দেশের কৃষি পুনর্বাসন সহায়তা কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের মধ্যে সম্পূর্ণ বিনা মূল্যে ১৬ লাখ ২৮ হাজার ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্যে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ ৩০ হাজার টাকার কৃষি প্রণোদনা ঘোষণা করেছে কৃষি মন্ত্রণালয়।
আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, এই উদ্যোগকে তারই অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে মন্ত্রণালয়। সম্প্রতি কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপকরণ-২ শাখা থেকে এ-সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৩ জুন কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আনুষ্ঠানিকভাবে এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। একই দিন দেশের সব জেলা ও উপজেলায় একযোগে চারা বিতরণ শুরু হবে।
প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, মোট ঘোষিত ৫৩ কোটি ৬৬ লাখ ৩০ হাজার টাকার প্রণোদনা কয়েকটি নির্দিষ্ট খাতে ভাগ করে ব্যয় করা হবে। এর মধ্যে মূল উপাদান ও আনুষঙ্গিক খাতের বরাদ্দ:
চারা ক্রয়: ১২ কোটি ৯৬ লাখ ৩০ হাজার টাকা
জৈব সার (গোবর): ১৯ কোটি ৭৩ লাখ ৬০ হাজার টাকা
বাঁশের খুঁটি: ৮ কোটি ১৪ লাখ টাকা
পরিবহন ব্যয়: ৭ কোটি ২৬ লাখ ৪৪ হাজার টাকা
আনুষঙ্গিক ও অপ্রত্যাশিত ব্যয়: ৫ কোটি ২০ লাখ ৯৬ হাজার টাকা
সারা দেশে এই কর্মসূচির মাধ্যমে মোট ১৬ লাখ ২৮ হাজার বাঁশের খুঁটি এবং ৪৮ হাজার ৮৪০ টন জৈব সার কৃষকদের মাঝে বিতরণ করা হবে।
কৃষি মন্ত্রণালয় চারার প্রজাতি ও উৎপাদন মূল্যের ওপর ভিত্তি করে এই সহায়তাকে চারটি প্রধান ক্যাটাগরিতে ভাগ করেছে। প্রতিটি চারার সঙ্গে কৃষক বিনা মূল্যে ৩০ কেজি জৈব সার এবং একটি করে বাঁশের খুঁটি পাবেন। ক্যাটাগরিভিত্তিক ব্যয়ের বিস্তারিত বিবরণ:
ক্যাটাগরি-১ (নারিকেল চারা): এই ক্যাটাগরিতে প্রতি ইউনিটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৪১০ টাকা। এর মধ্যে চারা বাবদ ১৬০ টাকা, জৈব সার ১২০ টাকা, বাঁশের খুঁটি ৫০ টাকা, পরিবহন ব্যয় ৪৮ টাকা এবং আনুষঙ্গিক ব্যয় ৩২ টাকা।
ক্যাটাগরি-২ (আম, লিচু, সফেদা, শরিফা, তাল, কাঁঠাল, আতা, তেঁতুল ও বাতাবি লেবু ইত্যাদি): এই ক্যাটাগরিতে প্রতি ইউনিটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩১০ টাকা। এর মধ্যে চারা বাবদ ৬০ টাকা, জৈব সার ১২০, বাঁশের খুঁটি ৫০, পরিবহন ব্যয় ৪৮ এবং আনুষঙ্গিক ব্যয় ৩২ টাকা।
ক্যাটাগরি-৩ (মাল্টা, জলপাই ও করমচা ইত্যাদি): এই ক্যাটাগরিতে প্রতি ইউনিটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৯০ টাকা। এর মধ্যে চারা বাবদ ৪০ টাকা, জৈব সার ১২০ টাকা, বাঁশের খুঁটি ৫০ টাকা, পরিবহন ব্যয় ৪৮ টাকা এবং আনুষঙ্গিক ব্যয় ৩২ টাকা।
ক্যাটাগরি-৪ (অর্জুন, মেহগনি, সুপারি, আমড়া, আমলকী, নিম, ঘোড়া নিম, জাম, বহেরা, বেল, কড়ই, খেজুর ও কাঠবাদাম ইত্যাদি): এই ক্যাটাগরিতে প্রতি ইউনিটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২৪০ টাকা। এর মধ্যে চারা বাবদ ৩০ টাকা, জৈব সার ১২০ টাকা, বাঁশের খুঁটি ৫০, পরিবহন ব্যয় ৪৮ এবং আনুষঙ্গিক ব্যয় ৩২ টাকা।
বিতরণ কার্যক্রমে শতভাগ স্বচ্ছতা বজায় রাখতে প্রজ্ঞাপনে বেশ কিছু কঠোর শর্তারোপ করা হয়েছে। সরকারি ক্রয় আইন ‘পিপিএ-২০০৬’ এবং বিধিমালা ‘পিপিআর-২০০৮’ কঠোরভাবে মেনে চলতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বরাদ্দের সীমা: কোনো অবস্থাতেই অনুমোদিত বরাদ্দের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করা যাবে না।
তদারকি: জেলা কমিটির বরাদ্দকৃত অর্থ উপজেলা কৃষি পুনর্বাসন বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) যৌথ অনুকূলে ছাড় করা হবে।
তালিকা প্রণয়ন: সুবিধাভোগী কৃষক বা প্রতিষ্ঠানের তালিকা তৈরি করবেন স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা।
যোগ্যতা ও স্থান: একজন কৃষক বা প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ পাঁচটি চারা পাবেন। এগুলো বসতবাড়ি, পতিত জমি, খালপাড়, সড়কের পাশ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা ধর্মীয় উপাসনালয়ের খালি জায়গায় রোপণ করা যাবে।
শনাক্তকরণ: উপকরণ বিতরণের সময় ছবিযুক্ত ‘কৃষক কার্ড’ যাচাই করে মাস্টাররোলের মাধ্যমে তা নিশ্চিত করতে হবে। কার্ড না থাকলে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) এবং সচল মোবাইল নম্বর যুক্ত করা বাধ্যতামূলক।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম সংবাদ সংস্থা বাসসকে জানান, চারা, জৈব সার ও বাঁশের খুঁটি বিতরণের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। জেলা পর্যায়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরগুলো চারা বিতরণের প্রক্রিয়াটি দ্রুত শুরু করার জন্য কাজ করছে।
এ বিষয়ে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী আগামী ১৩ জুন এই কর্মসূচির উদ্বোধন করবেন। আমরা ধারাবাহিকভাবে আগামী পাঁচ বছরে মোট ২৫ কোটি গাছের চারা রোপণের যে লক্ষ্য রয়েছে, তা নির্ধারিত মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সফলভাবে পূরণ করব।’
মন্ত্রণালয় থেকে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন ৩০ জুনের মধ্যে অগ্রিম উত্তোলিত সব অর্থের সমন্বয় সাধন করা হয় এবং বিতরণ শুরুর আগেই যেন সুবিধাভোগীদের চূড়ান্ত তালিকা ই-মেইলের মাধ্যমে অধিদপ্তরে পাঠানো হয়।