আইন পেশায় ক্যারিয়ার গড়ার স্বপ্ন নিয়ে যাঁরা বার কাউন্সিল অ্যাডভোকেটশিপ এনরোলমেন্ট পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের জন্য সময়টা এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার দিন যত ঘনিয়ে আসে, স্নায়বিক চাপ তত বাড়তে থাকে। তবে সঠিক পরিকল্পনা, কার্যকর রিভিশন এবং আত্মবিশ্বাস—এই তিনের সমন্বয় থাকলে প্রথমবারেই এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া সম্ভব। শেষ মুহূর্তের এই সময়ে কীভাবে নিজেকে সেরা ছন্দে রাখবেন, নিজের অভিজ্ঞতার আলোকে সে পরামর্শ দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মহসিন খান। তাঁর অভিজ্ঞতালব্ধ পরামর্শ শুনেছেন শাহ বিলিয়া জুলফিকার।
প্রিলিমিনারি এবং লিখিত পরীক্ষায় ৭টি আইনের ওপর বার কাউন্সিল পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। সেগুলো হচ্ছে—
১. দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮।
২. সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭।
৩. ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮।
৪. দণ্ডবিধি, ১৮৬০।
৫. সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২।
৬. তামাদি আইন, ১৯০৮।
৭. বাংলাদেশ বার কাউন্সিল আদেশ ও বিধিমালা, ১৯৭২।
বার কাউন্সিল প্রিলিমিনারি পরীক্ষার পূর্ণমান ১০০ এবং পরীক্ষার সময় ১ ঘণ্টা। মোট সাতটি বিষয়ে বণ্টিত প্রশ্ন থেকে পরীক্ষাটি অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে দেওয়ানি কার্যবিধি, ১৯০৮ থেকে ২০টি, সুনির্দিষ্ট প্রতিকার আইন, ১৮৭৭ থেকে ১০টি এবং ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ থেকে ২০টি প্রশ্ন থাকে। পাশাপাশি দণ্ডবিধি, ১৮৬০ থেকে ২০টি, সাক্ষ্য আইন, ১৮৭২ থেকে ১৫টি এবং তামাদি আইন, ১৯০৮ থেকে ১০টি প্রশ্ন অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া পেশাগত আচরণ, বার কাউন্সিল রুলস এবং লিগ্যাল ডিসিশন থেকে আরও ৫টি প্রশ্ন নির্ধারিত রয়েছে।
সব মিলিয়ে প্রিলিমিনারি পরীক্ষার মোট প্রশ্নসংখ্যা ১০০ এবং মোট নম্বরও ১০০।
বার কাউন্সিল পরীক্ষার তিনটি ধাপের মধ্যে সবচেয়ে কঠিন ও প্রতিযোগিতামূলক ধাপ হলো প্রিলিমিনারি পরীক্ষা, যা আইন শিক্ষার্থীদের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা হিসেবে পরিচিত। এই পরীক্ষার পূর্ণমান ১০০, যেখানে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য প্রয়োজন ৫০ নম্বর, তবে বাস্তবে পাসের হার মাত্র ২০ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ, যা নির্দেশ করে যে প্রতিযোগিতা অত্যন্ত তীব্র। এত কমসংখ্যক পরীক্ষার্থী পাস করতে পারার পেছনে প্রধান কারণ হলো পরীক্ষার্থীদের ধারাবাহিকভাবে নিয়মিত, সঠিকভাবে এবং একটানা অধ্যয়ন না করা, মূল আইন চর্চা এড়িয়ে শর্টকাটে পাস করার চেষ্টা করা, এবং তত্ত্বের সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে সমন্বয় না করা।
তাই ধারাবাহিক অধ্যয়ন, নিয়মিত নোট তৈরি, বিশদ আইনের পাঠ ও ব্যাখ্যা এবং সময়োপযোগী প্রস্তুতি ছাড়া প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় সফল হওয়া অত্যন্ত কঠিন এবং চ্যালেঞ্জিং।
শেষ সময়ে নতুন কোনো বড় অধ্যায় শুরু করার চেয়ে এত দিন যা পড়েছেন, তা বারবার ঝালাই করা জরুরি। প্রতিটি আইনের মূল ধারাগুলো এবং সেগুলোর ব্যাখ্যা পড়ার ওপর জোর দিন। বিশেষ করে যেসব ধারা বা বিষয় আপনার কাছে কঠিন মনে হয়, সেগুলোয় বাড়তি সময় দিন। প্রতিদিনের পড়ার একটি রুটিন তৈরি করুন। যেখানে পড়ার পাশাপাশি আগের পড়া রিভিশন এবং মডেল টেস্টের জন্য নির্দিষ্ট সময় বরাদ্দ থাকবে।
বিগত বছরের প্রশ্ন পড়া: বার কাউন্সিল পরীক্ষার প্রশ্নের ধরন বুঝতে হলে বিগত বছরের প্রশ্নপত্রের কোনো বিকল্প নেই। শুধু উত্তর মুখস্থ করলেই হবে না, প্রশ্নটি কোন প্রেক্ষাপট থেকে করা হয়েছে, তা বিশ্লেষণ করতে হবে। খেয়াল করুন, কোন অধ্যায় থেকে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন আসে। অনেক সময় একই ধরনের প্রশ্ন বা আইনের একই মূলনীতি থেকে প্রশ্ন ঘুরিয়ে দেওয়া হয়। তাই প্রতিটি প্রশ্নের পেছনের আইনগত যুক্তি বুঝতে চেষ্টা করুন।
আইন শুধু মুখস্থের বিষয় নয়, এটি বোঝার বিষয়। আমলযোগ্য ও অ-আমলযোগ্য অপরাধের পার্থক্য, বেইলযোগ্য ও বেইল অযোগ্য অপরাধ, ডিক্রি ও অর্ডারের পার্থক্য, অথবা রিভিউ, রিভিশন ও আপিলের মধ্যকার সূক্ষ্ম পার্থক্যগুলো পরিষ্কার রাখুন। আইনের উদ্দেশ্য ও প্রয়োগ বুঝে পড়লে প্রশ্ন যেভাবে ঘুরিয়েই আসুক না কেন, সঠিক উত্তর দেওয়া সম্ভব হবে।
প্রতিদিনের রুটিনে যা থাকবে পরীক্ষার আগের এই দিনগুলোয় পড়ার একটি কাঠামো মেনে চলা উচিত:
মূল আইন ও ধারা: প্রতিদিন অন্তত দুই ঘণ্টা মূল আইন বা বেয়ার অ্যাক্ট পড়ুন।
এমসিকিউ অনুশীলন: প্রতিদিন নিয়ম করে ৫০ থেকে ১০০টি এমসিকিউ সমাধান করুন। সময় ধরে পরীক্ষা দেওয়ার অভ্যাস করুন, এতে পরীক্ষার হলের জড়তা কাটবে।
লিখন ও নোট: প্রতিদিন ৩০-৪০ মিনিট গুরুত্বপূর্ণ ধারা বা সময়সীমাগুলো নিজ হাতে লিখুন। হাতে লেখা নোট দ্রুত রিভিশন দিতে সাহায্য করে।
রিভিশন: দিনের শেষ ৩০ মিনিট বা এক ঘণ্টা বরাদ্দ রাখুন কেবল আগের দিন যা পড়েছেন তা রিভিশন দেওয়ার জন্য।