মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শরুর পর বাংলাদেশে সরকার জ্বালানি তেল রেশনিং শুরু করে। তবে এই রেশনিংয়ের আগেই রাষ্ট্রায়ত্ত তিন তেল বিপণন কোম্পানি পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা এবং তাদের অভিভাবক সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) অব্যবস্থাপনার কারণে হোঁচট খায় জ্বালানি খাত। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ কর্মকর্তাদের যোগসাজশে ডিলাররা তুলে নেয় পৌনে দুই লাখ টন জ্বালানি তেল। এমন অনিয়মের অভিযোগে বিপিসির দুই পরিচালকসহ ১৪ জনের দায়িত্ব শুধু পরিবর্তন করা হয়েছে।
সংকট সামাল দিতে সরকার গত ৬-১৪ মার্চ পর্যন্ত জ্বালানি তেল রেশনিং করে। তবে এর আগে ওই পৌনে দুই লাখ টন জ্বালানি তেল তুলে নেয় ডিলাররা। এই তেল কেলেঙ্কারির বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর মন্ত্রণালয়ের ঘুম ভাঙলেও ততক্ষণে মজুত থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি ডিলারদের হাত ঘুরে কালোবাজারে চলে যায়। সরকারি সংস্থা সূত্রে জানা যায়, এই তেল দিয়ে দেশের ১৬ দিন সরবরাহব্যবস্থা চালু রাখা যেত। এই অনিয়মের অভিযোগে কর্মকর্তাদের বদলির বিষয়টি নিশ্চিত করে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের (অপারেশন অনু বিভাগের) যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী আজকের পত্রিকাকে বলেন, এই ঘটনায় বিপিসির দুই পরিচালককে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত (ওএসডি) করা হয়েছে। ঘটনা তদন্তে কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি।
বিপিসি থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, স্বাভাবিক সময়ে তিন কোম্পানি থেকে প্রতিদিন তেল সরবরাহ করা হয় ১১-১২ হাজার টন। ওই সাত দিনে অর্থাৎ ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত সাত দিনে গড়ে ১৩-১৪ হাজার টন জ্বালানি তেল বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ডিলারদের। এটাকে অস্বাভাবিক ও নিয়মবহির্ভূত বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বিপিসির বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের কর্মকর্তা মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ বলেন, এই ঘটনায় বেশ কিছু কর্মকর্তা বদলি হয়েছে। সপ্তাহ ধরে এভাবে তেল বিক্রি চলল, তাতে তিনটি তেল বিপণন কোম্পানির মনিটরিং কম ছিল কি না, জানতে চাইলে তিনি কোনো জবাব দেননি।
বিপিসি সূত্র এবং মেঘনা ও পদ্মার জ্বালানি তেল বিক্রির তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, অনিয়মের ওই সাত দিনে তিন কোম্পানি গড়ে বিক্রি করেছে ২৫ হাজার টন করে। এই হিসাবে প্রতি কোম্পানির হাত ঘুরে ডিলারদের কাছে গেছে দিনে ৮ হাজার ৩৩৩ টনের মতো জ্বালানি তেল। স্বাভাবিক সময়ে প্রতিটি কোম্পানি দিনে ৩ হাজার ৬৬৫ টন থেকে ৪ হাজার টন জ্বালানি তেল বিক্রি করতে পারে। অর্থাৎ স্বাভাবিকের চেয়ে দ্বিগুণের বেশি তেল সরবরাহ করেছে তারা।
মেঘনা অয়েল কোম্পানি থেকে প্রাপ্ত তথ্য বলছে, গত ১-৫ মার্চ পর্যন্ত মেঘনা অয়েল কোম্পানি ডিলারদের কাছে জ্বালানি তেল বিক্রি করে দেয় ৫০ হাজার ৪১৩ টন; যা প্রতিদিন গড়ে ১০ হাজার টনের বেশি। এভাবে দেদার জ্বালানি তেল বিক্রির বিষয়টি সরকারের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত পৌঁছালে তা নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয়। এই অবস্থায় বিক্রি আবার নেমে ৩ হাজার ৭১৪ টনে ঠেকে।
একইভাবে পদ্মা অয়েল কোম্পানি ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ পর্যন্ত ৪১ হাজার ২৫৮ টন জ্বালানি তেল ডিলারদের দেয়; যা প্রতিদিন গড়ে ৬ হাজার ৮৭৬ টনের মতো। অপর কোম্পানি যমুনা অয়েলও ডিলারদের কাছে একইভাবে তেল সরবরাহ করেছে বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
এ বিষয়ে পদ্মা অয়েলের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এটা স্পষ্ট, অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম হয়েছে। নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাগুলো কোনোভাবে দায় এড়াতে পারে না। যেখানে প্রতিদিন বিক্রয় প্রতিবেদন যাচাই-বাছাই করার সুযোগ আছে, সেখানে সপ্তাহ ধরে অস্বাভাবিক তেল (লিপ্টিং) বিক্রি হওয়ার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলোর নজর এড়িয়ে যাবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ তিনি আরও বলেন, লাখ টন তেল মজুত চক্রের হাতে তুলে দিয়ে হাজার লিটার তেল উদ্ধারের (অভিযান পরিচালনা করে) ঘটনা হাস্যকর।