হোম > অর্থনীতি

রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংক: দেড় লাখ কোটি টাকার মন্দ ঋণ নিয়ে হাবুডুবু

জয়নাল আবেদীন খান, ঢাকা 

সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, বেসিক ও বিডিবিএল—রাষ্ট্রায়ত্ত এই ৬ ব্যাংকের ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা আর হিসাবে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই; যা এই ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের প্রায় অর্ধেক বা ৪৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ।

বিগত সরকারের সময় এস আলম, বেক্সিমকো, নাসাসহ কয়েকটি গ্রুপ এই ব্যাংকগুলো থেকে ঋণ নিয়ে তা আর ফেরত দেয়নি। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এসব গ্রুপের কর্তাব্যক্তিদের কেউ কারাগারে, কেউ দেশছাড়া। তাঁদের ব্যবসা-বাণিজ্যও প্রায় বন্ধ। ঋণের বিপরীতে ব্যাংকে জমা বন্ধকি সম্পদের কাগজপত্রেও রয়েছে নানা জটিলতা। ফলে এই ঋণ এখন প্রায় শতভাগ আদায় অযোগ্য বা মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে।

যদিও ব্যাংক কর্তৃপক্ষ এখনো এসব অর্থ উদ্ধারে বিভিন্ন চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, ব্যাংক খাতে এই মন্দ ঋণ আদায়ের নজির খুব একটা নেই। একটা সময় তা ব্যাংকের ব্যালান্স শিট থেকে উধাও হয়ে যায়। অন্যদিকে, আইনি জটিলতার লম্বা পথ অতিক্রম করাও ব্যয়বহুল ও দুরূহ। সার্বিক বাস্তবতায় দিন যত যাচ্ছে, এই বিপুল পরিমাণ ঋণ আদায় না হওয়ার ঝুঁকিও তত প্রবল হচ্ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সেপ্টেম্বর, ২০২৫ প্রান্তিকের তথ্য অনুযায়ী, রাষ্ট্রায়ত্ত ৬ ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণ ৩ লাখ ১৯ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে খেলাপি ঋণের স্থিতি দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৯১ কোটি টাকা; যা এসব ব্যাংকের মোট বিতরণ করা ঋণের ৪৯ দশমিক ৬৫ শতাংশ। এই খেলাপি ঋণের ১ লাখ ৪৮ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা মন্দ ঋণে পরিণত হয়েছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, বিগত সরকারের সময় এস আলম, বেক্সিমকো, নাসাসহ কয়েকটি গ্রুপ ঋণের নামে ব্যাংক লুটপাটে মত্ত হয়ে ওঠে। তারা ঋণ নিয়ে ফেরত দেওয়ার চেষ্টা পর্যন্ত করেনি। এতে ওই ব্যাংকগুলোর মোট ঋণের প্রায় অর্ধেক আদায় অযোগ্য মন্দ ঋণে পরিণত হয়। তবু খেলাপি ও অবলোপন করা ঋণ আদায়ের বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বার্ষিক এমওইউ অব্যাহত রয়েছে। খেলাপিরা আদালতে যেতে বেশি আগ্রহ দেখায়। ঋণ পরিশোধে তাদের আগ্রহ নেই বললে চলে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা; যা বিতরণ করা মোট ঋণের ৩৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংক পিএলসির মোট ঋণ ৮৯ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা। এর মধ্যে আদায় অযোগ্য মন্দ ঋণ ১৮ হাজার ২১৯ কোটি বা ২০ দশমিক ৩৩ শতাংশ। জনতা ব্যাংকের মোট ঋণের স্থিতি ৯৬ হাজার ৫৬৫ কোটি টাকা; ব্যাংকটির মন্দ ঋণ ৬৯ হাজার ৫৮৫ কোটি বা ৭২ দশমিক শূন্য ৬ শতাংশ। অগ্রণী ব্যাংকের মন্দ ঋণ ৭২ হাজার ৭৩৯ কোটি টাকা; এর মধ্যে মন্দ ঋণ ২৯ হাজার ৩২১ কোটি বা ৪০ দশমিক ৩১ শতাংশ।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আদায় জোরদারের মাধ্যমে খেলাপি ঋণ কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এরই মধ্যে খেলাপি ঋণের লক্ষ্যের বড় একটি অংশ আদায় হয়েছে। আমরা খেলাপি ঋণ আদায়ে কাজ করে যাচ্ছি। কিন্তু খেলাপিরা একের পর এক অজুহাত দেখাচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনায় ঋণ তফসিল এবং আদালতের মাধ্যমে বকেয়া আদায়ের গতি ফিরেছে।’

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, রূপালী ব্যাংকের মোট ঋণ ৪৬ হাজার ৩২১ কোটি টাকা। আর এই ব্যাংকের আদায় অযোগ্য মন্দ ঋণ ২১ হাজার ৪৫৬ কোটি বা ৪৬ দশমিক ৩২ শতাংশ। বেসিক ব্যাংকের মোট ঋণ ১২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা; ব্যাংকটির মন্দ ঋণ দাঁড়িয়েছে ৮ হাজার ৭৫২ কোটি বা ৭০ দশমিক ১২ শতাংশ। বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (বিডিবিএল) মোট ঋণ ২ হাজার ৯০ কোটি টাকা; এর মধ্যে মন্দ ঋণ ৯৫৩ কোটি বা ৪৫ দশমিক ৬০ শতাংশ।

অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান আনিস এ খান বলেন, দেশের ব্যাংক খাতে রাক্ষস ভর করেছিল। তখন ব্যাংক খালি হলেও মুখ বন্ধ থাকত বাণিজ্যিক ব্যাংক কিংবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের। অথচ অনেক ভালো ব্যবসায়ী তখন ঋণ পাননি। সরকার বদলের পর স্পষ্ট হয়, সেই সময় এস আলমসহ কয়েকটি গ্রুপ ব্যাংকের টাকা অনিয়ম করে হাতিয়ে নেয়। তাদের অনেকে ঋণ পরিশোধ না করেও নিয়মিত দেখিয়েছে। যার নেপথ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দুর্বলতা ছিল। এখন সর্বাত্মক চেষ্টা করেও তা আদায় করতে পারছে না ব্যাংকগুলো; যার প্রভাবে মন্দ ঋণ বেড়েছে।

নথিপত্র অনুযায়ী, গত বছরের প্রথম ছয় মাসে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী, জনতা, সোনালী ও রূপালী ব্যাংকের শীর্ষস্থানীয় ২০ খেলাপি গ্রাহকের কাছে বকেয়া অর্থের পরিমাণ ৩১ হাজার ৯০৮ কোটি টাকা; আর ঋণ আদায়ের লক্ষ্য ছিল ২ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। সেখান থেকে আদায় হয়েছে মাত্র ২১৯ কোটি টাকা। আদায়ের হার লক্ষ্যমাত্রার মাত্র সাড়ে ৫ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ব্যাংকের ঋণ বিতরণের নিয়মাবলি মানতে হয়। গ্রাহকের ঋণ মনিটর করতে হয়। প্রকল্প যাচাই করা জরুরি। কিন্তু বিগত সরকারের সময়ে কিছু বড় গ্রাহক জামানত ছাড়াই ভুয়া তথ্য দিয়ে ঋণ নেয়; যা আদায় করা যাচ্ছে না। কিন্তু গ্রাহকের আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রভিশন রাখা বাধ্যতামূলক। কিন্তু ন্যূনতম সঞ্চিতি রাখতে পারছে না কিছু ব্যাংক। এটা ব্যাংকের জন্য অশুভ সংকেত।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, ইচ্ছাকৃতসহ সব খেলাপির কাছ থেকে অর্থ আদায়ে কঠোর কেন্দ্রীয় ব্যাংক; বিশেষ করে সরকারি ব্যাংকের ঋণ আদায়ে লক্ষ্য ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। আদালতে আটকা খেলাপি আদায়ে দ্রুত মামলা নিষ্পত্তির জন্য বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টার কথা জানিয়েছেন গভর্নর।

সুদহার কমানোর ঝুঁকি নিচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক

তিন বছর পিছিয়ে দেশের পুঁজিবাজার

দেউলিয়া এনবিএফআই শেয়ারের দাম বাড়ল হু হু করে, কিনছে কারা— প্রশ্ন অংশীদারদের

সরকারি কর্মচারীদের নতুন পে কমিশনের প্রতিবেদন জমা কাল, বেতন বাড়ছে কত

নিউইয়র্কে ইউএসবিসিসিআই আয়োজিত অনুষ্ঠানে আকিজ রিসোর্সের এমডি শেখ জসিম উদ্দিন

অর্থবছরের ৬ মাস: রাজস্ব লক্ষ্যপূরণে ব্যর্থ এনবিআর

সোনার দামে রেকর্ড, ভরি ২ লাখ ৩৯ হাজার টাকা

বিকাশ অ্যাপে ‘সেলফ কমপ্লেইন্ট’ সেবা: অভিযোগ ও সমাধান এখন এক ক্লিকেই

নাসা গ্রুপের সম্পত্তি বেচে শ্রমিকদের বকেয়া বেতন পরিশোধের সিদ্ধান্ত

এখন থেকে পদ্মা সেতুর টোল মুহূর্তেই পরিশোধ করা যাবে নগদের মাধ্যমে