যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ব্রিটিশ পপ তারকা এড শিরানের ‘লুপ ট্যুর’ সংগীত সফরের উদ্বোধনী পরিবেশনায় ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান দিয়েছিলেন মার্কিন র্যাপার ম্যাকলেমোর। এ সময় ফিলিস্তিনের অধিকার ও যুদ্ধবিরতির পক্ষে কথা বলেন তিনি। তুলে ধরেন ফিলিস্তিনের দুর্দশার চিত্র। এরপরই তাঁকে সফরের শিল্পী তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়। এ ঘটনার জেরে বাকি সব সহশিল্পীও সফর থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।
সরে দাঁড়ানো শিল্পীদের মধ্যে রয়েছেন পপ তারকা বিলি আইলিশের ভাই ফিনিয়াস। এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বললে শিল্পীদের চুপ করিয়ে দেওয়া উচিত নয়।’ সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন আইরিশ গায়ক ও গীতিকার অ্যারন রো এবং ডেনমার্কের ব্যান্ড লুকাস গ্রাহামও।
শিরানের সঙ্গে মঞ্চে সবসময় গান পরিবেশন করা আইরিশ ফোক ব্যান্ড বেওগাও সফর থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে।
সহশিল্পীদের সফর ত্যাগের ঘোষণা আসে শিরান কথা বলার কয়েক ঘণ্টা পর। শিরান বলেন, গাজা নিয়ে প্রকাশ্য বিতর্কে জড়াতে চান না তিনি। একই সঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন, ম্যাকলমোরকে সফর থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর ছিল না।
ইনস্টাগ্রামে শিরান লিখেছেন, ‘ম্যাকলমোরকে সফর থেকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রোমোটারের, এটি আমার সিদ্ধান্ত ছিল না।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘যেসব ভক্ত পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন, আমি তাঁদের কখনো হতাশ করব না। সফরের কর্মী এবং অন্য সহশিল্পী ও সংগীতশিল্পীদেরও আমি পরিত্যাগ করব না, যাঁরা কাজ ও জীবিকা নির্বাহের জন্য আমার ওপর নির্ভর করেন।’
ম্যাকলমোরের ফিলিস্থিনপন্থী মন্তব্যের পর ইহুদি কয়েকটি সংগঠন তাঁর সমালোচনা করে। এরপর সফর থেকে ম্যাকলমোরকে সফর থেকে বাদ দেওয়ার জন্য আয়োজকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
শিরান তাঁর বিবৃতিতে বলেন, এ বিষয়ে আয়োজকদের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হলেও শেষ পর্যন্ত সফরের আয়োজক মেসিনা ট্যুরিং গ্রুপ ম্যাকলমোরকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যকার সংঘাতে তিনি ‘মর্মাহত’ বলে উল্লেখ করেন শিরান। তাঁর ভাষায়, ‘দুই পক্ষের মানুষের যে দুর্ভোগ ও যন্ত্রণা’, তা ‘একটি মানবিক ট্র্যাজেডি’। তবে রাজনৈতিক বিষয় থেকে নিজেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যাও দেন তিনি।
শিরান লিখেছেন, ‘আমি এতে জড়িত নই। এই ধ্বংসাত্মক সংঘাত নিয়ে আমার ব্যক্তিগত মতামত আছে। আমি প্রকাশ্যে কথা না বলার সিদ্ধান্ত নিয়েছি বলেই যে আমার মতামত নেই, তা নয়। এর মানে এই নয় যে আমি পরোয়া করি না।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘এর মানে এটিও নয় যে আমি নিজের ব্যক্তিগত উপায়ে বিভিন্ন উদ্যোগকে সমর্থন করি না।’
শিরান বলেন, ‘রাজনীতির জন্য আমি আমার পেশাগত প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করি না। এর একটি কারণ আছে। আমার দর্শকদের মধ্যে বিভিন্ন পটভূমির তরুণ, এমনকি অনেক শিশুও রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যাঁরা আমার অনুষ্ঠানে আসেন, তাঁরা কোনো রাজনৈতিক ফোরাম আশা করেন না। ম্যাকলমোর যে বিষয়ে বিশ্বাস করেন, তার পক্ষে দাঁড়িয়ে জোরালোভাবে কথা বলার দৃঢ়তাকে আমি সম্মান করি।’
‘তবে একই লক্ষ্যে, শান্তিতে পৌঁছানোর একাধিক পথ থাকতে পারে।’
শিরান আরও লিখেছেন, ‘আমি আমার খ্যাতি ও প্ল্যাটফর্মকে নিরাপদ ও আশ্রয়ের জায়গা হিসেবে ব্যবহার করতে চাই, কূটনীতি বজায় রাখতে চাই এবং আলোচনা বন্ধ না করে চালু রাখতে চাই। আমরা যদি শুধু কে সবচেয়ে জোরে চিৎকার করতে পারে, সেটির ওপর মনোযোগ দিই, তাহলে কোনো কিছুই কখনো বদলাবে না। পরিবর্তনের পক্ষে কথা বলার বিভিন্ন পদ্ধতি রয়েছে।’
অন্য সব সহশিল্পীর মতো ম্যাকলমোরকেও নিজের পরিবেশনার জন্য গান বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি। তবে ভক্ত ও সফরের অন্য শিল্পীদের শান্ত করার উদ্দেশ্যে দেওয়া শিরানের এই বিবৃতি দৃশ্যত উল্টো ফল দিয়েছে।
ইনস্টাগ্রামে লুকাস গ্রাহাম লিখেছেন, ‘যুদ্ধ নিয়ে, বেসামরিক মানুষের নিহত হওয়া নিয়ে, বেড়ে ওঠার অধিকার থাকা শিশুদের নিয়ে আমাদের কথা বলতে পারা উচিত। তারা যেখানেই বাস করুক না কেন। তাদের মাথার ওপর যে পতাকাই উড়ুক না কেন।’
বেওগা তাদের পোস্টে লিখেছে, ‘সংগীতশিল্পী হিসেবে প্রতিরাতে ওই দর্শকদের সামনে গান পরিবেশন করা স্বপ্নের মতো। কিন্তু যারা মুক্ত ফিলিস্তিনের পক্ষে কথা বলছেন, তাঁদের চুপ করিয়ে দেওয়া হয় এমন ভেন্যুতে গান পরিবেশন করা আমাদের জন্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
গত ৪ সেপ্টেম্বর বিতর্কের শুরু হয়। ওই দিন নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে এড শিরানের কনসার্টে পারফর্ম করেন ম্যাকলমোর। তারপর দর্শকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এই সফরে যোগ দিতে চাওয়ার বড় একটি কারণ হলো, এমন স্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে আমার হৃদয়ের খুব কাছের দুটি কথা বলতে পারা। সেটি হলো—ফ্রি প্যালেস্টাইন।’
এরপর তিনি ‘হিন্দস হল’ গানটি পরিবেশন করেন। গানটি কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিলিস্তিনপন্থী আন্দোলনকারীদের উৎসর্গ করা হয়েছে। এতে গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযান নিয়ে নিন্দা জানানো হয়েছে। গান পরিবেশনের সময় বড় পর্দায় গাজার ধ্বংসযজ্ঞের ভিডিওচিত্রও দেখানো হয়।