সার্ভিসনাউ হলো যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার কোম্পানি, যা বিভিন্ন দেশের সরকার ও বড় বড় প্রতিষ্ঠানকে ডিজিটাল ওয়ার্কফ্লো এবং অটোমেশন প্ল্যাটফর্ম সরবরাহ করে। বিশ্বের প্রথম সারির এক হাজার কোম্পানির মধ্যে প্রায় ৯০০টি এই কোম্পানির গ্রাহক। প্রতিষ্ঠানটির ‘টেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার’ হিসেবে যুক্তরাজ্যে কর্মরত আইনুল ইসলাম সাকিব। তাঁর সাক্ষাৎকার নিয়েছেন নাদিম মজিদ।
সার্ভিসনাউ ক্লাউডভিত্তিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ডিজিটাল ওয়ার্কফ্লো প্ল্যাটফর্ম, যেখানে আইটি সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট, অটোমেশন, এআইভিত্তিক সাপোর্ট, সিকিউরিটি অপারেশনস এবং এন্টারপ্রাইজ ওয়ার্কফ্লো নিয়ে কাজ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ায় এর মূল অফিস। এআই নিয়ে এনভিডিয়া, অ্যানথ্রোপিকের মতো কোম্পানিও আমাদের সঙ্গে কাজ করে এআইকে দৈনন্দিন কাজে ব্যবহার উপযোগী করছে। এখানে প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি গ্রাহক ব্যবস্থাপনা, সমস্যা বিশ্লেষণ, যোগাযোগ দক্ষতা এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
যুক্তরাজ্যে ইউরোপিয়ান অপারেশন্সে সার্ভিসনাউয়ের টেকনিক্যাল সাপোর্টে কাজ করছি। মূলত কাজ হলো গ্রাহকদের জটিল প্রযুক্তিগত সমস্যা বুঝে সেগুলোর সমাধান দেওয়া, প্রয়োজনে বিভিন্ন ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রোডাক্ট টিমের সঙ্গে সমন্বয় করা এবং গ্রাহকের ব্যবসায়িক কার্যক্রম যেন ব্যাহত না হয়, তা নিশ্চিত করা। মোটকথা, যেখানে ডিজিটাল টেকনোলজি, সেখানেই সার্ভিসনাউ। ইউরোপ, আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশের সরকারি কাজের প্ল্যাটফর্মও আমাদের সিস্টেমে তৈরি। তাই গ্রাহকদের ডেটা অত্যন্ত সেনসিটিভ এবং খুব সতর্কতায় ডিল করতে হয়।
আমার ক্যারিয়ার শুরু হয়েছিল প্রযুক্তি এবং মানুষের নিত্যদিনের কাজ সহজ করার আগ্রহ থেকে। যুক্তরাজ্যে এসে ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশ, গ্রাহক যোগাযোগ এবং সফটওয়্যার সাপোর্টের বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করি। এর জন্য আগের কর্মস্থল মার্সিডিজ-বেঞ্জ মালয়েশিয়ার কাছে কৃতজ্ঞ। আমি চাচ্ছিলাম পুরোপুরি সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হতে, যেহেতু আইটিতে মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট নিয়ে পড়েছি। তখন ইন্টারভিউর পর সেখানকার এইচআর ও ম্যানেজার বলেছিলেন, ‘তুমি তো সোশ্যাল বাটারফ্লাই। মানুষ আর টেকনোলজির মধ্যে কিছু দেখতে পারো।’ তখন থেকে টেকনোলজি ম্যানেজমেন্টের দিকে আসা। ২০১৯ সালে যুক্তরাজ্যে বেড়ানোর জন্য এসেছিলাম। ভালো লাগা থেকে মালয়েশিয়ায় ফিরে গিয়ে মাস্টার্স কোর্সে আবেদন করলাম। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও আমাকে স্কলারশিপ দিল। দ্বিধায় ছিলাম, কী করব। নানা বললেন, ‘পড়াশোনা করো। মাস্টার্স না করা আর মূর্খ থাকা একই কথা।’ এই ভাবনা থেকে যুক্তরাজ্যে আসা।
এখন কাজের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে খণ্ডকালীন একটি হাইব্রিড মাস্টার্স প্রোগ্রামে আছি। এখন হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউর রিসার্চ আর্টিকেলে একজন প্রফেসরের সঙ্গে যুক্ত। সার্ভিসনাউয়ে প্রথম দিকে ইন্টার্ন হিসেবে জয়েন করি। পরে তারাই পার্মানেন্ট রোল দেয়। ভিসা এবং এখানে থাকার সব ব্যবস্থাও করে। খুব বেশি কাঠখড় পোড়াতে হয়নি। ম্যানেজার একদিন বললেন, তোমার কি আমাদের সঙ্গে থাকার ইচ্ছা আছে? বললাম, কেন নয়? সেই থেকে পার্মানেন্ট রোল। সাপোর্ট অপারেশনস, কেস ম্যানেজমেন্ট এবং রিসোর্স ম্যানেজমেন্টের কাজে যুক্ত আছি। পরে প্রযুক্তিগত সমস্যা বিশ্লেষণ, গ্রাহকের জটিল ইস্যু পরিচালনা এবং বিভিন্ন গ্লোবাল টিমের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা আমাকে টেকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ভূমিকায় নিয়ে আসে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল শেখার আগ্রহ, ধৈর্য এবং আন্তর্জাতিক মানের পেশাদারত্ব ধরে রাখা। কাজের সামান্য ভুলেও গ্রাহকদের শতকোটি টাকার ক্ষতি হতে পারে।
যুক্তরাজ্যে বিদেশি দক্ষ কর্মীদের জন্য বেশ কিছু খাতে সুযোগ রয়েছে; বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং, সাইবার সিকিউরিটি, ডেটা অ্যানালিটিকস, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বাস্থ্যসেবা, প্রকৌশল, ফিন্যান্স, শিক্ষা, নির্মাণ ও কেয়ার সেক্টরে আন্তর্জাতিক কর্মীদের চাহিদা দেখা যায়। মোটকথা, কাজ করলে সব জায়গায় সুযোগ আছে। লেগে থাকতে হবে। গাছে আপেল আছে, এটা নিশ্চিত। কারও এক ঝাঁকায় পড়ে, আর কারও ক্ষেত্রে ৫০ বার ঝাঁকাতে হয়। ইদানীং অবশ্য মেডিকেল সেক্টর আর্লি ক্যারিয়ারের জন্য অনেকটা স্যাচুরেটেড হয়ে গেছে। অনেকে নিউজিল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়ায়ও যাচ্ছে। বিভিন্ন দেশে থেকে এবং ঘুরে মনে হয়েছে, যুক্তরাজ্যে থাকা-খাওয়া অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবে বিশ্বমানের কালচারাল লার্নিংয়ের জন্য যুক্তরাজ্য এখনো পৃথিবীর অন্যতম সেরা জায়গা। এখন যুক্তরাজ্যে কাজের ভিসা অনেক বেশি নিয়মভিত্তিক। শুধু দক্ষতা থাকলেই হবে না, নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানের হোম অফিস স্পন্সর লাইসেন্স থাকতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট চাকরিটি স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার যোগ্য পেশার তালিকায় থাকতে হবে। GOV. UK অনুযায়ী স্কিলড ওয়ার্কার ভিসার জন্য পেশার নির্দিষ্ট পেশা কোড ও বেতনসীমা এবং কোম্পানির স্পন্সর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
আন্তর্জাতিক চাকরির জন্য বেশি ব্যবহৃত প্ল্যাটফর্ম হলো লিংকডইন, ইনডিড, গ্লাসডোর, রিড এবং কোম্পানির নিজস্ব ক্যারিয়ার পেজ। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে GOV. UK-এর ‘ফাইন্ড আ জব’ পোর্টালও ব্যবহার করা যায়। সিরিয়াসলি নিলে লিংকডইন প্রিমিয়াম কেনা ভালো বিনিয়োগ হতে পারে। এখান থেকে অনেক কিছু হয়ে যায়। আমার চাকরিও লিংকডইন থেকে পাওয়া। ব্যক্তিগত নেটওয়ার্কও অনেক সহায়ক, বিশেষ করে রেফারেলের জন্য। কোনো কোম্পানি থেকে কেউ রেফার করলে সেটা কাজে দেয়। এটাও একধরনের কোয়ালিটি বলা যায়।
বাংলাদেশিদের জন্য যুক্তরাজ্যে আসার বেশ কিছু ভিসা রুট রয়েছে। অস্থায়ীভাবে থেকে পরে পার্মানেন্ট রেসিডেন্সির দিকে যেতে স্কিলড ওয়ার্কার ভিসা, গ্লোবাল ট্যালেন্ট ভিসা এবং ইনভেটর ফাউন্ডার ভালো রুট। বাকি স্টুডেন্ট ভিসা, ডিপেন্ট ভিসা টাইপের ভিসাগুলোও ভালো শুরু হতে পারে। তবে গোল্ডেন রুল হলো, দালাল আর এজেন্ট থেকে দূরে থাকা। অবশ্যই অনেক ভালো এজেন্ট আছে, বিশেষ করে স্টুডেন্টদের জন্য। চাকরির ক্ষেত্রে ওয়েবসাইট ঘেঁটে বুঝে শতভাগ নিজে করাই ভালো। এ ছাড়া স্টুডেন্ট হিসেবে শক্ত আর্থিক অবস্থা অথবা স্কলারশিপ নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রথমত, উদ্দেশ্য পরিষ্কার হতে হবে—পড়তে আসছেন, কাজ করতে আসছেন, নাকি ভ্রমণে, সে অনুযায়ী ভিসার ধরন আলাদা। দ্বিতীয়ত, ডকুমেন্টেশন খুব শক্তিশালী হতে হবে। ব্যাংক স্টেটমেন্ট, চাকরির অফার, সিএএস, স্পন্সরশিপ সার্টিফিকেট, অ্যাকোমোডেশন প্লান, ট্রাভেল হিস্ট্রি এবং ট্যুরিস্ট বা ছাত্র হয়ে এলে দেশে ফেরার প্রমাণ—এগুলো গুরুত্বপূর্ণ। নিজে রিসার্চ করে পরিকল্পনা করে আসার বিকল্প নেই। যাঁরা কাজের উদ্দেশ্যে আসতে চান, তাঁদের অবশ্যই দেখতে হবে, চাকরিটি স্কিলড ওয়ার্কার ভিসা নির্ভরযোগ্য তালিকায় আছে কি না এবং নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানটি স্পন্সর লাইসেন্স হোল্ডার কি না। আর যাঁরা পড়াশোনার জন্য আসবেন, তাঁদের শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম দেখে নয়; কোর্সের মান, খরচ, জীবনযাত্রার ব্যয়, কাজের সুযোগ এবং ভবিষ্যৎ ক্যারিয়ার পরিকল্পনা বিবেচনা করা উচিত।
যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি কমিউনিটির সবচেয়ে বড় উপস্থিতি লন্ডনে, বিশেষ করে ইস্ট লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহ্যাম, রেডব্রিজ এবং বার্কিং অ্যান্ড ড্যাগেনহ্যাম এলাকায়। এর বাইরে বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার, ওল্ডহ্যাম, লুটন, ব্র্যাডফোর্ড, লিডস, কার্ডিফ, পোর্টসমাউথ এবং গ্লাসগোতেও উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশি কমিউনিটি রয়েছে। ২০২১ সালের ইংল্যান্ড ও ওয়েলস সেন্সাসে বাংলাদেশি জাতিগত পরিচয় একটি স্বতন্ত্র জাতিগত গোষ্ঠী হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
শুধু বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখলেই হবে না, নিজেকে আন্তর্জাতিক মানের করে গড়ে তুলতে হবে। ইংরেজি যোগাযোগ, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, পেশাদার আচরণ, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং শেখার মানসিকতা খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশি তরুণদের মধ্যে মেধার অভাব নেই। তবে আরও বেশি আত্মবিশ্বাসী হতে হবে, বিশ্ববাজারের চাহিদা বুঝতে হবে এবং পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে। সঠিক প্রস্তুতি, সততা এবং ধৈর্য থাকলে যুক্তরাজ্যসহ আন্তর্জাতিক কর্মবাজারে বাংলাদেশিদের অনেক সুযোগ রয়েছে। অনেকে এসে শরণার্থী হয়ে থেকে যাওয়া বা বিয়ে করে থেকে যাওয়ার পরিকল্পনা করেন। এগুলো ২০ বছর আগে হয়তো তুলনামূলক সহজ ছিল, কিন্তু এখন এগুলো প্রায় অসম্ভব। এসবের পেছনে সময় নষ্ট না করে দক্ষতা বাড়ালে বিশ্ব নিজ বাড়ির আঙিনা মনে হবে।