চট্টগ্রাম বন্দরে সাত দিনের অচলাবস্থার পর আবারও গতি ফিরেছে। গত সোমবার সকাল থেকে শ্রমিকদের লাগাতার কর্মবিরতি স্থগিত হওয়ায় শুরু হয়েছে পণ্য ওঠানামা ও খালাস কার্যক্রম। এর ফলে জেটি ও বহির্নোঙরে ব্যস্ততা বাড়লেও এর মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে কর্মবিরতির গভীর ক্ষত। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী নেতাদের হিসাব অনুযায়ী, এই সাত দিনে বন্দরকেন্দ্রিক আমদানি-রপ্তানি কার্যত থমকে গিয়ে ১৫-১৭ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য ক্ষতির মুখে পড়েছে। কর্মবিরতির ফলে সাগরে আটকে পড়ে ৫০ লাখ টনের বেশি পণ্যবাহী শতাধিক জাহাজ। বন্দরের ভেতরে ও আশপাশে স্তূপ হয়ে থাকে ৪২ হাজার ৭৫৭ টিইইউস কনটেইনার। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে সরবরাহব্যবস্থায়।
রমজান ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আন্দোলনরত কর্মচারীরা অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত স্থগিত করায় শ্রমিকেরা কাজে ফিরেছেন। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, জমে থাকা পণ্য সময়মতো খালাস করা না গেলে রমজানের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব এড়ানো কঠিন হবে।
এ বিষয়ে সিকম গ্রুপের কর্ণধার আমিরুল হক আজকের পত্রিকাকে বলেন, টানা কর্মবিরতিতে সাপ্লাই চেইন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। রমজান সামনে রেখে পণ্য খালাসে দেরি হলে বাজারে নিত্যপণ্যের দামে বাড়তি চাপ পড়তে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
তথ্য অনুযায়ী, প্রথম দফায় ৩১ জানুয়ারি থেকে টানা ছয় দিন কর্মবিরতিতে যান বন্দরকর্মীরা। এতে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। দ্বিতীয় দফায় ৮ ফেব্রুয়ারি আবার কর্মবিরতি শুরু হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়। এই সময়ে বহির্নোঙরে পণ্য খালাসের অপেক্ষায় ছিল ৫৬টি মাদার ভেসেল। দীর্ঘদিনের লাইটার জাহাজের সংকটের সঙ্গে কর্মবিরতি যুক্ত হওয়ায় অচলাবস্থা আরও তীব্র হয়।
বাংলাদেশ ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেলের মুখপাত্র পারভেজ আহমেদ জানান, লাইটার জাহাজের সংকট কিছুটা কমলেও এখনো চাহিদা অনুযায়ী জাহাজ পাওয়া যাচ্ছে না। ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বহির্নোঙরে খাদ্যশস্য ও শিল্পকারখানার কাঁচামাল নিয়ে ৫৬টি মাদার ভেসেল পণ্য খালাসের অপেক্ষায় ছিল।
সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বন্দরের সীমানায় মোট ১৩৩টি মাদার ভেসেল অবস্থান করছে। এর মধ্যে ১১৪টি জাহাজ পণ্যবোঝাই অবস্থায় বহির্নোঙরে পণ্য নিয়ে নোঙর করে আছে এবং ১৯টি জাহাজ মূল জেটিতে রয়েছে। বহির্নোঙরে থাকা ১১৪টি জাহাজের মধ্যে ৫৮টিতে পণ্য খালাস কার্যক্রম চলমান ছিল, আর ৫৬টি জাহাজ পণ্য খালাসের জন্য অপেক্ষা করছিল। অপেক্ষমাণ জাহাজগুলোর বড় অংশ কনটেইনারবাহী; মোট কনটেইনার জাহাজের সংখ্যা ২৪টি। একই সময়ে বন্দরের জেটিতে ১৩টি জাহাজে খালাস কাজ চলছে। অন্যদিকে ধরনভেদে মোট ৩১টি সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ রয়েছে, যার ২৭টি বহির্নোঙরে এবং ২টি জেটিতে অবস্থান করছে। খাদ্যশস্যবাহী জাহাজ রয়েছে ২৩টি; এর মধ্যে ২২টি বহির্নোঙরে অপেক্ষায়, একটি জেটিতে খালাসে নিয়োজিত। পাশাপাশি ৫টি চিনিবাহী জাহাজের মধ্যে একটিতে খালাসকাজ চলছে, চারটি এখনো অপেক্ষমাণ। বন্দর কর্মকর্তারা জানান, স্বাভাবিক সময়ে ৩০-৩৫টির বেশি জাহাজ অপেক্ষায় থাকে না; বর্তমানে সেই চাপ কয়েক গুণ বেড়েছে।
বাংলাদেশ ইনল্যান্ড কনটেইনার ডিপো অ্যাসোসিয়েশনের (বিকডা) মহাসচিব মো. রুহুল আমিন সিকদার জানান, কর্মবিরতি স্থগিত হওয়ার পরদিন সোমবার সকাল থেকে চট্টগ্রাম বন্দরে পুনরায় কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে শুরু হয়েছে। বর্তমানে সব ধরনের আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রম চালু রয়েছে। বন্দর জেটিতে জাহাজ থেকে কনটেইনার ও পণ্য ওঠানামা চলছে এবং রপ্তানিমুখী পণ্য নিয়মিতভাবে জাহাজীকরণ করা হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, বর্তমানে ২১টি অফডকে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০টি রপ্তানি কনটেইনার জমা রয়েছে। বন্দরের কার্যক্রম নির্বিঘ্ন থাকলে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই এসব রপ্তানিমুখী কনটেইনার জাহাজে তোলা সম্ভব হবে।