কনসার্টে শিল্পীর গান শোনার চেয়ে স্মার্টফোনে ভিডিও ধারণেই যেন এখন বেশি ব্যস্ত থাকেন অনেক দর্শক। সেই প্রবণতার বিরুদ্ধেই ব্যতিক্রমী বার্তা দিচ্ছে দক্ষিণ কোরিয়ার নতুন কে-পপ বয় ব্যান্ড কর্টিস। চলমান বিশ্ব সফরে মঞ্চে উঠেই তারা দর্শকদের উদ্দেশে বারবার বলছে, ‘ফোনটা নামিয়ে রাখুন।’
দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচিওনে গত ১৮ জুলাই শুরু হওয়া কর্টিসের বিশ্ব সফরের নামই রাখা হয়েছে ‘পুট ইওর ফোন ডাউন’। সফরের অংশ হিসেবে ব্যান্ডটি নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেসসহ যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন শহরে কনসার্ট করবে। পরে আবার সিউলে ফিরে সফর শেষ করবে।
ইনচিওনের উদ্বোধনী কনসার্টে পাঁচ সদস্যের ব্যান্ডটি মঞ্চে ওঠার পর এক সদস্য দর্শকদের উদ্দেশে জোরে বলেন, ‘ফোনটা নামিয়ে রাখুন।’ সঙ্গে সঙ্গে স্টেডিয়ামজুড়ে চিৎকার আর উল্লাস শুরু হলেও হাজারো দর্শকের হাতে থাকা আলোকিত মোবাইল ফোনের পর্দা নিচে নামেনি।
কিছুক্ষণ পর তিনি আরও জোরে একই কথা পুনরাবৃত্তি করেন। কেউ কেউ ফোন নামালেও অধিকাংশ দর্শক ভিডিও ধারণ চালিয়ে যান।
কর্টিসের দাবি, ছয় ইঞ্চির মোবাইলের পর্দার মাধ্যমে নয়, দর্শকেরা যেন সরাসরি শিল্পীদের পরিবেশনা উপভোগ করেন। এ বার্তাই তারা দীর্ঘদিন ধরে দিয়ে আসছে।
তবে বিষয়টি নিয়ে ভক্তদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।
২২ বছর বয়সী ভক্ত পার্ক জি-ইয়ন বিবিসিকে জানান, কর্টিসের দুই দিনের কনসার্ট ধারণের জন্য তিনি একটি ভালো স্মার্টফোন ভাড়া করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি মঞ্চের একেবারে সামনে ছিলাম। এমন সুযোগ হয়তো জীবনে আর কখনো পাব না। তাই ফোন নামিয়ে রাখতে পারিনি। কারণ কনসার্টের অনেক স্মৃতি অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর ধীরে ধীরে মুছে যায়। তাই ভিডিও ধারণ করি, যাতে পরে সেগুলো আবার দেখতে পারি।’
অন্যদিকে ২৫ বছর বয়সী কিম গা-ইন স্টেডিয়ামের উঁচু গ্যালারিতে বসে অনুষ্ঠান দেখেছেন। তিনি বলেন, ‘পেছনের সারিতে অনেক দর্শক ফোন সরিয়ে রেখে একসঙ্গে নাচছিলেন। আমার মনে হয়েছে, ব্যান্ডটি আসলে এমন পরিবেশই চেয়েছিল।’
গত বছর বিগহিট মিউজিকের মাধ্যমে আত্মপ্রকাশ করা কর্টিস ইতিমধ্যে কে-পপ অঙ্গনে দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিগহিট মিউজিকই বিশ্বখ্যাত ব্যান্ড বিটিএসের রেকর্ড লেবেল।
ব্যান্ডটির সদস্যদের বেশির ভাগই কিশোর। সবচেয়ে বড় সদস্য জেমসের বয়স মাত্র ২০ বছর। তাঁদের প্রতিটি মিউজিক ভিডিও কোটি কোটি দর্শক দেখেছেন। সম্প্রতি তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগোতে আয়োজিত বিখ্যাত সংগীত উৎসব ললাপালুজায়ও পারফর্ম করেছেন।
কর্টিস নামটি এসেছে ‘কালার আউটসাইড দ্য লাইনস’ বাক্যাংশ থেকে। তাঁদের রেকর্ড লেবেলের তথ্যমতে, প্রচলিত নিয়মের বাইরে গিয়ে স্বাধীনভাবে চিন্তা করার মানসিকতাকেই এই নামের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।
কর্টিস অবশ্য এ ধরনের আহ্বান জানানো প্রথম শিল্পীগোষ্ঠী নয়।
এর আগে গায়িকা ফিবি ব্রিজার্স ও অ্যালিসিয়া কিজ তাঁদের কনসার্টে দর্শকদের ফোন বিশেষ লক করা পাউচে (ব্যাগ) রাখতে বাধ্য করেছেন, যাতে ফোন সঙ্গে থাকলেও ব্যবহার করা না যায়।
ব্রিটিশ রক ব্যান্ড সুয়েড-এর প্রধান গায়ক ব্রেট অ্যান্ডারসন ২০২৩ সালে সিঙ্গাপুরে কনসার্ট চলাকালে দর্শকদের ফোন কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করে আলোচনায় এসেছিলেন।
মার্কিন সংগীতশিল্পী বিলি আইলিশ অবশ্য দর্শকদের ভিডিও ধারণের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করেই এক কনসার্টে প্রথম সারির দর্শকদের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘ফোনটা নামাও, আমি তো এখানেই আছি।’
এমনকি কে-পপ তারকা বিটিএস-এর সদস্য জাংকুকও এক কনসার্টে মজা করে দর্শকদের বলেছিলেন, ‘ফোনের পর্দার দিকে নয়, আমার দিকে তাকাও।’
পার্ক জি-ইয়নের মতে, শিল্পীরা দর্শকদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগকে পারফরম্যান্সের গুরুত্বপূর্ণ অংশ মনে করেন বলেই এমন অনুরোধ করেন। তবে কে-পপ সংস্কৃতিতে ‘ফ্যানক্যাম’—অর্থাৎ নির্দিষ্ট শিল্পীকে কেন্দ্র করে ধারণ করা ভিডিও—খুবই জনপ্রিয়। এসব ভিডিও অনলাইনে ছড়িয়ে পড়ার পর ভক্তরা শিল্পীদের অভিব্যক্তি, নাচের সূক্ষ্ম ভঙ্গি ও ছোট ছোট মুহূর্ত বিশ্লেষণ করেন। তাই ভিডিও ধারণ অনেক ভক্তের কাছে কেবল স্মৃতি নয়, বরং কে-পপ সংস্কৃতিরই একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই কারণেই কর্টিসের বারবার ফোন নামিয়ে রাখার আহ্বান কিছু ভক্তের বিরক্তিরও কারণ হয়েছে।
কনসার্টের প্রথম দিনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
পার্ক জি-ইয়ন বলেন, ‘দুই দিনের কনসার্টে অংশ নিতে আমার ১০ লাখ ওনের বেশি খরচ হয়েছে। টিকিটের পাশাপাশি যাতায়াত ও থাকার খরচও ছিল। অনেক ভক্তই আমার মতো টাকা খরচ করেছেন। তাই বারবার ফোন নামাতে বলায় কেউ কেউ বিরক্ত হয়েছেন।’
ভক্তদের এই প্রতিক্রিয়া কর্টিসের সদস্যদের কাছেও পৌঁছায় বলে ধারণা করা হচ্ছে। দ্বিতীয় দিনের কনসার্টে তাঁরা কিছুটা নমনীয় অবস্থান নেয়।
কিম গা-ইন বলেন, প্রথম দিনে বার্তাটা ছিল—ফোন নামিয়ে সবাই মিলে উপভোগ করি। দ্বিতীয় দিনে তাঁরা বলল, ভিডিও ধারণ করতে চাইলে সমস্যা নেই, তবে যেন সবাই একসঙ্গে কনসার্টটাও উপভোগ করি। তাঁরা ব্যাখ্যা করেছে, ‘পুট ইওর ফোন ডাউন’ আসলে শুধুই ফোন নামানোর নির্দেশ নয়, এর মধ্যে কনসার্ট উপভোগ করার বিষয়টিও রয়েছে।’