সরকার নানা উদ্যোগ নিলেও এলপি গ্যাসের বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের তৎপরতা থামানো যায়নি। সংকট বিবেচনায় আমদানি শুল্ক কমিয়ে ভোক্তাদের দামে স্বস্তি দিতে চেয়েছিল সরকার; কিন্তু তাতে ফল মেলেনি। বাজারে এখনো প্রতিকেজি এলপি গ্যাসে ভোক্তার কাছ থেকে অন্তত ৩০ টাকা করে বেশি নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। পর্যবেক্ষকদের মতে, খুচরা বিক্রেতা, ডিলার, পরিবেশক ও আমদানিকারক কমবেশি সবার ভাগে যাচ্ছে এই বাড়তি অর্থ।
সরকারি বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে দৈনিক প্রায় ৫ হাজার টন এলপি গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। সেই হিসাবে এলপি গ্যাস বিক্রি থেকে দিনে ১৫ কোটি টাকা করে বেশি হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
গত বছরের ডিসেম্বরে দেশে এলপি গ্যাসের সংকটের মধ্যে দাম বেড়ে গেলে পরিস্থিতি সামলাতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয় সরকার। জানুয়ারিতে ১২ কেজির সিলিন্ডারের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১৩৫০ টাকা। কিন্তু বাজারে বিক্রি হয়েছে কয়েক শ টাকা বেশিতে। আবার অনেক জায়গায় বাড়তি টাকা দিয়েও গ্যাস মেলেনি। ১২ কেজির সিলিন্ডার সর্বোচ্চ আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে তখন। ফেব্রুয়ারিতে দাম কিছুটা কমে ১৭০০ টাকায় নামে। মার্চ মাসে দাম আরও কমে ১৬০০ টাকা হয়েছে। তবে তা সরকারের নির্ধারিত ১৩৪১ টাকার চেয়ে অনেক বেশি।
গত মঙ্গলবার রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, ১২ কেজির সিলিন্ডারের গ্যাস বিক্রি হচ্ছে ১৬০০ টাকায়। খুচরা দোকানিরা দাবি করছেন, ক্রয়মূল্য বেশি থাকায় তাঁরা ভোক্তাদের এর চেয়ে কমে গ্যাস দিতে পারছেন না।
বনশ্রী এলাকার খুচরা বিক্রেতা মোহাম্মদ শিপলু বলেন, ‘সরকারের নির্ধারিত দামে গ্যাস সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। ১২ কেজির সিলিন্ডার ১৩৫০ থেকে শুরু করে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত কিনতে হচ্ছে। একেক কোম্পানির সিলিন্ডারের একেক দাম। তাই খুচরায়ও একেক দোকানে একেক দাম। কেনা দাম অনুযায়ী আমরা বিক্রি করি। সে কারণে ১৬০০ বা কখনো তার কিছু কমে বিক্রি করতে হচ্ছে।’
প্রসঙ্গত, ১২ কেজির সিলিন্ডার সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় গৃহস্থালির কাজে।
এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমানত উল্লাহ আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘১২ কেজি সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত খুচরা মূল্য ১৩৪১ টাকা। কিন্তু প্ল্যান্ট পর্যায়েই বিক্রি হচ্ছে সেই দামে। খুচরা গ্রাহকদের যাতে সত্যিই সরকার নির্ধারিত দামে দেওয়া যায় সেজন্য প্ল্যান্টে সিলিন্ডারের দাম আরও বেশ কম হওয়া উচিত। আর ডিস্ট্রিবিউটর পর্যায়ে বাড়তি পরিবহন, ওয়েটিং চার্জসহ নানা খরচ আছে। তাই প্রান্তিক পর্যায়ে এসে দামটা বিভিন্ন মাত্রায় বেড়ে যাচ্ছে।’
আমানত উল্লাহ আরও বলেন, একটা গাড়িতে ৩০০ সিলিন্ডার বহন করা সম্ভব হলেও প্ল্যান্ট সেখানে দেড় শ সিলিন্ডার দেয়। আগে যেখানে চাহিদা জানানোর এক দিন পর গ্যাস সরবরাহ করা হতো, এখন সেখানে তিন দিন অপেক্ষা করতে হয়। এসব কারণেই খরচ বাড়ে।
এলপি গ্যাস আমদানিকারকদের সংগঠন এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (লোয়াব) মহাসচিব আহসান জব্বার আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘ফেব্রুয়ারি মাসে ১ লাখ ৪৫ হাজার টনের মতো এলপি গ্যাস আমদানি হয়েছে। সে ক্ষেত্রে এই মাসে সরবরাহ সংকট রয়েছে, এমন কথা বলা যাবে না। দাম কেন কমছে না আমরা বলতে পারছি না।’
দেশে মাসে এলপি গ্যাসের চাহিদা ১ লাখ ২০ হাজার টন থেকে দেড় লাখ টন পর্যন্ত। প্রতিবছর ৫ থেকে ৭ শতাংশ পর্যন্ত চাহিদা বাড়ছে।
তবে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক বিকাশ চন্দ্র দাস আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এলপি গ্যাস আমদানিকারকেরা মুখে যাই বলুক, এখনো সঠিক মূল্যে পণ্য সরবরাহ করছে বলে আমাদের মনে হয় না। কারণ, অফিশিয়াল ইনভয়েসে এক রকম দাম লেখা আর বাস্তবে তার চেয়ে বেশি রাখার প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ডিলার ও পরিবেশকেরা অসহায়। আবার তারাও বেশি দামে কিনে আরও বেশি দামে বিক্রির ফন্দি করছে।’
বিকাশ চন্দ্র দাস জানান, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর রোজা শুরুর পর আর এলপি গ্যাস নিয়ে কোনো অভিযান চালায়নি। কারণ, রোজায় ঈদের পণ্যের বাজারে অভিযানের দিকে বেশি নজর দেওয়া হয়েছে।
সার্বিক বিষয় নিয়ে যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘আমদানিকারকেরা এখন সঠিক দামে পণ্য ছাড়ছে বলে আমরা জানতে পেরেছি। কিন্তু ডিলার ও ডিস্ট্রিবিউটর পর্যায়ে অনিয়ম হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে ভোক্তা অধিকার এসব অনিয়মের ব্যবস্থা নেবে। কারণ ডিলার, ডিস্ট্রিবিউটরদের আমরা লাইসেন্স দিই না। এ কারণে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। তবে এখন ইরানে যুদ্ধ চলছে। হরমুজ প্রণালি হয়ে পণ্য পরিবহন বন্ধ রয়েছে। চলতি মাসের দাম ঘোষণার সময় আমরা আরও কিছু নির্দেশনা দেব।’