সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক পারস্পরিক শুল্কারোপসহ বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, অভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ হ্রাস, শিল্প খাতে জ্বালানি সরবরাহ অনিশ্চিয়তা, বিনিয়োগ স্থবিরতা, নানাবিধ দুর্নীতি প্রভৃতি কারণে বেসরকারি খাতের অগ্রগতি তেমন আশাব্যঞ্জক নয় বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।
আজ রোববার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই) আয়োজিত এক সেমিনারে ব্যবসায়ীরা এসব কথা বলেন। এই অবস্থায় বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণে নিজেদের প্রস্তুতি নিতে আরও কিছুদিন সময় প্রয়োজন বলে মনে করেন তাঁরা।
তবে সেমিনারের প্রধান অতিথি পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মঞ্জুর হোসেন মনে করেন, দেশের ম্যাক্রো-ইকোনমি কিছুটা হলেও স্থিতিশীল পর্যায়ে রয়েছে। রিজার্ভ বেড়েছে ও মূল্যস্ফীতি কমেছে। তারপরও কেন বিনিয়োগ বাড়ছে না—সেটি খতিয়ে দেখার পরামর্শ দেন তিনি। এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের বিষয়টি সরকার ইতিবাচক হিসেবে দেখছে বলে জানান।
আজ মতিঝিলে ডিসিসিআই কার্যালয়ে ‘বেসরকারি খাতের দৃষ্টিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিদ্যমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পর্যালোচনা’ শীর্ষক সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকিন আহমেদ।
সেমিনারে বক্তব্য দেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশেষ ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, মূল্যস্ফীতি কমাতে পারলেও মূল্যস্তর বেশ ওপরে চলে এসেছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টি বেশ আশঙ্কার।
বন্ডেড ওয়্যারহাউস ও ব্যাংক-টু-ব্যাংক এলসি সুবিধার কারণে তৈরি পোশাক খাত আজকে এ পর্যায়ে এসেছে। তাই রপ্তানির সম্ভাবনাময় অন্য খাতগুলোকে এ ধরনের সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে বলে মনে করেন তিনি।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘দুর্নীতির বিরুদ্ধে অনেক কথা হলেও তা দমনে কার্যকর তেমন কোনো উদ্যোগ এখনো চোখে পড়েনি। ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়াটি আমরা প্রয়োজনের নিরিখে বাস্তবায়ন করতে পারিনি। ফলে ট্যাক্স-জিডিপির অনুপাত তেমন আশাব্যঞ্জক নয়। কেবল রাজস্ব আদায় বেশি হলেই এসএমইদের বেশি সহায়তা প্রদান সম্ভব হবে। আমাদের এডিপি বাস্তবায়ন পুরোটাই চলছে ঋণের ওপর, যেটা কোনোভাবেই টেকসই প্রক্রিয়া নয়। অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ অন্যান্য অবকাঠামোর উন্নয়ন হলেও যোগাযোগসংযোগসহ অন্যান্য সেবা প্রাপ্তিতে বেশ পিছিয়ে রয়েছি। এটার উন্নয়ন জরুরি।’
সেমিনারে মূল প্রবন্ধে ডিসিসিআই সভাপতি তাসকিন আহমেদ শুল্ক ও বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা উল্লেখজনক হারে বাড়ার কারণে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়েছে বলে জানান। এলডিসি থেকে উত্তরণের বহুমাত্রিক চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে ডিসিসিআইয়ের কমপক্ষে তিন বছর এলডিসি উত্তরণ স্থগিত করার প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।
ডিসিসিআই সভাপতি বলেন, ২০২৫ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২২ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই অবস্থায় বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে ব্যাংক খাতে স্থিতিশীলতা আনয়ন, রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এতে ব্যবসায় বিনিয়োগ প্রক্রিয়া সহজীকরণ সম্ভব হবে।
তাসকিন আহমেদ বলেন, ‘আমরা দুর্নীতিমুক্ত একটা সমাজ চাই। অভ্যুত্থানের পর আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, সেটি পাইনি।’
পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সচিব) ড. মঞ্জুর হোসেন বলেন, দেশের ম্যাক্রো-ইকোনমি কিছুটা হলেও স্থিতিশীল পর্যায়ে আছে এবং রিজার্ভ ৩০ বিলিয়ন ডলারের উন্নীত হয়েছে, যা স্বস্তির বিষয়। মূল্যস্ফীতি বেশ কমেছে, চালের দাম নিয়ন্ত্রণ করা গেলে মূল্যস্ফীতি আরও কমবে। বিনিয়োগ বাড়ছে না কেন, সেটি খতিয়ে দেখতে হবে। শুধু ঋণের সুদহার বেশি থাকাই কি এর কারণ, না বাণিজ্যিক সহায়ক পরিবেশ অনুপস্থিতি মূল কারণ।
অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমে গেছে জানিয়ে তাসকিন আহমেদ বলেন, ‘এর জন্য বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। সরকার এলডিসি গ্র্যাজুয়েশনের বিষয়টি ইতিবাচক হিসেবে দেখছে, তবে আমাদের সামগ্রিক প্রস্তুতির বিষয়ের ওপর নজর দিতে হবে। অর্থনীতি খাদের কিনারা থেকে উঠে এসেছে।’
বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. এ কে এনামুল হক বলেন, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থা মন্দের ভালো। অবস্থার উন্নয়ন দেখা যাচ্ছে, তবে দীর্ঘ সময়ের জন্য তা কাঙ্ক্ষিত নয়। দুর্নীতি যে খুব একটা কমেছে, তা বলা যাবে না। অর্থনীতিকে বাঁচাতে হলে দুর্নীতির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হবে। দুর্নীতির কারণে শুধু বদলি দিয়ে শাস্তি দিলে হবে না। মানুষের ভেতরকার পরিবর্তন প্রয়োজন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিচালক (মুদ্রানীতি বিভাগ) মাহমুদ সালাহউদ্দিন নাসের বলেন, ‘আমরা বেসরকারি খাতের সহনীয় পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে কাজ করছি। সামগ্রিক অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা না এলে ব্যবসা পরিচালনা, বিনিয়োগ আকর্ষণ ও মুনাফা অর্জন সম্ভব নয়। মূল্যস্ফীতি হ্রাস পেলেই ঋণের সুদহার হ্রাসের বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করা হবে।’
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিচালক (এসএমই ও স্পেশাল পোগ্রামস ডিপার্টমেন্ট) নওশাদ মুস্তাফা বলেন, ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি কমে যাওয়া, জুলাই আন্দোলন ও গত বছরের বন্যার কারণে বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ ছিল না। বর্তমান অবস্থায় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোসহ উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে নিয়ে পরিস্থিতি উন্নয়নে কাজ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
এডিবির দক্ষিণ এশিয়া বিভাগের অর্থনৈতিক কর্মকর্তা মো. রাবিউল ইসলাম ট্রেড কানেকটিভিটি বাড়ানো, রপ্তানি বাজারের সঙ্গে এসএমইদের সংযোগ বাড়ানো ও পণ্য পরিবহনে খরচ কমানোর ওপর জোরারোপ করেন।
সেই সঙ্গে তৈরি পোশাক খাতে ম্যান মেইড ফাইবারের ব্যবহার বাড়ানো, চামড়াশিল্পে স্ট্যান্ডার্ড মেনে চলাসহ অন্যান্য সম্ভাবনাময় খাতের সক্ষমতা বাড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।