গত সপ্তাহে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তম দুটি অ্যালুমিনিয়াম কারখানায় হামলা চালিয়েছে ইরান। এই হামলার মাধ্যমে ইরান যেন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত ধাতুর সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের আঘাত হেনেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র অভ্যন্তরীণভাবে চাহিদানুযায়ী প্রয়োজনীয় অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন করতে পারে না।
এই হামলার আগে ইরান যুদ্ধের প্রভাব মূলত হরমুজ প্রণালি দিয়ে অ্যালুমিনিয়াম ও কাঁচামাল পরিবহনের সংকটের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, যা তেহরান কার্যত বন্ধ করে দিয়েছে। তবে গত শনিবার সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে অবস্থিত ‘এমিরেটস গ্লোবাল অ্যালুমিনিয়াম’ (ইজিএ) জানায়, তাদের বছরে ১৫ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদনক্ষমতাসম্পন্ন ‘আল তাউইলাহ’ সাইটটি ইরানি হামলায় ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই দিনে ‘অ্যালুমিনিয়াম বাহরাইন’ (আলবা) জানায়, তাদের বছরে ১৬ লাখ টন উৎপাদনক্ষমতার কারখানাটিও লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত কোনো কোম্পানিই তাদের কার্যক্রম পুনরায় শুরুর বিষয়ে কোনো নতুন তথ্য দেয়নি। তবে এই হামলার ফলে উদ্বেগ এখন কেবল সাময়িক জাহাজ চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, বরং এই অঞ্চলের উৎপাদন ব্যবস্থার ওপর এক গুরুতর হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অ্যালুমিনিয়াম বিষয়ক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘এজেড গ্লোবাল’-এর প্রধান পল অ্যাডকিন্স লিঙ্কডইনে এক পোস্টে লিখেছেন, ‘এটি ঝুঁকির ধরনই বদলে দিয়েছে।’
এর প্রভাবে গতকাল সোমবার লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জে অ্যালুমিনিয়ামের দাম ৬ শতাংশ বেড়ে টনপ্রতি ৩ হাজার ৪৯২ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা গত চার বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ‘প্যানমিউর লিবারাম’-এর বিশ্লেষক টম প্রাইস বলেন, ‘বর্তমান বাজারের এই অবস্থায় হুট করে যদি ৩০ লাখ টনের উৎপাদন ক্ষমতা হারিয়ে যায়, তবে তা পূরণ করা অসম্ভব।’
গাড়ি নির্মাণ ও প্যাকেজিং শিল্পে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়ামকে মার্কিন সরকার ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পদার্থের তালিকায় রেখেছে। এখন সেই সরবরাহ শৃঙ্খলের ঝুঁকিই বাস্তবে রূপ নিল।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার (ইউএসজিএস) তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র তার মোট অ্যালুমিনিয়াম চাহিদার ৬০ শতাংশই আমদানির ওপর নির্ভরশীল। ২০২৫ সালে দেশটি মাত্র ৬ লাখ ৬০ হাজার টন প্রাথমিক অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদন করেছে, যা একা ‘আলবা’র উৎপাদনের অর্ধেকেরও কম।
তথ্য সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ট্রেড ডাটা মনিটর’-এর হিসেবে, গত বছর যুক্তরাষ্ট্র যে ৩৪ লাখ টন প্রাথমিক ও সংকর অ্যালুমিনিয়াম আমদানি করেছে, তার ২২ শতাংশই এসেছে মধ্যপ্রাচ্য থেকে।
আরব আমিরাত ও বাহরাইন যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় ও চতুর্থ বৃহত্তম সরবরাহকারী দেশ। এই দুই দেশের ‘ইজিএ’ ও ‘আলবা’ পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের মোট অ্যালুমিনিয়াম উৎপাদনের দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করে। ইরানের দাবি, ‘ইজিএ’ ও ‘আলবা’ উভয়ই মার্কিন সামরিক শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। ইরানের দুটি ইস্পাত কারখানায় ইসরায়েলি হামলার পাল্টা জবাব হিসেবে তারা এই হামলা চালিয়েছে।
তবে বিশ্লেষকরা এই দাবিতে সন্দিহান। ‘উড ম্যাকেঞ্জি’র সিনিয়র রিসার্চ ম্যানেজার উদয় প্যাটেল বলেন, ‘মার্কিন সামরিক বাহিনীর সঙ্গে এদের সরাসরি কোনো যোগসূত্র নেই। তবে দীর্ঘ হাতবদল ও প্রক্রিয়াজাতকরণের পর এসব ধাতুর কিছু অংশ হয়তো সামরিক কাজে ব্যবহৃত হতে পারে।’
উড ম্যাকেঞ্জির হিসাব অনুযায়ী, মার্কিন সামরিক ও প্রতিরক্ষা শিল্পে বার্ষিক ৪ লাখ ৫০ হাজার টন অ্যালুমিনিয়াম প্রয়োজন হয়। টম প্রাইসের ধারণা, মার্কিন সামরিক বাহিনী তাদের প্রয়োজনীয় অ্যালুমিনিয়ামের সিংহভাগই কানাডা থেকে সংগ্রহ করে।
তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত না হলেও, পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের উৎপাদনকে লক্ষ্যবস্তু করায় যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের প্রধান অর্থনীতিগুলো ক্ষতির মুখে পড়ছে। ‘স্টোনএক্স’-এর বিশ্লেষক ন্যাটালি স্কট-গ্রে এক নোটে লিখেছেন, ‘শিল্প কর্মকাণ্ডে ইতিমধ্যে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে এবং অনিশ্চয়তার কারণে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনাগুলো বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।’