাবিতে পোস্ট রয়েছে এখানে ও এখানে।
শেয়ার করা এসব পোস্টের কমেন্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বেশির ভাগ ব্যবহারকারীরা ভিডিওটিকে সত্য মনে করে কমেন্ট করেছেন।
উল্লেখ্য, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নাশকতার আশঙ্কায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গাজীপুর মহানগর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুর জেলায় শান্তিশৃঙ্খলা রক্ষা, জননিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জনগণের জানমাল সুরক্ষায় ৯ দিনের জন্য সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
আলোচিত দাবির সত্যতা যাচাইয়ে আলাদাভাবে ভিডিও দুটি পর্যবেক্ষণ করা হয়। ভাইরাল প্রথম ভিডিওতে এক সেনাসদস্যকে বলতে শোনা যায়, ‘বাংলাদেশ আর্মি একদম স্পষ্ট ভাষায় বলে দিচ্ছে, বাংলাদেশ আর্মি জাস্টিসের পক্ষে। যেটা জাস্টিস হবে, সেটার পক্ষে আমরা থাকব। ইনসাফ, নো কম্প্রোমাইজ উইথ ইনসাফ, কামস হোয়াটস হু মে বি, জাস্টিসের পক্ষে আমরা অবশ্যই অবশ্যই স্ট্যান্ডফার্স্ট এবং দৃঢ়।’
ভিডিওটির বিষয় সম্পর্কিত কয়েকটি কি-ওয়ার্ড নিয়ে অনুসন্ধানে জাতীয় কোনো গণমাধ্যমে আলোচিত দাবির পক্ষে কোনো প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। তবে ভিডিওটির কয়েকটি কি-ফ্রেম নিয়ে অনুসন্ধানে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল যমুনা টিভির ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৫ সালের ১১ অক্টোবর শেয়ার করা একটি ভিডিও পাওয়া যায়।
‘ট্রাইব্যুনালে পরোয়ানাভুক্ত ১৫ সেনাকে হেফাজতে নিয়েছে সেনাবাহিনী’ শিরোনামে প্রচারিত ওই প্রতিবেদনের একটি অংশের সঙ্গে সম্প্রতি ছড়ানো ১৫ সেকেন্ডের ভিডিওটির হুবহু মিল পাওয়া যায়। মূলত মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সাবেক ও বর্তমান ২৫ জন সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক জারি করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে সেনা সদরের অবস্থান স্পষ্ট করতে ঢাকা সেনানিবাসে সংবাদ সম্মেলনের কথা বলেন সেনাবাহিনীর অ্যাডজুটেন্ট জেনারেল মেজর জেনারেল মো. হাকিমুজ্জামান। এটি সেই সময়ের বক্তব্য।
একই বিষয়ে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিবেদন থেকেও এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত হওয়া যায়।
ভাইরাল হওয়া দ্বিতীয় ভিডিওটিতে অপর আরেকজন সেনাসদস্যকে বলতে শোনা যায়, ‘সেনাবাহিনী কোনো ব্যক্তি বা দলের পক্ষে নয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সব সময় ন্যায়ের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিপক্ষে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের পক্ষে।’
আলোচিত দাবির সত্যতা যাচাইয়ে অনুসন্ধানে বেসরকারি টেলিভিশন স্টার নিউজের ইউটিউব চ্যানেলে গত বছরের ৭ নভেম্বর শেয়ার করা একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ‘গাজীপুরে শীর্ষ স/ন্ত্রা/সী এনামুলকে গ্রেপ্তার নিয়ে সেনাবাহিনীর প্রেস ব্রিফিং’ শিরোনামের ওই প্রতিবেদনের একটি অংশের সঙ্গে আলোচিত ১৩ সেকেন্ডের ভিডিওটির মিল রয়েছে। প্রেস ব্রিফিংয়ের সময় দেওয়া ওই বক্তব্যের ১ মিনিট ৩৭ সেকেন্ডে লেফটেন্যান্ট কর্নেল লুৎফর রহমান বলেন, ‘সেনাবাহিনী কোনো ব্যক্তি বা দলের পক্ষে নয়। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী সব সময় ন্যায়ের পক্ষে এবং অন্যায়ের বিপক্ষে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের পক্ষে।’
বিষয়টি নিয়ে আরও অনুসন্ধানে জাতীয় দৈনিক আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত ‘গাজীপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান নিয়ে অপপ্রচারের অভিযোগ’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ছবির সঙ্গে ভাইরাল ভিডিওর সাদৃশ্য রয়েছে।
প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গাজীপুরের শ্রীপুরে একটি যৌথ বাহিনীর অভিযানে অস্ত্র ও সরঞ্জামসহ সাতজনকে আটক করার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। এর জবাব দিতেই গাজীপুর মহানগরের ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটে অস্থায়ী সেনাক্যাম্পে সংবাদ ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
সেখানে লেফটেন্যান্ট কর্নেল লুৎফর রহমান বলেন, ৫ নভেম্বর দিবাগত রাতে গাজীপুর আর্মি ক্যাম্পের সার্বিক তত্ত্বাবধানে পুলিশ ও র্যাবের সহায়তায় শ্রীপুর উপজেলার বরমী ইউনিয়নে যৌথ অভিযান চালিয়ে চিহ্নিত সন্ত্রাসী, ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি এবং অবৈধ বালু ব্যবসায়ী চক্রের নেতা এনামুল হক মোল্লাকে তাঁর বাসার পানির ট্যাংকের ভেতর থেকে আটক করা হয়। একই অভিযানে তাঁর আরও ছয় সহযোগীকে আটক করা হয়।
আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি ঘিরে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে নিষ্ক্রিয় থাকার ঘোষণার দাবিটি বানোয়াট। মূলত ২০২৫ সালের অক্টোবর ও নভেম্বর মাসে সেনাবাহিনী কর্তৃক দুটি ভিন্ন ঘটনার (আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মামলা ও গাজীপুরে যৌথ বাহিনীর অভিযান) প্রেক্ষাপটে দেওয়া পুরোনো সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যকে বিভ্রান্তিকর ও মনগড়া ক্যাপশনে প্রচার করা হচ্ছে।