২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পালাবদলের পর ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য উত্তাল। দীর্ঘ দেড় দশক পর তৃণমূল কংগ্রেস শাসনকালের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি সরকার। এই চরম রাজনৈতিক ডামাডোলের মধ্যেই অবশেষে নীরবতা ভাঙলেন জীবনমুখী বাংলা গানের প্রবাদপ্রতিম শিল্পী নচিকেতা চক্রবর্তী।
সম্প্রতি আনন্দবাজার অনলাইনকে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান, ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং নতুন সরকারের কাছে প্রত্যাশা নিয়ে অকপট মন্তব্য করেছেন।
নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অভাবনীয় পরাজয়ের পর এই প্রথম প্রকাশ্যে মুখ খুললেন নচিকেতা। আর তাঁর প্রথম সাক্ষাৎকারেই উঠে এল একাধিক বিস্ফোরক দাবি, যা ইতিমধ্যে রাজ্য রাজনীতি ও সাংস্কৃতিক মহলে শোরগোল ফেলে দিয়েছে।
অতীতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাজের ধারার প্রশংসা করতে গিয়ে তাঁকে ‘লেনিন’-এর সঙ্গে তুলনা করেছিলেন নচিকেতা। রাজনৈতিক পালাবদলের পরও নিজের সেই পুরোনো বয়ান থেকে একচুলও সরছেন না তিনি। সাক্ষাৎকারে দৃঢ়তার সঙ্গে গায়ক বলেন, ‘এখনো বলব, মমতার মধ্যেই লেনিনকে দেখেছি।’
নচিকেতা মনে করেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের লড়াকু মানসিকতা এবং গণ-আন্দোলনের প্রতি আবেগের মধ্যে বিপ্লবী লেনিনের ছায়া ছিল এবং ক্ষমতা হারানোর পরও তাঁর সেই মূল্যায়ন বদলাবে না।
তৃণমূল শাসনামলে বহু বুদ্ধিজীবী ও শিল্পীর গায়েই ‘দলদাস’ বা ‘চটি চাটা’ তকমা সেঁটে দিয়েছিল বিরোধীরা। নচিকেতাকেও অনেক সময় কটাক্ষের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এই সাক্ষাৎকারে সেই সমালোচনার কড়া জবাব দিয়েছেন শিল্পী। অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে তিনি জানান, তিনি কখনো ক্ষমতার অলিন্দে হাত পেতে কিছু চাইতে যাননি বা কারও অন্ধ স্তাবকতা করেননি। তাঁর কথায়, ‘আমার চটি চাটার কোনো প্রমাণ নেই।’
শিল্পী স্পষ্ট করে দেন, তিনি চিরকাল নিজের শর্তে গান গেয়েছেন এবং তাঁর গান সব সময়ই সাধারণ মানুষের কথা বলেছে, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নয়।
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের সমীকরণ যে আলাদা, তা আরও একবার প্রমাণ করলেন নচিকেতা। বিরোধী দলের প্রথম সারির নেতা (বর্তমানে শাসক বিজেপির অন্যতম মুখ) দিলীপ ঘোষের সঙ্গে তাঁর মধুর সম্পর্কের কথা সাক্ষাৎকারে অকপটে স্বীকার করেছেন তিনি। নচিকেতা জানান, দিলীপ বাবুর সঙ্গে তাঁর নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। রসিকতার সুরে গায়ক বলেন, ‘দিলীপ ঘোষের সঙ্গে আমার খুব ভালো সম্পর্ক। উনি মাঝেমধ্যেই আমাকে ফোন করেন এবং সুস্থ থাকার নানা টিপস দেন।’
এই মন্তব্য থেকে স্পষ্ট, রাজনৈতিক আদর্শের ভিন্নতা থাকলেও ব্যক্তিগত স্তরে সৌজন্য ও হৃদ্যতা বজায় রাখতে ভালোবাসেন এই জীবনমুখী শিল্পী।
পশ্চিমবঙ্গে শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন নতুন বিজেপি সরকার গঠিত হওয়ার পর রাজ্যের শিল্প ও সংস্কৃতি জগতের ভবিষ্যৎ নিয়ে নানা মহলে জল্পনা চলছে। নতুন সরকারের থেকে একজন অগ্রণী শিল্পী হিসেবে তাঁর কী চাওয়া রয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তরে নচিকেতা বলেন, ‘নতুন সরকারের থেকে আমার একটাই প্রত্যাশা—সম্মান।’
তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে কোনো বৈষয়িক সুবিধা, সরকারি পদ বা বিশেষ অনুগ্রহ তিনি চান না। শিল্পী চান কেবল স্বাধীনভাবে কাজ করার পরিবেশ এবং শিল্পীদের প্রাপ্য সম্মানটুকু যাতে নতুন সরকার বজায় রাখে।