হোম > বিনোদন > গান

মার্কিন কান্ট্রি মিউজিক কিংবদন্তি ডলি পার্টন আর নেই

আজকের পত্রিকা ডেস্ক­

ডলি পার্টন। ছবি: সংগৃহীত

মার্কিন কান্ট্রি মিউজিক কিংবদন্তি, খ্যাতনামা গীতিকার ও অভিনেত্রী ডলি পার্টন মারা গেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮০ বছর।

টেনেসির পাহাড়ি অঞ্চলের এক দারিদ্র্যপীড়িত পরিবার থেকে উঠে এসে নিজের গায়কী, অসাধারণ গান রচনা ও অনন্য ব্যক্তিত্বের জোরে তিনি বিশ্ব সংগীতে অন্যতম জনপ্রিয় ও প্রভাবশালী তারকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

আমেরিকান সংগীতের ইতিহাসে ডলি পার্টন ছিলেন এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যাঁর জনপ্রিয়তা প্রজন্ম, ভৌগোলিক সীমা এবং রাজনৈতিক মতভেদের ঊর্ধ্বে ছিল।

ডলি পার্টনের শৈশব কেটেছিল চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। টেনেসির স্মোকি মাউন্টেন এলাকার এক কাঠের ঘরে ১২ ভাইবোনের পরিবারে বেড়ে ওঠেন তিনি। তাঁর বাবা ছিলেন কৃষক, যিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পড়াশোনা করতে পারেননি। বাবার এই অভাব অনুধাবন করেই পরবর্তীতে ডলি শিশুদের বিনামূল্যে বই বিতরণের জন্য ‘ইমাজিনেশন লাইব্রেরি’ নামে একটি দাতব্য সংস্থা গড়ে তুলেছিলেন।

সংগীতে তাঁর হাতেখড়ি হয়েছিল গির্জায়, যেখানে তাঁর নানা যাজক হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি স্থানীয় টেলিভিশনে গাইতে শুরু করেন এবং ১৩ বছর বয়সে বিখ্যাত ‘গ্র্যান্ড ওল ওপ্রি’-তে পারফর্ম করেন। সেখানে কিংবদন্তি শিল্পী জনি ক্যাশ তাঁকে দর্শকদের সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

১৯৬৪ সালে হাইস্কুল পাস করার পর ডলি পার্টন ব্যাগ গুছিয়ে কান্ট্রি মিউজিকের রাজধানীখ্যাত ন্যাশভিলে চলে যান। সেখানে তিনি প্রডিউসার ফ্রেদ ফস্টারের নজরে পড়েন এবং সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে তিনি ন্যাশভিলের সংগীতাঙ্গনের শীর্ষ তারকায় পরিণত হন।

স্বতন্ত্র কণ্ঠ ও নিজস্ব শৈলীর জন্য পরিচিত ডলি পার্টন শত শত গান লিখেছেন। তাঁর রচিত ও পরিবেশিত কালজয়ী গানের মধ্যে রয়েছে ‘জোলিন’, ‘কোট অব মেনি কালারস’, ‘নাইন্টু ফাইভ’ এবং ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’। বিশ্বজুড়ে তাঁর রেকর্ড ১০০ মিলিয়নেরও বেশি বিক্রি হয়েছে এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মে গানগুলো শতকোটি বারের বেশি শোনা হয়েছে।

১৯৭৩ সালে মুক্তি পাওয়া ‘জোলিন’ গানটি ডলি পার্টনের ক্যারিয়ারের নতুন মোড় ঘুরিয়ে দেয়। কান্ট্রি চার্ট ছাড়াও আন্তর্জাতিক পপ সংগীতে এটি ব্যাপক সাফল্য পায়। পরের বছর ১৯৭৪ সালে তিনি প্রকাশ করেন বিখ্যাত ব্যালাড ‘আই উইল অলওয়েজ লাভ ইউ’। এই গানটি রেকর্ডের জন্য রক এন রোলের রাজা এলভিস প্রিসলি প্রস্তাব দিলেও, কপিরাইট বা গানের স্বত্ব ছাড়তে রাজি না হওয়ায় পার্টন তা প্রত্যাখ্যান করেন।

পরবর্তীতে ১৯৯২ সালে বিখ্যাত হলিউড সিনেমা ‘দ্য বডিগার্ড’-এর জন্য হুইটনি হিউস্টন গানটি নতুনভাবে গেয়ে বিশ্বজুড়ে রেকর্ড পরিমাণ সাফল্য অর্জন করেন। ১৯৯৪ সালে হিউস্টন যখন এই গানের জন্য গ্র্যামি পুরস্কার পান, তখন ডলি পার্টন নিজেই তাঁর হাতে সেই পুরস্কার তুলে দিয়েছিলেন।

বহুমুখী প্রতিভা ও ব্যবসায়িক সাফল্য

সংগীতের পাশাপাশি অভিনয়ের জগতেও তিনি ছিলেন সমান সফল। ১৯৮০ সালে ‘৯ টু ৫’ চলচ্চিত্রে জেন ফন্ডা ও লিলি টমলিনের সঙ্গে অভিনয় করে তিনি ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান। সিনেমাটির শিরোনাম সংগীতের জন্যও তিনি গ্র্যামি জয় করেন। পরবর্তীতে ‘দ্য বেস্ট লিটল ভোরহাউজ ইন টেক্সাস’ এবং ‘স্টিল ম্যাগনেলিওস’-এর মতো ব্যবসাসফল চলচ্চিত্রেও তাঁকে দেখা গেছে।

ব্যবসায়ী ও সমাজসেবী হিসেবেও ডলি পার্টন তাঁর দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। টেনেসিতে তিনি গড়ে তুলেছেন জনপ্রিয় থিম পার্ক ‘ডলিউড’, যা ওই অঞ্চলের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখে। সাংস্কৃতিক বা সামাজিক সংকটে তিনি সবসময় মানবিক হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। ২০১৬ সালে স্মোকি মাউন্টেনে এক ভয়াবহ দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনে তিনি বিশেষ তহবিল গঠন করেন। এ ছাড়া, চিকিৎসাবিজ্ঞান ও শিক্ষার প্রসারে বিপুল অর্থ দান করেছেন তিনি।

নিজের ক্যারিয়ার জুড়ে ডলি পার্টন কঠোরভাবে রাজনৈতিক বিতর্ক থেকে দূরে থেকেছেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যখনই কোনো নির্বাচন ঘনিয়ে এসেছে, তিনি কোনো প্রার্থীর পক্ষে বা রাজনৈতিক ইস্যুতে অবস্থান নেননি। এক সাক্ষাৎকারে রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে তিনি বলেছিলেন, ‘আমি রাজনীতি করি না। রাজনৈতিক ব্যবস্থার উভয় পক্ষেই আমার কোটি কোটি অনুরাগী রয়েছেন। আমার নিজস্ব মতামত আছে, কিন্তু আমি শিখেছি যেসব বিষয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হয় সেখানে নীরব থাকাই শ্রেয়।’

নিজের ক্যারিয়ারে ৫৫টি গ্র্যামি মনোনয়ন এবং ১০টি পুরস্কার জয় করা পার্টন ছিলেন আমেরিকান সংগীতের ইতিহাসের অন্যতম সর্বাধিক সম্মানিত নারী শিল্পী। ২০২২ সালে তাঁকে ‘রক অ্যান্ড রোল হল অব ফেম’-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

সংগীত, সমাজসেবা এবং অনন্য ব্যক্তিত্বের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের হৃদয়ে যে গভীর ছাপ তিনি রেখে গেছেন, তা কান্ট্রি মিউজিকের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।

সূত্র: অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস, এনপিআর