মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যেও সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো প্রথম প্রান্তিকে মুনাফায় ২৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে। দেশটির ইস্ট–ওয়েস্ট বা পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন উপসাগরীয় অঞ্চল এড়িয়ে প্রতিদিন লাখো ব্যারেল তেল পরিবহনের সুযোগ করে দেওয়ায় দেশটির তেল বিক্রি খুব একটা প্রভাবিত হয়নি। আর এ কারণেই, কোম্পানিটি মুনাফা অর্জন অব্যাহত রাখতে পেরেছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে আরামকোর মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৩৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার। একই সময়ে কোম্পানিটির রাজস্ব আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭ শতাংশ বেড়ে ১১৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অবকাঠামোর ওপর হামলা এবং উপসাগরীয় বন্দরগুলো দিয়ে রপ্তানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার চাপের মধ্যেও আরামকোর এই মুনাফা বেড়েছে।
সৌদি আরামকোর প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী আমিন নাসের বলেন, ‘আমাদের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন—যা প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৭০ লাখ ব্যারেল তেল পরিবহনের সক্ষমতায় পৌঁছেছে—নিজেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহ ধমনি হিসেবে প্রমাণ করেছে। এটি বৈশ্বিক জ্বালানি ধাক্কার প্রভাব কমাতে সহায়তা করেছে এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের সীমাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের স্বস্তি দিয়েছে।’
বিশ্বের মোট তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ সাধারণত হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিক থেকে সেটি কার্যত বন্ধ রয়েছে। আরামকোর পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইন তাদের পূর্ব উপকূল থেকে লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দরে তেল পাঠানো যায়। প্রণালিতে বিঘ্নের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে তীব্র মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বর্তমানে প্রতি ব্যারেল প্রায় ১০০ ডলারে লেনদেন হচ্ছে, যা সংঘাত শুরুর আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি।
এর আগে আমিন নাসের সতর্ক করেছিলেন, হরমুজ প্রণালির অবরোধ অব্যাহত থাকলে তা বৈশ্বিক তেল বাজারের জন্য ‘বিপর্যয়’ হয়ে দাঁড়াবে। তিনি বলেন, প্রণালি অবিলম্বে খুলে দেওয়া হলেও বাজার স্বাভাবিক হতে কয়েক মাস সময় লাগবে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গকে পাঠানো এক বিবৃতিতে আমিন নাসের বলেন, ‘যদি আজই বা অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক চলাচল পুনরায় শুরু হয়, তাহলেও তেল বাজারের ভারসাম্য ফিরতে কয়েক মাস সময় লাগবে। কিন্তু যদি আজ থেকে আরও কয়েক সপ্তাহের বেশি সময় বাণিজ্য ও জাহাজ চলাচল সীমিত থাকে, তাহলে আমরা ধারণা করছি সরবরাহ সংকট দীর্ঘস্থায়ী হবে এবং বাজার ২০২৭ সালের আগে স্বাভাবিক হবে না।’
যুক্তরাষ্ট্র এখন সংঘাত শেষ করতে অন্তর্বর্তী চুক্তির প্রস্তাবের বিষয়ে ইরানের জবাবের অপেক্ষায় আছে। এদিকে, জলপথটি সচল করতে নেওয়া নৌ-অভিযান নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণা এবং পরে তা স্থগিত করার পর সাম্প্রতিক দিনগুলোতে প্রণালি ও আশপাশের এলাকায় সংঘর্ষও হয়েছে।
আরামকো জানিয়েছে, তারা তাদের ত্রৈমাসিক লভ্যাংশ ২১ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলারেই বহাল রাখবে। গত বছরের শেষ দিকে তারা এই লভ্যাংশ ৩ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়িয়েছিল। সৌদি আরব সরকার অভ্যন্তরীণ ব্যয় নির্বাহে আরামকোর লভ্যাংশের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। দেশটির সরকার সরাসরি কোম্পানিটির ৮০ শতাংশের বেশি মালিকানা ধরে রেখেছে। পাশাপাশি তাদের সার্বভৌম বিনিয়োগ তহবিল পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট ফান্ডের হাতে রয়েছে আরও ১৬ শতাংশ শেয়ার।
সৌদি আরবের দাহরানভিত্তিক আরামকো বিশ্বজুড়ে ৭৬ হাজারের বেশি কর্মী নিয়োগ দিয়েছে। এটি বিশ্বের সবচেয়ে বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও তেল উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর একটি।