হোম > শিক্ষা

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: ২ হাজার একর জমি বেহাত

রাহুল শর্মা, ঢাকা 

নওঁগা জেলার বিল করিল্যা বিএম উচ্চবিদ্যালয়ের জমির পরিমাণ নথিতে ৪ দশমিক ৪৬ একর। কিন্তু বাস্তবে আছে ২ দশমিক ৩৭ একর। অর্থাৎ বিদ্যালয়টির প্রায় অর্ধেক জমি বেদখল হয়ে গেছে। এই বিদ্যালয়সহ সারা দেশের ৭ হাজার ৯৮টি বেসরকারি স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সব মিলিয়ে প্রায় ২ হাজার একর জমি বেহাত হয়ে গেছে।

শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের (ডিআইএ) প্রতিবেদনে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমি বেদখলের এই চিত্র উঠে এসেছে। ২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ পাঁচ অর্থবছরে করা নিরীক্ষার তথ্য রয়েছে এই প্রতিবেদনে। জমি বেহাত ছাড়াও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জাল সনদ, অবৈধ নিয়োগ, তথ্য গোপন করে বেতন উত্তোলন, প্রাপ্যতার অতিরিক্ত উত্তোলনসহ বিভিন্ন কারণে ৪১৯ কোটি ৬১ লাখ ১৪ হাজার ৩৬৯ টাকার বেশি অনিয়মও ধরা পড়েছে অধিদপ্তরের এই নিরীক্ষায়।

অনিয়ম করা ওই অর্থ আদায় করে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

নিরীক্ষা প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম গতকাল বৃহস্পতিবার আজকের পত্রিকাকে বলেন, শিক্ষা- প্রতিষ্ঠানের জমি বেহাত হওয়ার বিষয়টি প্রতিটি নিরীক্ষা প্রতিবেদনে গুরুত্বসহ উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বেহাত হওয়া জমি ও অন্যান্য অনিয়ম তুলে ধরে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করা হয়েছে।

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের প্রধান কাজ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন দপ্তর বা সংস্থায় পরিদর্শন এবং নিরীক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা। পরিদর্শন শেষে প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা তুলে ধরা হয়। একই সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়। এর ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিয়ে থাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

দেশে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার। ডিআইএ প্রতিবছর গড়ে ২ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিরীক্ষা ও তদন্ত করে। এ জন্য সারা দেশকে আগের চারটি বিভাগে ভাগ করে কার্যক্রম চালায়। বিভাগ চারটি হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও রাজশাহী।

গত পাঁচ অর্থবছরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশের ৭ হাজার ৯৮টি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মোট ১ হাজার ৯৮৭ দশমিক ৬৩ একর জমি বেহাত হয়েছে। এর মধ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরের নিরীক্ষায় ১ হাজার ৮৯১টি প্রতিষ্ঠানের ৬৩৩ দশমিক ৩৯ একর জমি বেহাতের তথ্য রয়েছে। এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১ হাজার ৩৭৮টি সাধারণ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (স্কুল/কলেজ/স্কুল অ্যান্ড কলেজ) ৪২৮ দশমিক ৪৬০৫ একর এবং ৪৮২টি মাদ্রাসা এবং ৪১টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২০৪ দশমিক ৯৩৩১ একর জমি বেহাত হয়েছে।

প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে করা নিরীক্ষায় ১ হাজার ৩৪৯টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৪৬৪ দশমিক ৫২ একর, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের নিরীক্ষায় ১ হাজার ২৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২৩২ দশমিক ৩৬ একর এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষায় ২ হাজার ৮৩২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৬৫৭ দশমিক ৩৫ একর জমি বেদখল হয়ে যাওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।

ডিআইএর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজধানীর মধুবাগের শের-ই-বাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১ দশমিক ৪৬ একর জমি বেহাত হয়েছে। সম্প্রতি ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গিয়ে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানের এক দিকে সড়ক, বাকি তিন দিকেই বহুতল আবাসিক ভবন। প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বশীল একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘কাগজে ২ একর জমি আছে, তবে বাস্তবে নেই। আমরা ৫৩ দশমিক ২ শতাংশ জমির খাজনা দিচ্ছি। বাকি জমি কোথায়, এ নিয়ে মন্তব্য করতে চাই না।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষক অভিযোগ করেন, দাতা সদস্যদের কেউ কেউ স্কুল প্রতিষ্ঠার জন্য দেওয়া জমির বেশির ভাগ অংশ পরে নিজেদের প্রয়োজনে দখল করেছেন।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, উত্তরার কামারপাড়া স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১৬৪ শতাংশ জমি বেহাত হয়েছে। তৎকালীন গভর্নিং বডি নিয়মবহির্ভূতভাবে নতুন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার জন্য ১৬৪ শতাংশ জমি বরাদ্দ দেয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির একাধিক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তৎকালীন গভর্নিং বডি বিধিবহির্ভূতভাবে অন্য একটি প্রতিষ্ঠানকে বিদ্যালয়ের জমি বরাদ্দ দিয়েছে।

তদন্ত কার্যক্রমে যুক্ত একাধিক শিক্ষা পরিদর্শকের মতে, জমি বেহাতের ঘটনায় অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিচালনা কমিটি এবং প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের যোগসূত্র বা অবহেলা থাকে। প্রতিবেদনে বেহাত হওয়া জমি আবার প্রতিষ্ঠানের দখলে এনে মন্ত্রণালয়কে জানানোর এবং বেহাত হওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করার সুপারিশ করা হয়েছে।

দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক সৈয়দ গোলাম ফারুক বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমি বেহাত কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। বিষয়টি দুঃখজনক। বেহাত হওয়া জমি উদ্ধারে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

৪১৯ কোটি টাকার অনিয়ম

পাঁচ অর্থবছরে করা ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, পরিদর্শন করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অবৈধ নিয়োগ, প্রাপ্যতার অতিরিক্ত টাকা উত্তোলন, প্রাপ্য স্কেলে বেতন না নেওয়া, তথ্য গোপন করে বেতন উত্তোলন এবং জাল সনদ দিয়ে চাকরির মাধ্যমে ৪১৯ কোটি ৬১ লাখ ১৪ হাজার ৩৬৯ টাকার অনিয়ম করা হয়েছে। এসব অর্থ চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়ার এবং অভিযুক্ত শিক্ষক/কর্মচারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।

জাল সনদধারী ৫৯২ জন

প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত পাঁচ অর্থবছরে ৭ হাজার ৯৮টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওপর করা নিরীক্ষায় ৫৯২ জন শিক্ষক ও কর্মচারীর শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদ জাল পেয়েছে নিরীক্ষা দল। এ জন্য বেতন-ভাতা বাবদ তাঁদের নেওয়া অর্থ আদায়ের সুপারিশ করা হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাইলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (নিরীক্ষা ও আইন) জহিরুল ইসলাম আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ডিআইএর তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশের আলোকে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেহাত হওয়া জমি উদ্ধারে আমাদের অবস্থান অত্যন্ত কঠোর।’

জানতে চাইলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জমি বেহাতের ঘটনা উদ্বেগজনক। এর সঙ্গে জড়িত সব পক্ষকে এবং নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষকেও জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিষয়টির গুরুত্ব অনুধাবন করে জরুরি পদক্ষেপ নিতে হবে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯ এপ্রিল থেকে স্নাতক প্রথম বর্ষের ক্লাস শুরু

প্রধান ও সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে ১৩৫৫৯ নিয়োগের আবেদন শুরু ৩ ফেব্রুয়ারি

ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ১৩তম সমাবর্তন উদ্‌যাপন

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘বি’ ইউনিটের ভর্তি পরীক্ষার ফল প্রকাশ

এমপিওভুক্ত ৬৭ হাজার শূন্য পদে সুপারিশ পেলেন প্রায় ১২ হাজার, ফলাফল দেখবেন যেভাবে

প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ: মৌখিক পরীক্ষার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান: গ্রেডিং করে ধাপে ধাপে হবে এমপিওভুক্তি

বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান নিয়োগে হবে পরীক্ষা, পরিপত্র জারি

চাকরিজীবনে তিনবার বদলির সুযোগ পাবেন এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা, নতুন নীতিমালা

ডাকসু সদস্য সর্বমিত্র চাকমাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শোকজ