দারিদ্র্য ও মূল্যস্ফীতির ঊর্ধ্বগতি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের স্থবিরতা—এই বহুমুখী চাপে দেশের অর্থনীতি এখন এক জটিল মোড়ে দাঁড়িয়ে। এমন বাস্তবতায় বর্তমান সরকারের সামনে একসঙ্গে ততোধিক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্বল ব্যাংক খাত যেমন অর্থনীতির ভিত নড়বড়ে করে রেখেছে, তেমনি ২০৩০ সালের মধ্যে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি এবং আন্তর্জাতিক শর্ত মেনে চলার দায়বদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে।
শনিবার রাজধানীর ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের (ইআরএফ) মিলনায়তনে ‘সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, আর্থিক সক্ষমতা ও সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব বিষয় তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের হিসাব অনুযায়ী গত তিন বছরে দেশে দারিদ্র্য বেড়েছে। কিন্তু এখন দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে সহায়তা দিতে কৃষক কার্ড বা সরাসরি ভর্তুকির উদ্যোগ নেওয়া হলে সেখানেও আপত্তি আসছে। এই দ্বৈত অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের লক্ষ্য হচ্ছে দারিদ্র্য যাতে আর না বাড়ে, সে জন্য বন্ধ শিল্পকারখানা পুনরুজ্জীবন, দেশীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। রাজস্ব আয় বাড়াতে পারলে ধীরে ধীরে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দও বাড়ানো হবে।
উপদেষ্টা আরও জানান, সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় ১২ লাখ কৃষকের ঋণ মওকুফ, পরিবারভিত্তিক সহায়তা কার্ড, কৃষক কার্ড বিতরণ, ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের সহায়তা, ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন এবং ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বর্তমান সংকট মোকাবিলাকে কঠিন করে তুলেছে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও বিনিয়োগে আস্থার ঘাটতি।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালে মূল্যস্ফীতি আরও উসকে দিতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকার কৌশলগত পণ্যের মজুত নিশ্চিত করার চেষ্টা করছে। ডিজেলের দাম বাড়ালে সেচ মৌসুমে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বলেও তিনি সতর্ক করেন। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, আগের সরকারের সময় আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে এমন শর্তে ঋণচুক্তি করা হয়েছে, যা অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণে সীমাবদ্ধতা তৈরি করেছে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিডিপি) বিশেষ ফেলো ও জ্যেষ্ঠ অর্থনীতিবিদ ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে সরকার একযোগে তিন ধরনের অগ্নিপরীক্ষার মুখে পড়েছে—অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক চাপ, আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতা এবং জনগণের উচ্চ প্রত্যাশা পূরণ। তিনি সতর্ক করে বলেন, উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণ করতে গিয়ে ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হলে দেশ ঋণের ফাঁদে পড়তে পারে। ইতিমধ্যে রাজস্বের বড় অংশ ঋণের সুদ পরিশোধে চলে যাচ্ছে, যা দীর্ঘ মেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ।
ড. মোস্তাফিজুর রহমান আরও বলেন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে উচ্চ বরাদ্দের যে অঙ্গীকার করা হয়েছে, তা বাস্তবায়নে অর্থের উৎস কোথা থেকে আসবে, তা স্পষ্ট করা জরুরি। একই সঙ্গে সুশাসনের ঘাটতি থাকা খাতগুলো চিহ্নিত করার ওপরও জোর দেন তিনি।
ব্যবসায়ী নেতারাও সেমিনারে নানা প্রস্তাব তুলে ধরেন। বিজিএমইএর সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেন, কারখানায় সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহারে উৎসাহ দিতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে। অন্যদিকে বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনার প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং নীতিগত সহায়তার দাবি জানান।