আট মাস পর প্রবৃদ্ধি
টানা ধাক্কা শেষে দেশের রপ্তানি খাত যেন আবার শ্বাস নিতে শুরু করেছে। বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও ফিরেছে স্বস্তির জায়গাতে। আট মাসের স্থবিরতা ভেঙে এপ্রিলেই প্রবৃদ্ধি লাফিয়ে উঠেছে ৩৩ শতাংশে। এই প্রবৃদ্ধিতে স্বাভাবিক প্রবাহে ফেরার ইঙ্গিত যেমন আছে, তেমনি সামনে টিকে থাকার কঠিন পরীক্ষার বার্তাও স্পষ্ট হয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে এই চিত্র উঠে এসেছে।
সংস্থাটি জানায়, চলতি অর্থবছরের এপ্রিল মাসে দেশের রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০১ কোটি ডলার; এক বছর আগে একই সময়ে যা ছিল ৩০১ কোটি ৬৮ লাখ ডলার। অর্থাৎ একক মাস হিসেবে আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ঘটেছে ৩২ দশমিক ৯২ শতাংশ। এর আগে শুধু মার্চে রপ্তানি আয় মেলে ৩৪৮ কোটি ৭ লাখ ২০ হাজার ডলার, অর্থাৎ মার্চের তুলনায় এপ্রিলে রপ্তানি বেড়েছে ১৫ দশমিক ২০ শতাংশ।
এই হঠাৎ উত্থানের পেছনে কয়েকটি কারণ দেখছেন অর্থনীতিবিদেরা। তাঁদের মতে, দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি স্থিতিশীল হওয়ায় রপ্তানির পরিবেশ কিছুটা স্বস্তিতে ফিরেছে। বিশেষ করে স্থানীয় পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থায় বাধা কমায় ক্রেতাদের আস্থাও ফিরছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে শুল্কসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা কমেছে এবং সেখানে অপরিবর্তিত বাজার চাহিদা এখনো দেশের রপ্তানিকে ধরে রেখেছে। একইভাবে ইইউর বাজারে প্রতিযোগিতার ভারসাম্যেও পরিবর্তন এসেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তার এই সময়ে রপ্তানি আয় বাড়া নিঃসন্দেহে অপ্রত্যাশিত হলেও ইতিবাচক ইঙ্গিত।
ইপিবির তথ্য বলছে, চলতি অর্থবছরের শুরুটা ছিল আশাব্যঞ্জক। জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ২৪ দশমিক ৯০ শতাংশ। কিন্তু এরপর আগস্ট থেকে মার্চ পর্যন্ত টানা আট মাস প্রবৃদ্ধি নেতিবাচক ছিল। আগস্টে প্রবৃদ্ধি কমেছিল ২ দশমিক ৯৩ শতাংশ, যা মার্চে আরও নেমে ১৮ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধিতে পৌঁছায়। সেই ধারাবাহিক পতন থেকে এপ্রিলের এই ঘুরে দাঁড়ানো বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
তবে সার্বিক হিসাবে এখনো ঘাটতি রয়ে গেছে। জুলাই থেকে এপ্রিল পর্যন্ত মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৯৪০ কোটি ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ কম।
একক মাসে আয় বাড়লেও সার্বিক রপ্তানি পরিস্থিতিতে অস্বস্তি রয়ে গেছে বলে মনে করছেন দেশে নিট পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তাঁর ভাষ্য, এখনো কোনো কারখানায় অতিরিক্ত ক্রয়াদেশ আসেনি, নতুন ক্রেতার চাপও বাড়েনি। উপরন্তু, মাসের শেষ সপ্তাহের দীর্ঘ ছুটিতে উৎপাদন ও রপ্তানি ব্যাহত হতে পারে। তাই প্রকৃত পরিস্থিতি বুঝতে আগামী জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষার প্রয়োজন রয়েছে।
খাতভিত্তিক চিত্রে তৈরি পোশাকশিল্পই আবারও প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে। এ খাতে আয় হয়েছে ৩ হাজার ১৭২ কোটি ডলার, যা বছরওয়ারি হিসাবে ৩১ দশমিক ২১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নির্দেশ করে। শুধু এপ্রিল মাসেই পোশাক রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৩১৪ কোটি ডলার, যা গত বছরের প্রায় ২৩৯ কোটি ৩৮ লাখ ডলারের তুলনায় কিছুটা বেশি।
তৈরি পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল, গত বছরের এপ্রিল ছিল দুর্বল—শুল্ক আরোপ ও ঈদের ছুটিতে রপ্তানি কমেছিল। তাই এবারের প্রবৃদ্ধি তুলনামূলক বেশি দেখাচ্ছে।