সাফজয়ী মেয়েরা দেশে ফিরেছেন। তাঁদের দারুণভাবে বরণ করে নেওয়া হয়েছে। শুধু তাঁদের জন্যই আলাদা করে ছাদখোলা বাস প্রস্তুত করা হয়েছে।
মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত এই ফুটবলাররা আপ্লুত হয়েছেন। উচ্ছ্বাসে ভেসেছেন। এর মধ্যেও ফুটবল খেলার জার্সি নিয়ে বিতর্কে মত্ত হতে দেখা গেছে কাউকে কাউকে। শুরুতে এক-দুজন হলেও পরে বিষয়টি নিয়ে অনেককেই কথা বলতে দেখা গেছে। এমন উদ্যাপনও আর সবার হয়ে থাকেনি শেষ পর্যন্ত।
কেউ কেউ ফুটবল খেলার চিরাচরিত জার্সি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে তর্ক ছড়িয়েছে, বিচিত্র সব পাল্টাপাল্টি আক্রমণের সাক্ষী হতে হচ্ছে মানুষকে। এ অবস্থায় স্বাভাবিক প্রশ্ন উঠে যায়, সমাজে কি মেরুকরণই একমাত্র বাস্তব হয়ে উঠল তবে!
সানজিদা, সাবিনা, কৃষ্ণারা দেশে ফিরেছেন। তাঁদের যথাযথ সম্মান জানিয়ে নিজেদের মান শেষ পর্যন্ত রাখতে পেরেছে রাষ্ট্র ও মানুষ। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মেয়েদের নিয়ে গড়া এই দল সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেছে বলা যায়। তাঁরা প্রশংসায় ভেসেছেন। দেশের প্রায় সব সংবাদপত্র তাঁদের বিজয়ের গল্পকে মূল শিরোনাম করেছে। একই সঙ্গে তাঁদের নানা না-পাওয়া, বঞ্চনা, লড়াইয়ের গল্পও উঠে এসেছে নানাভাবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ তাঁদের অভিনন্দিত করেছেন। কেউ কেউ আবার তাঁদের জার্সি নিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে প্রশ্ন তুললেন। তবে শুরুতে এই প্রশ্নের জোরটি কম ছিল। তাঁদের এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু অভিনন্দন বার্তার মধ্যেই আবার কেউ কেউ খোঁচা দিতে ভুললেন না। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, কিছুদিন ধরে নারীর পোশাক নিয়ে চলা অদ্ভুত এক বিতর্ক ঘিরেই এসব খোঁচাখুঁচি চলল। আর এসবের মধ্য দিয়ে বিজয়ী মেয়েদের মাঠে খেলার পোশাকও উঠে এল কাঠগড়ায়। আরেকবার একই প্রশ্নে দুটি বিপরীত মেরু প্রকট হয়ে দেখা দিল।
কথা হলো, যেকোনো ইস্যুতে, যেকোনো অজুহাতেই এভাবে বারবার মেরুর দেখা কেন মিলছে? এর সঙ্গে জড়িত অন্য উপাদানগুলো কী?
যেকোনো বিষয়ে, যেকোনো অজুহাতেই এই মেরুকরণ তার খোলস চিরে বেরিয়ে আসছে। দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী বিচারে নারীর পোশাক নিয়ে এমন বিতর্ক এর সর্বশেষ উদাহরণ। এর আগে এমন বিভাজন আরও দেখা দিয়েছে। এ তালিকায় রয়েছে নারী, শিক্ষা, উন্নয়ন, গণতন্ত্র, নির্বাচন, গান ইত্যাদি। অর্থাৎ, যেকোনো বিষয় নিয়ে শুরু হওয়া বিতর্ককেই দুটি বিপরীত মেরুতে ঠেলে দেওয়ায় কম-বেশি সবাই হাত মকশো করেছে বলা যায়। হাত বলা হচ্ছে কারণ, এই মেরুকরণের মূল ঘটনাটি ঘটছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেই, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত বাস্তব জীবনেও এসে পড়ছে।
নারীর পোশাক নিয়ে শুরু হওয়া বিতর্কে বৈচিত্র্যের পক্ষে দাঁড়ানো ছেলেমেয়েরা হামলা-হুমকি, বাড়িতে এসে শাসিয়ে যাওয়া–এসবের শিকার হয়েছেন।
আজকের পত্রিকায় প্রকাশিত ভিডিওতে এ নিয়ে ভুক্তভোগীদের বক্তব্য আছে। অর্থাৎ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হওয়া বিতর্ক শেষ পর্যন্ত কাউকে কাউকে শিকারে পরিণত করছে। প্রশ্ন হলো—এখানে শিকারি কে? শুনতে যেমনই লাগুক, উত্তরটা হচ্ছে—মেরুকরণ। কিন্তু মেরুকরণের তো কোনো হাত-পা নেই। সত্য। কিন্তু এর তো কর্তা আছে।
মেরুকরণের কর্তাকে খুঁজে বের করতে হলে একটা উদাহরণে একটু মনোযোগ দেওয়া জরুরি। একটু বিদেশি উদাহরণের দিকে তাকানো যাক। ঘটনা যুক্তরাষ্ট্রের। ১৯৫৪ সাল। সে বছর পঞ্চম গ্রেড পড়ুয়া ১১টি ছেলেকে রবারস কেভ স্টেট পার্কে নিয়ে যাওয়া হলো। তারা কেউ কাউকে আগে দেখেনি। সম্পূর্ণ অপরিচিত এই ১১টি ছেলেকে রাখা হলো একটি ক্যাম্পে। তারা নিজেদের নাম দিল র্যাটলারস। এর এক দিন পর একই উদ্যানে আনা হলো অন্য এলাকা থেকে আরও ১১টি পঞ্চম গ্রেড পড়ুয়া ছেলেকে। তাদের রাখা হলো অন্য একটি ক্যাম্পে। তারাও পরস্পরের অচেনা। তারা নিজেদের নাম দিল ইগলস। উভয় দলের সদস্যরাই ছিল শ্বেতাঙ্গ, প্রোটেস্ট্যান্ট ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্কার জানাচ্ছে, উদ্যানের দুটি পৃথক ক্যাম্পে তাদের এমনভাবে রাখা হলো, যাতে এই দুটি দলের কোনো সদস্যের মধ্যে দেখা না হয়। নিজ দলের অন্য সদস্যদের সঙ্গে মিলে তারা কিছুদিন সাঁতার কাটল, খেলল, ঘুরল। এভাবে চলল কিছুদিন। তারপর একদিন উভয় দলকে উভয়ের সম্পর্কে অবহিত করা হলো। পরস্পর সম্পর্কে জানার পর তারা বেসবল খেলায় পরস্পরকে চ্যালেঞ্জ দিল।
খেলা হলো। খেলায় জয়-পরাজয় থাকে। প্রথম খেলায় র্যাটলারস জয়ী হলো। বিজিত দল ইগলস তখন গুজগুজ করতে শুরু করল এই বলে যে র্যাটলারসরা আদতে তাদের চেয়ে বেশি বয়সী। তারা বয়স চুরি করেছে। এদিকে বিজয়ী দল র্যাটলারস নিজেদের একটি পতাকা বানিয়ে মাঠের এক কোণে টানিয়ে দিল।
ইগলস বসে থাকল না। দলটির সদস্যরা সেই পতাকা নামিয়ে ছিঁড়ে তাতে আগুন ধরিয়ে দিল। পরের ম্যাচে পাশা উল্টে গেল। জয়ী হলো ইগলস। এবার র্যাটলারসরা বলল, ইগলস যে ব্যাট দিয়ে খেলেছে, তার আকার বড় ছিল। এভাবে যত দিন গেল, তাদের বৈরিতা বাড়ল। যেকোনো ছোট ঘটনা নিয়েই তারা সম্পূর্ণ বিপরীত মেরুতে অবস্থান নিতে শুরু করল।
স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে, এই ২২টি ছেলে একসঙ্গে শুরু থেকে থাকলে এই মেরুকরণ হতো না। তারা নিজেদের একটি দল হিসেবে হয়তো ভাবতে পারত। কিন্তু তাদের পৃথক করেছে শুরুর দিকের ওই অদেখা। এ অদেখাটি নিশ্চিত করেছিল গবেষণা পরিচালনাকারী সংস্থা ও এর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা, যারা মূলত এই মেরুকরণের কর্তা।
মেরুকরণ তাই কর্তা-নিরপেক্ষ নয়। এমনি এমনি মেরুর উদ্ভব হয় না। চৌম্বক পদার্থ এমনিতে কিন্তু অন্যকে আকর্ষণ বা বিকর্ষণ করে না। কিন্তু চুম্বকের কাছে এলে তাতে সাড়া দেয়। তার ভেতরে এই আকর্ষণ ও বিকর্ষণের ধর্ম আছে।
এই ধর্মকে কাজে লাগিয়ে চুম্বকের সংস্পর্শ তাকে এমনকি চুম্বকেও পরিণত করতে পারে। তখন তার অণুগুলো মেরুতে বিভাজিত হয়ে দুই দিকে তাকিয়ে থাকে। সমাজে, রাষ্ট্রে ও রাজনীতিতে এই চুম্বকের অস্তিত্ব আছে। কীভাবে?
দেশ দিয়ে উদাহরণ দেওয়া যাক। একটা গণতান্ত্রিক দেশে আইনসভা থাকে, যেখানে সরকারপক্ষ ও বিরোধীপক্ষ থাকে। গণতান্ত্রিক কাঠামোয় আইনসভার বাইরেও এ দুই ধারার অস্তিত্ব থাকতে পারে, যারা নির্বাচন-প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সেখানে প্রবেশাধিকার পায়নি। কিন্তু তাদের অবস্থান এই দুইয়ের অনুকূলে বা স্বতন্ত্র অবস্থায় থাকতে পারে। গণতান্ত্রিক কাঠামো নিশ্চিত করে যে, নামে বিরোধী বা সরকারি হলেও কোনো পক্ষই যুযুধান থাকবে না। পুরো ব্যবস্থাই চলে একটা নিরবচ্ছিন্ন দ্বন্দ্ব ও সংলাপের মধ্য দিয়ে। মুশকিল বাধে সরকারপক্ষের ক্ষমতা যখন নিরঙ্কুশ ক্ষমতায় পরিণত হয়, তখন। এই নিরঙ্কুশ হওয়ার পথটাই ক্ষমতা ও এর বিপরীতে উদ্ভূত প্রতিক্রিয়াকে ঠেলে দেয় বিপরীত মেরুর দিকে। যেকোনো ইস্যুকেই তখন দুই পক্ষ এভাবে ভাগ করে নিতে থাকে।
এটা এমন এক অন্ধত্বের দিকে নিয়ে যায় যে তখন এই দ্বন্দ্ব ক্রমাগত মানুষকে, সমাজকে বিভাজিত করতে থাকে। এমনকি মৌলিক প্রশ্নেও আর কেউ এক মঞ্চে এসে দাঁড়াতে পারে না। দ্বন্দ্বটা অনেকটা ওপরে বর্ণিত র্যাটলারস-ইগলস দ্বন্দ্বে পরিণত হয়, যেখানে দ্বন্দ্বের নেপথ্যে কোনো যুক্তিকে আর চিহ্নিত করা সম্ভব হয় না।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে হওয়া বিভিন্ন বিতর্কে এমন দ্বন্দ্বের লক্ষণ ক্রমেই বেশ প্রকট হয়ে উঠেছে। এই দ্বন্দ্ব নানা শ্রেণি-পেশার সাধারণ মানুষের মধ্যে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে, তা সাধারণ মানুষকেই আক্রান্ত করছে। দ্বন্দ্বের মূল সূত্রটি প্রকাশ্য না হওয়ায় এবং ক্ষমতা ও রাজনীতির সমীকরণগুচ্ছ প্রচ্ছন্ন হওয়ায় কে কাকে কেন আক্রান্ত করছে, তা-ও আর আলাদা করা যাচ্ছে না। এতে কখনো সমাজের কোনো একটি শ্রেণি, কোনো একটি সম্প্রদায় রীতিমতো আতঙ্কের পরিবেশে থাকার বাস্তবতায় গিয়ে পড়ছে। এখন যেমন নারীরা এমন একটি বাস্তবতায় গিয়ে দাঁড়িয়েছেন; তাঁদের দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ভার্চুয়াল ও বাস্তব—উভয় জগতেই তাঁরা আক্রান্ত হচ্ছেন।
এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিশ্চিতভাবেই বড় একটি প্রভাব ফেলছে। দেশে ফেসবুকই মূলত জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্ম, যার অ্যালগরিদমই এমনভাবে বানানো যে সমভাবাপন্নরাই পরস্পরকে প্রতিনিয়ত দেখবে, জানবে এবং পরস্পরের সঙ্গে বেশি মতবিনিময় করতে পারবে। এই একই খেলা রাষ্ট্র নিজের ক্ষমতা সমীকরণকে জারি রাখতেই করে। কেন্দ্র বাঁচানোই তার লক্ষ্য। ‘আধুনিক’ রাষ্ট্র ও এর শাসক বা কর্তৃপক্ষ বরাবরই কেন্দ্রে বসে প্রান্তগোষ্ঠীর মধ্যে এমন সব বিবাদ জারি রাখতে চায়, যা তাদের ব্যস্ত রাখবে এবং অনেকটা গোপনে কেন্দ্রের রক্ষক হিসেবে কাজ করবে। সামাজিক মাধ্যম তার কাঠামোর মাধ্যমেই এখন এর সবচেয়ে বড় অনুকূল শক্তি হয়ে উঠেছে। এটি সেই পৃথক দুই ক্যাম্পের বাস্তবতার নির্মাতা, যা মানুষের সমাজকে বিচ্ছিন্ন করে, যা মানুষকে পরস্পরের সঙ্গে অপরিচিতমাত্রই ‘অন্য’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং সেই সূত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী। এরই ফল এখন এসে বাস্তব জীবনে পড়ছে। মেরু ক্রমেই প্রকট হয়ে উঠছে। এই মেরুর প্রশমনও মানুষের হাতেই আছে। অর্জন বা বিসর্জন নিজ ঘরে টানা এবং ‘অন্য’কে আক্রান্ত করার ক্ষেত্রে কিছু সচেতনতা ও পরিমিতিবোধই এ ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন নিয়ে আসতে পারে। কর্তৃপক্ষ বা শাসকগোষ্ঠী কাজটি করবে না, বোঝাই যাচ্ছে। অন্য কেউ কি করবে?
লেখক: ফজলুল কবির, সহকারী বার্তা সম্পাদক, আজকের পত্রিকা