মুন্সিগঞ্জ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক
দিন গড়ায়, মাস বদলায়, শেষে বছরও পেরিয়ে যায়। এভাবেই নীরবে কেটে গেছে টানা ছয়টি বছর। এই সময়ের মধ্যে দেশে নানা সরকারি উদ্যোগে পরিবর্তন এসেছে, কোথাও উন্নয়ন হয়েছে, কোথাও সংস্কারের ছাপ পড়েছে। কিন্তু সেই পরিবর্তনের ধারার বাইরে রয়ে গেছে বহুল আলোচিত মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে প্রস্তাবিত কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক। বছরের পর বছর পার হলেও প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতিতে গতি আসেনি। এখনো ৩১০ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত মাঠে চোখে পড়ে শুধু ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা অসম্পূর্ণ অবকাঠামো।
অন্যদিকে রাজধানী ও এর আশপাশের এলাকায় রাসায়নিক কারখানা ও গুদামে বারবার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। এসব ঘটনায় প্রাণহানিও থামছে না। এমন ঝুঁকি কমাতে এবং আবাসিক এলাকা থেকে বিপজ্জনক কেমিক্যাল কার্যক্রম সরিয়ে নিতে সরকার ২০১৯ সালের ৩০ এপ্রিল কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক গড়ার সিদ্ধান্ত নেয়। পুরান ঢাকা থেকে শুরু করে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত ছড়িয়ে থাকা ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা ও গুদাম এক জায়গায় স্থানান্তরের পরিকল্পনাই ছিল এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। তবে ছয় বছর পার হলেও সেই পরিকল্পনা বাস্তবে রূপ নেয়নি। নথিতে অগ্রগতির হিসাব থাকলেও বাস্তব চিত্র বলছে ভিন্ন কথা।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব পায় বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক)। সিরাজদিখান উপজেলার চিত্রকোট ইউনিয়নের তুলসীখালী ও কামারকান্দা গ্রামের মাঝের খালি জায়গাজুড়ে পার্কটি নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। প্রায় ১ হাজার ৬১৫ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ১ হাজার ৯০০টি প্লট নিয়ে প্রকল্পটি ২০২২ সালের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
তবে জমি অধিগ্রহণে জটিলতা এবং কাঙ্ক্ষিত ঠিকাদার না পাওয়ায় প্রকল্পের মূল কাজ শুরু হয় ২০২১ সালে। এতে নির্ধারিত সময়সূচি ভেঙে পড়ে। প্রথম দফায় মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত করা হয়। সেই সময়ের মধ্যেও কাজ শেষ না হওয়ায় আবার এক বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত সময় নেওয়া হয়েছে। এদিকে রাজধানীতে নিয়মিত বিরতিতে রাসায়নিক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। সর্বশেষ গত বছরের ১৪ অক্টোবর মিরপুরের শিয়ালবাড়ীর ৩ নম্বর সড়কে একটি কারখানা ভবন ও কেমিক্যাল গুদামে আগুনে ১৬ জনের প্রাণহানির ঘটনা এই প্রকল্প দ্রুত শেষ করার দাবি জোরালো করেছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রকল্প এলাকায় বালু ভরাট শেষ হলেও প্রশাসনিক ভবন, পুলিশ ফাঁড়ি ও ফায়ার সার্ভিস ভবনের কাজ এখনো চলমান। চারপাশের সীমানাপ্রাচীরও পুরোপুরি হয়নি। নৌপথে কাঁচামাল আনা-নেওয়ার জন্য ধলেশ্বরী নদীতে দুটি জেটি নির্মাণ কিংবা প্রায় দেড় কিলোমিটার নদীশাসনের কাজ শুরুই হয়নি। কঠিন ও তরল বর্জ্যের পৃথক শোধনাগার, নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র, গবেষণা কেন্দ্র, ডে-কেয়ার সেন্টার, চিকিৎসাকেন্দ্র কিংবা শিল্প মালিক সমিতির কার্যালয়ের কোনো কাজও দৃশ্যমান হয়নি। প্রকল্পের ভেতরে ১০ ফুট প্রশস্ত সড়ক ও প্রায় ১০ একর সবুজ বনানীর পরিকল্পনাও কাগজেই রয়ে গেছে।
প্রকল্পসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভৌত অগ্রগতি দেখানো হয় ৭৮ শতাংশ। মাটি ভরাট ৯৬ শতাংশ, সীমানাপ্রাচীর ৮০ শতাংশ এবং ২ হাজার ৮০০টি বাউন্ডারি পাইলের কাজ শেষ হয়েছে। অবকাঠামোগত কাজের অগ্রগতি ৬৫-৬৮ শতাংশের মধ্যে।
বাংলাদেশ কেমিক্যাল অ্যান্ড পারফিউমারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শরিফুল ইসলাম শরীফ জানান, সম্প্রতি শিল্প উপদেষ্টার সঙ্গে প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করে দ্রুত কাজ শেষ করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাতে কারখানাগুলো স্থানান্তর করা যায়।
প্রকল্প পরিচালক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, জমি অধিগ্রহণে সময় বেশি লেগেছে এবং কাঙ্ক্ষিত ঠিকাদার না পাওয়ায় দেরি হয়েছে। তাঁর দাবি, চলতি বছরে ৭৮ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্লট বরাদ্দের আবেদন চাওয়া হবে।