অভিনেতা নায়করাজ রাজ্জাকের তিন ছেলে—বাপ্পারাজ, বাপ্পী ও সম্রাট। অভিনয়ে যুক্ত থাকার সুবাদে বড় ছেলে বাপ্পারাজ ও ছোট ছেলে সম্রাটকে সবাই চেনেন। তবে মেজ ছেলে রওশন হোসেন বাপ্পী বরাবরই থেকে গেছেন অন্তরালে। পর্দার বাইরেও তাঁর দেখা মেলা দুষ্কর। এক দশক ধরে স্থায়ীভাবে কানাডায় বসবাস করছেন তিনি। সম্প্রতি সেখান থেকেই একটি পডকাস্টে যুক্ত হয়ে বাবা রাজ্জাককে নিয়ে স্মৃতিচারণা করেছেন বাপ্পী। জানিয়েছেন, পর্দায় অভিনয় না করলেও বাবার নির্মিত সিনেমায় ক্যামেরার পেছনে কাজ করেছেন তিনি।
অনেকেই মনে করেন বাপ্পী ছোটবেলা থেকেই দেশের বাইরে থাকেন। তবে পডকাস্টে তিনি জানান, তাঁর জীবনের বড় একটা সময় কেটেছে মা-বাবার সঙ্গেই। বাপ্পী বলেন, ‘অন্য ভাইবোনদের মতো আমিও তেজগাঁও শাহীন স্কুলে পড়েছি। এরপর নটর ডেম কলেজ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ২০১৪ সালে কানাডায় চলে আসি। আমি যখন চলে আসি, আব্বা একেবারেই রাজি ছিলেন না। বারবার বলছিলেন—সেখানে গিয়ে তুমি কী করবে? তখন আমার মেয়ে কানাডায় পড়ালেখা করছিল। তাঁকে বোঝানোর পর তিনি রাজি হন। উনি কিন্তু খুব কঠিন মানুষ ছিলেন। নিজের অনুভূতি সবাইকে বুঝতে দিতেন না। আমি চলে আসার পর আম্মার কাছ থেকে শুনেছি, রুম বন্ধ করে আব্বা অনেক কেঁদেছিলেন।’ এ কথা বলার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন বাপ্পী।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়েই বাবার প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনের সঙ্গে যুক্ত হন বাপ্পী। সে সময়ের স্মৃতি হাতড়ে তিনি বলেন, ‘আমি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি, তখন আব্বা বললেন, তুমি প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটি দেখো। এরপর পড়ালেখার ফাঁকে ফাঁকে রাজলক্ষ্মী প্রোডাকশনে সময় দিতে শুরু করি। “সৎ ভাই” সিনেমা থেকে আমি প্রযোজনার কাজের সঙ্গে যুক্ত। এরপর “চাপাডাঙ্গার বউ” দিয়ে বড় ভাই বাপ্পারাজ সিনেমায় নাম লেখায়। আর সম্রাট তখন অনেক ছোট।’
একসময় অভিনয়ে আসার বেশ আগ্রহ ছিল বাপ্পীর। পরবর্তী সময়ে পড়াশোনা ও ব্যবসা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ায় অভিনয়ে আর আসা হয়নি। বাপ্পী বলেন, ‘অভিনয় করার আগ্রহ ছিল। মার্শাল আর্টও শিখেছিলাম। কারণ সে সময় সোহেল রানা আঙ্কেল মার্শাল আর্টের সিনেমা শুরু করেছিলেন, যা আমার খুব ভালো লেগেছিল। আব্বাও মার্শাল আর্ট শিখতে উৎসাহ দিয়েছিলেন। কিন্তু পড়াশোনার চাপ বেড়ে যাওয়ায় আর মনোযোগ দিতে পারিনি। এরপর ব্যবসায় যখন ঢুকে গেলাম, তখন মন ঘুরে যায়। তবে সিনেমার পেছনে অনেক কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। বিশেষ করে “বাবা কেন চাকর” সিনেমার চিত্রনাট্য লেখা থেকে শুরু করে রেকর্ডিং পর্যন্ত আব্বার সঙ্গেই ছিলাম।’
বাবা হিসেবে নায়করাজ রাজ্জাক কেমন ছিলেন জানাতে চাইলে বাপ্পী বলেন, ‘বাবা হিসেবে উনি ছিলেন অসাধারণ। একজন পারফেক্ট বাবা হিসেবে সন্তানদের যেভাবে মানুষ করতে হয়, ঠিক সেভাবেই আমাদের গড়ে তুলেছেন। উনার শাসন যেমন কড়া ছিল, তেমনি সন্তানদের প্রতি ছিল অগাধ ভালোবাসা। সন্তানদের সময় দেওয়া, খোঁজখবর রাখার বিষয়গুলো তিনি খুব খেয়াল রাখতেন। প্রায়ই আমাদের নিয়ে ঢাকার বাইরে ঘুরতে যেতেন।’
বাপ্পী আরও বলেন, ‘উনার কড়া শাসনটা আমাদের খুব কাজে লেগেছে। সে সময় হয়তো মাঝে মাঝে মনে করতাম, উনি এত কড়া কেন? এত রাগারাগি কেন করেন? এখন বুঝি, আমাদের ভালোর জন্যই তিনি এমন করতেন। উনার কড়া নিয়ম ছিল, সন্ধ্যার পর আমরা ঘরের বাইরে থাকতে পারব না। এ কারণে বাসার মধ্যেই অনেক সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। খেলার মাঠ থেকে শুরু করে সুইমিংপুল, পশুপাখি, বিড়াল—সবকিছু ছিল আমাদের। ছুটির দিনে আমাদের বন্ধুরাও বাসায় চলে আসত। আমাদের তো খারাপ পথে যাওয়ার কোনো রাস্তাই ছিল না। কারণ আব্বার কারণে সবাই আমাদের চিনত। কিছু হলেই বাসায় খবর চলে আসত। আমরাও খুব সাবধানে থাকতাম। আব্বা সব সময় বলতেন—এমন কিছু কোরো না, যাতে মানুষ তোমাদের খারাপ বলে।’