দীর্ঘ ১৪ বছরের নীরবতা ভেঙে অবশেষে নিজেদের বঞ্চনা ও অভাব-অভিযোগ নিয়ে মুখ খুললেন কলকাতার টলিউড ইন্ডাস্ট্রির টেকনিশিয়ানরা। ঘরের ছেলে তথা নবনির্বাচিত বিজেপি অভিনেতা-বিধায়ক রুদ্রনীল ঘোষের মুখোমুখি বসে তাঁরা সরাসরি ক্ষোভ প্রকাশ করলেন বাংলাদেশি অভিনয়শিল্পী এবং পরিচালকদের কলকাতায় এসে অবাধে কাজ করা নিয়ে।
ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর এই প্রথম টেকনিশিয়ান স্টুডিয়োয় দীর্ঘ সময় ধরে সহকর্মীদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন রুদ্রনীল ঘোষ। সেই বৈঠকেই উঠে আসে বাংলাদেশি শিল্পীদের দাপট এবং স্থানীয় টেকনিশিয়ানদের বঞ্চনার অভিযোগ।
গতকাল বৃহস্পতিবারের বৈঠকে উপস্থিত সাংবাদিকদের সামনেই ‘শিল্প নির্দেশনা’ (আর্ট ডিরেকশন) বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ টেকনিশিয়ান ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘শহরে বাংলাদেশি অভিনেতারা এসে দিনের পর দিন কাজ করে যাচ্ছেন। এটা আমরা কিছুতেই মেনে নিতে পারছি না। ওপার বাংলা থেকে এসে তাঁরা কলকাতায় শুটিং করে যাচ্ছেন, অথচ এ দেশের টেকনিশিয়ানরা ন্যায্য পারিশ্রমিক ও মূল্যায়ন পাচ্ছেন না। এর ফলে দিনশেষে লাভবান হচ্ছেন বাংলাদেশের প্রযোজকেরা। ভিনদেশ থেকে এসে আমাদের এখানে কাজ করে তাঁরা লাভ নিয়ে যাবেন, আর আমরা বঞ্চিত হব—কেন এটা হতে দেওয়া হবে?’
এখানেই শেষ নয়, ওই টেকনিশিয়ান আরও একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে দাবি করেন, কলকাতায় কাজ করতে এসে বাংলাদেশি কলাকুশলীরা এ শহরের অনেক খুঁটিনাটি ও অভ্যন্তরীণ তথ্য জেনে যাচ্ছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে এ দেশের ইন্ডাস্ট্রির জন্য ‘মঙ্গলজনক নয়’।
টেকনিশিয়ানদের এই গুরুতর অভিযোগ ও দাবির মুখে সঙ্গে সঙ্গেই নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেন অভিনেতা-রাজনীতিবিদ রুদ্রনীল ঘোষ। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি অত্যন্ত সতর্কভাবে বলেন, ‘এই বিষয়টির পরিধি এবং গুরুত্ব অনেক বড়। এটি একটি আন্তর্জাতিক এবং স্পর্শকাতর বিষয়। এ ধরনের ঘরোয়া স্তরের বৈঠকে এর তাৎক্ষণিক নিষ্পত্তি বা কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব নয়। একই সঙ্গে আমি বা টলিউডের দায়িত্বে থাকা বাকি যে তিন জন রয়েছেন, আমাদের কারোরই ব্যক্তিগতভাবে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার নেই।’
রুদ্রনীল আরও জানান, এই পুরো বিষয়টি ভারত ও বাংলাদেশের পারস্পরিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ওপর নির্ভর করছে। তাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার একমাত্র এখতিয়ার রয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের। তবে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন, টলিউডের ভূমিপুত্রদের এই উদ্বেগের কথা তিনি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেশের শীর্ষমহল তথা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কাছে পৌঁছে দেবেন।
ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনের পর টলিউডের অন্দরে ক্ষমতার অলিন্দে যে বড় বদল আসছে, এই বৈঠক তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এতদিন যে টেকনিশিয়ানরা নিজেদের দাবি-দাওয়া নিয়ে সরব হতে পারতেন না, তাঁরা এখন সরাসরি শাসক দলের বিধায়কের দরবারে নিজেদের দাবি পেশ করছেন। তবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান এবং কাজের আইনি অধিকারের এই জটিল জট কেন্দ্র কীভাবে ছাড়ায়, এখন সেটাই দেখার বিষয়।