রাষ্ট্রপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ছেড়ে দেওয়া ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচন আজ। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোট গ্রহণ চলবে। নির্বাচনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ পাঁচ দলের পাঁচজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন এবং জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেনের মধ্যে। ভোটের আগমুহূর্তে গতকাল বুধবার আচরণবিধি লঙ্ঘন, ভোটারদের ভয়ভীতি দেখানো, হামলা ও টাকা দিয়ে ভোট কেনার অভিযোগ এনে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যও দিয়েছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী।
তবে এই উপনির্বাচনে এখন পর্যন্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কোনো কারণ নেই বলে জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ। তিনি বলেছেন, নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে নির্বাচন কমিশন ভবনে একটি মনিটরিং সেল গঠন করা হয়েছে। এই সেল থেকে ভোটকেন্দ্রের পরিস্থিতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং ভোটের সার্বিক ব্যবস্থাপনা তদারকি করা হবে।
গতকাল বিকেলে ঠাকুরগাঁও শহরের একটি রেস্টুরেন্টে সংবাদ সম্মেলন করে জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন বলেন, ৫ আগস্টের পর মানুষ নির্বাচনী পরিবেশের পরিবর্তন আশা করেছিল। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বগুড়া ও শেরপুরের উপনির্বাচনের অভিজ্ঞতা তাঁদের হতাশ করেছে। ঠাকুরগাঁও-১ আসনের নির্বাচনেও একই ধরনের পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন তাঁরা।
দেলাওয়ার হোসেনের অভিযোগ, ৮ অক্টোবর প্রতীক বরাদ্দের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রচার শুরুর আগেই বিএনপির প্রার্থীর ব্যানার-ফেস্টুনে শহর ছেয়ে ফেলা হয়। প্রচারণা শুরুর পর থেকে ভোটার, ভোটকর্মী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয়ভীতি সৃষ্টির অভিযোগও করেন তিনি। এসব বিষয়ে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার কথা জানান জামায়াতের এই প্রার্থী।
জামায়াতের প্রার্থী আরও অভিযোগ করেন, ৭ অক্টোবর বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করে স্থানীয়দের একটি সেতু নির্মাণের আশ্বাস দেন এবং একজন প্রকৌশলীকে ফোন করে এক মাসের মধ্যে কাজটি করার নির্দেশ দেন। ৯ অক্টোবর প্রচারণার সময় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে অনুদান দেওয়ার প্রতিশ্রুতি এবং পরদিন একজন সরকারি চাকরিজীবীর বিএনপির নির্বাচনী প্রচারে অংশ নেওয়ার অভিযোগও তোলেন তিনি।
বিভিন্ন সময়ে জামায়াতের প্রার্থীর কর্মীদের ওপর হামলা এবং কার্যালয় ভাঙচুরের অভিযোগ করেন দেলাওয়ার হোসেন। এ ছাড়া গতকাল মানবকল্যাণ পরিষদে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে গোপন বৈঠক ও খাবারের আয়োজনের অভিযোগও তোলেন জামায়াতের প্রার্থী। এসব অভিযোগের পক্ষে ভিডিও, ছবি ও অন্যান্য প্রমাণসহ রিটার্নিং কর্মকর্তা এবং জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি কমিটির কাছে দেওয়ার কথা জানান তিনি।
নির্বাচন বর্জনের কোনো পরিকল্পনা আছে কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচন বর্জনের চিন্তা নিয়ে তাঁরা মাঠে নামেননি। প্রশাসনের ওপর এখনো তাঁদের আস্থা রয়েছে। তবে কেন্দ্র দখল করে দুপুরের মধ্যে ভোট শেষ করে দেওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলে তাৎক্ষণিক পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
তবে জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু ভোটারদের ভোটকেন্দ্রে আসতে বাধা দেওয়ার পরিকল্পনার অভিযোগ প্রসঙ্গে দেলাওয়ার হোসেন বলেন, সনাতন ধর্মাবলম্বী ভোটারদের বাদ দিয়ে কোনো নির্বাচন সম্ভব নয়। তাঁদের ভোটকেন্দ্রে আসতে উৎসাহিত করতে তাঁরা কাজ করছেন।
জামায়াতের প্রার্থীর অভিযোগ অস্বীকার করে বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীনের প্রধান নির্বাচনী এজেন্ট ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক পয়গাম আলী বলেন, দেলাওয়ার হোসেন ভোটারদের কাছে যাওয়ার চেয়ে সংবাদ সম্মেলন ও গণমাধ্যমে বেশি সময় দিচ্ছেন। তাঁর আনা অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও কাল্পনিক।
পয়গাম আলী বলেন, প্রচারণার ২১ দিনে ঠাকুরগাঁওয়ে বড় ধরনের কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। হুমকি দেওয়ার অভিযোগও মিথ্যা। বরং জামায়াতের প্রার্থী প্রকাশ্যে চোখ তুলে নেওয়ার হুমকি দিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি।
টাকা দিয়ে ভোট কেনার অভিযোগের জবাবে পয়গাম আলী বলেন, বালিয়া ইউনিয়নে জামায়াতের এক কর্মীকে টাকা ও ভোটার স্লিপ দিয়ে ভোট কেনার সময় স্থানীয় লোকজন আটক করেছেন। বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে।
মানবকল্যাণ পরিষদে সরকারি কর্মকর্তাদের নিয়ে বিএনপির ভোজ আয়োজনের অভিযোগ অস্বীকার করে পয়গাম আলী বলেন, সেখানে ঢাকায় থাকা ঠাকুরগাঁওয়ের কয়েকজন তরুণ ও বিভিন্ন পেশার মানুষের উদ্যোগে গেট টুগেদার ও খাবারের আয়োজন করা হয়েছিল। এর সঙ্গে বিএনপির কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না।
পয়গাম আলী বলেন, বিএনপি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন চায়। ভোটাররা নির্বিঘ্নে কেন্দ্রে গিয়ে তাঁদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেবেন এবং জনগণের রায়েই বিজয়ী নির্ধারিত হবে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে রিটার্নিং কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, উভয় পক্ষের অভিযোগ তাঁরা পেয়েছেন। একটি নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয়সংখ্যক পুলিশ, এসআরবি, বিজিবি ও ম্যাজিস্ট্রেট মোতায়েন থাকবে।
গতকাল নির্বাচন কমিশন ভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, গত ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনেও একই ব্যবস্থা ছিল। পরবর্তী সময়ে শেরপুর ও বগুড়ার দুটি উপনির্বাচনেও এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। এর ধারাবাহিকতায় ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনেও একই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
ইসি সচিব বলেন, মূলত আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণের জন্য এই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। বিজিবি, এসআরবি ও পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে মনিটরিং করা হবে। বডি ওর্ন ক্যামেরার পাশাপাশি বিজিবি ও পুলিশের বডি ওর্ন ক্যামেরা এবং বিজিবির ড্রোন ব্যবহার করে নজরদারি চালানো হবে। তিনি বলেন, ‘এই সার্ভিল্যান্স রেখে আমরা এখান থেকে মিনিট বাই মিনিট মনিটরিং করব।’
ঠাকুরগাঁও-১ আসনে সব শ্রেণির ভোটার নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে আখতার আহমেদ বলেন, সেই পরিবেশ রয়েছে। তিনি জানান, এ বিষয়ে তিনি ঠাকুরগাঁওয়ের পুলিশ সুপার, জেলা প্রশাসক এবং রিটার্নিং কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী জেলা নির্বাচন কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলেছেন। তাঁদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।
আখতার আহমেদ বলেন, ‘এখন পর্যন্ত উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কোনো কারণ আমরা পাইনি এবং ইনশা আল্লাহ পাব না।’