ভারতীয় চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম জনপ্রিয় ও সফল সংগীতশিল্পী অরিজিৎ সিং প্লেব্যাক গায়কি থেকে অবসর নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বেশ কিছু দিন আগেই। অবশ্য আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেননি তিনি। শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, চলচ্চিত্র সংগীতে তিনি আর কোনো নতুন কাজ গ্রহণ করবেন না।
হঠাৎ নেওয়া এই সিদ্ধান্তে স্তম্ভিত হয়ে পড়ে তাঁর দেশ-বিদেশের কোটি কোটি অনুরাগী এবং ভারতীয় সংগীত ইন্ডাস্ট্রির সহশিল্পীরা।
নতুন বছরের শুভেচ্ছা জানিয়ে অনুরাগীদের উদ্দেশে দেওয়া এক বার্তায় অরিজিৎ লিখেছিলেন, ‘সবাইকে শুভ নববর্ষ। এতদিন ধরে একজন শ্রোতা হিসেবে আমাকে এত ভালোবাসা দেওয়ার জন্য আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ। আমি আনন্দের সঙ্গেই জানাচ্ছি যে, এখন থেকে প্লেব্যাক গায়ক হিসেবে আর কোনো নতুন কাজ নিচ্ছি না। আমি এখানেই ইতি টানছি। এটি সত্যিই এক দুর্দান্ত যাত্রা ছিল।’
হঠাৎ কেন তিনি এই সিদ্ধান্ত নিলেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট করে কিছু জানাননি এই শিল্পী।
অরিজিতের এই ঘোষণায় প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বলিউডের খ্যাতনামা সংগীতশিল্পী ও সুরকাররা। প্রবীণ গায়ক কুমার শানু গভীর দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, ‘তোমার কণ্ঠ ও প্রতিভা কোটিজনে একটি। তোমার এই সাহসী সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা জানাই।’
অন্যদিকে, বিশিষ্ট গায়িকা শ্রেয়া ঘোষাল এই ঘোষণাকে কোনো একটি যুগের সমাপ্তি হিসেবে দেখতে নারাজ। তিনি লেখেন, ‘অরিজিতের মতো জিনিয়াস শিল্পীকে নির্দিষ্ট কোনো ধাঁচে বেঁধে রাখা যায় না। এটি তার সংগীত জীবনের এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা।’
র্যাপার বাদশাহ অরিজিৎকে ‘শতকে একজন’ বলে উল্লেখ করেছেন। সংগীতশিল্পী আরমান মালিক ও আমাল মালিক অরিজিতের এই সিদ্ধান্তকে শ্রদ্ধা জানিয়ে তাঁর সংগীতযাত্রার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
বেশ কয়েক বছর ধরেই মুম্বাইয়ের কোলাহলময় জীবন ছেড়ে নিজের জন্মভূমি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের জিয়াগঞ্জে সাধারণ জীবনযাপন বা ‘স্লো লিভিং’-এর পথ বেছে নিয়েছিলেন অরিজিৎ। অধিকাংশ কাজের চুক্তি ও রেকর্ডিং তিনি নিজ শহর থেকেই পরিচালনা করতেন। জিয়াগঞ্জে তাঁর বাসভবনে আমির খান এবং আন্তর্জাতিক সংগীত তারকা এড শিরানের মতো ব্যক্তিত্বরাও সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন।
অরিজিতের এই জীবনধারা সম্পর্কে বলতে গিয়ে জনপ্রিয় রেডিও উপস্থাপক ও সুরকার নীলেশ মিশ্র তাঁর পডকাস্টে নিজের তুলনা টেনে শুভংকর মিশ্রকে হিন্দিতে বলেন, ‘মুম্বাই থেকে আমি আমার গ্রামের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পারছিলাম না। গোরেগাঁও থেকে গ্রামের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করা কঠিন। তাই তাৎক্ষণিক কারণ ছিল, আমাকে জীবনকে তার আসল রূপে বাঁচতে হতো। এবং আমি দেখলাম যে এটা শুধু আমি নই — লক্ষ লক্ষ মানুষ ধীর গতির জীবন বেছে নিচ্ছেন এবং নিজেদের শিকড়ে ফিরতে চান।’
নীলেশ বলেন, ‘অরিজিৎ সিং একজন ফকির মানুষ। তিনি আমার খুব প্রিয়। আপনি বলতে পারেন এই সিদ্ধান্তটি আত্মসম্মান থেকে এসেছে। এটা অহংকারের বিষয় নয়; কিংবা বিচার-বিবেচনার বিষয়ও নয়।’
গত এক দশকেরও বেশি সময় ধরে হিন্দি চলচ্চিত্র সংগীতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিলেন অরিজিৎ সিং। শাহিন শাহ কিংবা তরুণ প্রজন্মের তারকা—সবার জন্যই সুরকারদের প্রথম পছন্দ ছিলেন তিনি।
‘তুমি হি হো’, ‘লাল ইশক’, ‘রাবতা’, ‘কাভি জো বাদল বারসে’ কিংবা ‘আজ ফির’-এর মতো অসংখ্য কালজয়ী গান উপহার দিয়ে তিনি নিজেকে ভারতীয় সংগীতের এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছেন। প্লেব্যাক থেকে তাঁর এই প্রস্থান ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতে একটি বড় শূন্যতার সৃষ্টি করবে বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।