যৌথ বাজেট প্রতিক্রিয়া
দেশের মোট ভ্যাটের প্রায় পুরোটাই আসে হাতে গোনা কয়েক শ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে। অথচ রাজস্ব আদায়ের নামে নজরদারি, হয়রানি ও চাপের মুখে পড়েছেন ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, সরকার ভুল রাজস্ব কৌশলে হাঁটছে। বড় প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ফাঁকি ও কর অনিয়ম বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে ছোট ব্যবসায়ীদের করের আওতায় আনার চেষ্টা রাজস্ব বাড়াবে না, বরং ব্যবসা-বাণিজ্যে আরও অনিশ্চয়তা বাড়াবে।
প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট নিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গতকাল বুধবার রাজধানীর মগবাজারে যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি ও জাতীয় দোকানভিত্তিক এসএমই সংগঠনগুলো। সেখান থেকে অর্থমন্ত্রীর প্রতি আয়কর আইনের বিতর্কিত ধারা সংশোধন, অগ্রিম উৎসে কর কর্তনের দায়িত্ব থেকে ব্যবসায়ীদের অব্যাহতি এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের লাইসেন্সপ্রাপ্ত ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর সঙ্গে জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানানো হয়।
লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন। উপস্থিত ছিলেন কসমেটিকস, টাইলস, স্যানিটারি ও পোশাক প্রস্তুতকারক খাতের বিভিন্ন সংগঠনের শীর্ষ নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, দুই বছর ধরে এফবিসিসিআই নির্বাচিত নেতৃত্বের পরিবর্তে প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হওয়ায় বাজেট প্রণয়নে ব্যবসায়ী সমাজের বড় অংশের মতামত প্রতিফলিত হয়নি। ফলে বাস্তব ব্যবসায়িক চ্যালেঞ্জও গুরুত্ব পায়নি। একই সঙ্গে তাঁরা মনে করেন, ভয়ভীতি ও শাস্তিনির্ভর করব্যবস্থা দিয়ে টেকসই রাজস্ব আহরণ সম্ভব নয়; করদাতার আস্থা, নীতিগত স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছ প্রশাসনিক পরিবেশ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সরকারের অগ্রাধিকার।
উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৮ লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এর মধ্যে লার্জ ট্যাক্সপেয়ার্স ইউনিটের (এলটিইউ) ১০৯টি প্রতিষ্ঠান থেকেই আসে মোট ভ্যাটের ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে বৃহৎ ৫০০টি প্রতিষ্ঠান দেয় মোট ভ্যাটের ৯৮ শতাংশ, আর বাকি লাখ লাখ ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীর অবদান মাত্র ২ শতাংশ। ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, এ বাস্তবতায় রাজস্ব প্রশাসনের প্রধান মনোযোগ হওয়া উচিত বড় করদাতাদের ওপর। সেখানে ফাঁকি ও অনিয়ম বন্ধ করা গেলে রাজস্ব আহরণে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব। কিন্তু বাস্তবে চাপ বাড়ানো হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর। তাঁদের মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার ব্যয়ের বিপরীতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব সংগ্রহের লক্ষ্য দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিদায়ী অর্থবছরেও এনবিআর ৪ লাখ কোটি টাকার রাজস্ব আহরণ করতে পারেনি। তাই বর্তমান জনবল, দক্ষতা ও প্রশাসনিক সক্ষমতা দিয়ে এত বড় লক্ষ্য অর্জনের বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা।
একই সঙ্গে কর প্রশাসনের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটাতে অর্থনীতি ও তথ্যপ্রযুক্তিতে দক্ষ জনবল তৈরি এবং দেশের শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী শিক্ষার্থীদের আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কর প্রশাসনের কাজে যুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ব্যবসায়ী নেতারা আরও অভিযোগ করেন, কর আদায়ের পরিবেশ তৈরির বদলে আয়কর আইনকে ভয়ভীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিশেষ করে আয়কর আইনের ২১৬ ধারাকে তাঁরা ‘নিপীড়নমূলক’ ও ‘বিতর্কিত’ বিধান হিসেবে উল্লেখ করেন।