চার বছরের বেশি সময় পর গম এবং আটা-ময়দা রপ্তানির ওপর থেকে সব ধরনের বিধিনিষেধ ও কোটা তুলে নিয়েছে ভারত। ভারতের ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফরেন ট্রেড (ডিজিএফটি) গতকাল সোমবার (২৪ আগস্ট) এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ডুরুম গমসহ সব ধরনের গম এবং গমজাত পণ্য, যেমন—আটা, ময়দা ও সুজি রপ্তানির নীতি ‘নিষিদ্ধ’ (Prohibited) থেকে ‘উন্মুক্ত’ (Free) ক্যাটাগরিতে পরিবর্তনের কথা জানায়।
উল্লেখ্য, ডুরুম গম হলো একটি শক্ত প্রজাতি, যেটিকে পাস্তা গম বা ম্যাকারনি গমও বলা হয়। এটি সাধারণ গমের চেয়ে বেশি শক্ত এবং এতে প্রোটিনের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে। ডুরুম গম ভেঙে সুজি বা সেমোলিনা তৈরি করা হয়। এ ছাড়া এই দিয়েই তৈরি হয় পাস্তা, নুডলস, ম্যাকারনি ও কুসকুস।
এর আগে ভারত সরকার কেবল নির্দিষ্ট কোটার অধীনে সীমিত পরিমাণে গম রপ্তানির অনুমতি দিয়েছিল। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রথম দফায় ২৫ লাখ টন এবং পরবর্তীকালে আরও ২৫ লাখ টনসহ মোট ৫০ লাখ টন গম রপ্তানির কোটা অনুমোদন করা হয়েছিল।
তবে নতুন নির্দেশনার ফলে এখন থেকে ব্যবসায়ীরা কোনো নির্দিষ্ট কোটা ছাড়াই অবাধে গম ও গমজাত পণ্য রপ্তানি করতে পারবেন।
ভারতে গমের অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে শক্তিশালী হওয়ার কারণেই এই নীতিগত পরিবর্তন এসেছে বলে জানিয়েছে দেশটির সরকার। ভারতের সরকারি খাদ্য সংস্থা ‘ফুড করপোরেশন অব ইন্ডিয়া’র (এফসিআই) তথ্য অনুযায়ী, ১ আগস্ট পর্যন্ত সরকারি গুদামে গমের মজুত ছিল ৫ কোটি ৫ লাখ (৫০.৫ মিলিয়ন) টন। এটি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি এবং গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।
এ ছাড়া ২০২৬-২৭ বিপণন মৌসুমে ভারতের সরকারি গম সংগ্রহের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৬০ হাজার (৩৫.৭৬ মিলিয়ন) টনে, যা পুনর্নির্ধারিত ৩৪ দশমিক ৬ মিলিয়ন টনের লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে রাশিয়া ও ইউক্রেনের শস্য অবকাঠামোতে হামলার কারণে কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের রপ্তানি ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিশ্বজুড়ে গম সরবরাহে টান পড়েছে এবং গত জুলাইয়ের শুরু থেকে শিকাগো শস্য বাজারে গমের ফিউচার মূল্য ১৭ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে।
ভারতীয় ব্যবসায়ীদের বরাত দিয়ে ইকোনমিক টাইমস জানিয়েছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার জেরে বিশ্বব্যাপী গমের দাম বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশে এর চাহিদা বেড়েছে। তবে, ভারত সরকারের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞার কারণে কেবল শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোই এই সুযোগ পাবে বলে জানিয়েছেন শিল্পনেতারা।
২০২২ সালের মে মাসে ভারত গম রপ্তানি নিষিদ্ধ করে। তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে অভ্যন্তরীণ ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশীয় মজুত কমে যাওয়ার কারণে অভ্যন্তরীণ বাজারে দামের ঊর্ধ্বগতির কারণে এই সিদ্ধান্তের কথা জানায় ভারত।
অবশ্য বিশ্ববাজারের এই সংকটময় সময়ে ভারতের রপ্তানি উন্মুক্ত করার সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় গমের উচ্চ মূল্যের কারণে এখনই বড় চালানের সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন দেশটির ব্যবসায়ীরা।
একটি আন্তর্জাতিক পণ্য বাণিজ্য সংস্থার প্রধান নাম প্রকাশ না করার শর্তে হিন্দুস্তান টাইমসকে জানান, বিশ্ববাজারের তুলনায় ভারতীয় গমের দাম এখনো কিছুটা বেশি। বর্তমানে কৃষ্ণসাগর অঞ্চলের গমের দর প্রতি টনে প্রায় ২৭০ ডলার, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় পৌঁছানো পর্যন্ত পরিবহন খরচসহ দাঁড়ায় ৩১০ থেকে ৩১৫ ডলার (প্রতি ১০০ কেজিতে প্রায় ২,৯৭০ থেকে ৩,০১৫ রুপি)।
ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, ভারতীয় গম লাভজনকভাবে রপ্তানি করতে হলে গুজরাটের কান্দলা বন্দরে প্রতি ১০০ কেজির দাম ২ হাজার ৬০০ রুপির কাছাকাছি হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমানে সেখানে গমের দর রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ রুপি।
উচ্চ মূল্যের পার্থক্যের কারণেই আগের অনুমোদিত কোটার একটি বড় অংশই শেষ পর্যন্ত রপ্তানি করা সম্ভব হয়নি। বাণিজ্যিক সূত্রের বরাত হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ভারত থেকে গমজাত পণ্যের প্রকৃত রপ্তানি হয়েছে মাত্র ৬০ হাজার টনের মতো। এ ছাড়া আঞ্চলিক বাণিজ্যের অংশ হিসেবে প্রতিবেশী বাংলাদেশে কিছু পরিমাণ গমের ছোট চালান পাঠানো হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের সমন্বয় ঘটলে কিংবা আঞ্চলিক চাহিদা পূরণে ভারতের এই নতুন নীতি নীতিনির্ধারক ও ব্যবসায়ীদের জন্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকার জি টু জি (সরকারি) চুক্তির অধীনে যুক্তরাষ্ট্র থেকে অতিরিক্ত ২ লাখ ২০ হাজার টন গম আমদানির অনুমোদন দিয়েছে। প্রতি টন মূল্য ধরা হয়েছে ৩২২ মার্কিন ডলার (আন্তর্জাতিক বাজারের উন্মুক্ত দরদাতাদের চেয়ে টনপ্রতি প্রায় ২৪ ডলার বেশি)। এতে সরকারের ব্যয় হবে প্রায় ৮৬৯ কোটি ৫৬ লাখ টাকা।
মার্কিন বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর শুল্ক সুবিধা পেতে এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইউএস হুইট অ্যাসোসিয়েটসের সঙ্গে হওয়া সমঝোতা স্মারকের আওতায় বাংলাদেশ প্রতিবছর নির্দিষ্ট পরিমাণ মার্কিন গম আমদানিতে সম্মত হয়েছে।